নেপথ্যে বাংলার ‘পঞ্চকন্যা’
মীরা মুখার্জি, করুণা সাহা, শ্যামশ্রী বসু, শানু লাহিড়ী, সন্তোষ রোহাত্গী (ডান দিক থেকে)
প্রোগেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ, ক্যালকাটা গ্রুপ, সোসাইটি অফ কনটেম্পোরারি আর্টিস্ট, ক্যালকাটা পেইন্টার্স, পেইন্টার্স অর্কেস্ট্রা, ক্যালকাটা স্কাল্পচারস—১৯৫০-৬০ সালের ভারতে জন্ম নিয়েছিল এরকম একাধিক শিল্পীদল। মূলত আর্ট-স্কুলের ছাত্ররাই এই শিল্পীদলগুলো তৈরির নেপথ্যে ছিলেন। তাঁদের ভাবনা ছিল আন্তর্জাতিক ভাবে দেশিয় ঘরানা, নিজস্ব শৈলির বিকাশ ঘটানো। তাছাড়া যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, গণহত্যা, দেশভাগ – সেসময় বিভিন্ন সমস্যা চলছে। তাই কেবলমাত্র নান্দনিকতার মাঝে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তাদের বিচার্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। তবে, এইসব গ্রুপগুলোয় মহিলা শিল্পীদের উপস্থিতি ছিল নামমাত্র, বলা ভালো “ছিল না”। সেই সময়ের নিরিখে এটাই স্বাভাবিক কারণ, ফাইন আর্টস নিয়ে লেখাপড়া বা চর্চার সুযোগ সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের ছিল না। যাঁরা সেই সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের প্রমাণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, গড়ে তুলেছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা শিল্পী গোষ্ঠী—দ্য গ্রুপ (The Group)। নেপথ্যে শিল্পী করুণা সাহা, শিল্পী শানু লাহিড়ী, শিল্পী সন্তোষ রোহতগী, শিল্পী মীরা মুখোপাধ্যায়, শিল্পী শ্যামশ্রী বসু। স্হানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো তাঁদের নাম রাখে পঞ্চকন্যা।

করুণা সাহা ও জঁ রেনোয়া-র ‘দ্য রিভার’ ছবির পোস্টারে তাঁর আলপনা
সেই সময় দ্য গ্রুপের পাঁচজন সদস্যই বিভিন্ন দেশ ঘুরে শিল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করে এসেছেন। তাঁরা দেখলেন এখানেও মহিলা শিল্পীরা কোণঠাসা হয়ে আছেন, কারোরই যেন স্বাধীন বক্তব্য নেই। পঞ্চকন্যারা চেয়েছিলেন এর ছত্রছায়া থেকে বেরতে। তৈরি হলো ‘দ্য গ্রুপ’।
শিল্পী করুণা সাহা
ঘটানাচক্রে এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ব্যতিক্রমী, প্রতিবাদ; স্বতন্ত্র শিল্পী বলতে যা বোঝায় তা-ই। করুণা সাহা বাড়িতে মডেল আনিয়ে ‘ন্যুড’ আঁকতেন। যথারীতি রক্ষণশীল হিন্দুরা প্রতিবাদও জানিয়েছিলেন। প্যারিস ফেরত করুণা সেসবে কান দেননি। ১৯৩৯-এর আগে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে কোনও মহিলা ছাত্র ছিল না। ১৯৩৯ সালেই প্রথম সেই সুযোগ আসে। করুণা ছিলেন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের প্রথম মহিলা ছাত্রদের একজন। স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেলও খেটেছিলেন। ১৯৪৯-এ স্বাধীন ভারতের জন্য প্রথম পোস্টাল স্ট্যাম্পটিও তাঁর বানানো। জঁ রেনোয়া-র ‘দ্য রিভার’ ছবির জন্য ৯ ফুট দৈর্ঘ্যের একটা আলপনা এঁকেছিলেন। বিয়ে করেছিলেন প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক শম্ভু সাহা’কে।

শিল্পী শানু লাহিড়ী
শিল্পী শানু লাহিড়ী
যতটা খ্যাতি পেতে পারতেন, পাননি। তাঁর কাজ নিয়ে যতটা আলোচনার প্রয়োজন ছিল, হয়নি। তিনি কমলকুমার ও নীরোদ মজুমদারের বোন। শিল্প তাঁর রক্তে। ১৯৫১ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে (তখন অতুল বসু অধ্যক্ষ ছিলেন) প্রথাগত শিক্ষা শেষে, ১৯৫৬ সালে ফরাসি সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান প্যারিস। দু’বছর ছিলেন। শোনা যায়, সেখানে গিয়ে পিকাসো, মাতিস, শাগাল, রুসোর মতো শিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। শিক্ষার ষোলোকলা পূর্ণ করে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে, খুব অল্প সময়েই ছবির জগতে নিজের এক বিশিষ্ট ভাষা ও নিজস্বতাকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। নিজের শিল্পবোধ ও শিল্প সম্পর্কিত ধারণায় অত্যাধুনিক ছিলেন এই শিল্পী। ২০১৩ সালে তাঁর প্রয়াণের পর, ২০২৩ সালে গ্যালারি আর্ট ফ্রিকোয়েন্সিজ়ে আয়োজিত হয়েছিল ‘শানু লাহিড়ী: ট্রানজ়িশনস অ্যান্ড ইন্টারসেকশন’ নামে এক প্রদর্শনী। শানু লাহিড়ীর ল্যান্সডাউন কোর্টের বাড়িতেই দেশের প্রথম মহিলা শিল্পীগোষ্ঠী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন পঞ্চকন্যারা।

মীরা মুখার্জি ও নয়া দিল্লি’র মৌর্য শেরাটন হোটেল প্রাঙ্গনে তাঁর হাতে গড়া ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য Ashoka at Kalinga
শিল্পী মীরা মুখোপাধ্যায়
জার্মান থেকে ভাস্কর্য নিয়ে পড়াশোনা। পরবর্তীতে দেশে ফিরে বিভিন্ন জায়গায় শিল্পকলার শিক্ষিকা হিসাবে নিযুক্ত থাকলেও, নতুন কিছু করার নেশা সবসময় তাঁকে অস্থির করে রাখত। অবশেষে ১৯৬০ সালে নিজের বাঁধা মাইনের চাকরিকে বিদায় জানিয়ে ছত্তিশগড়ের বস্তারে কাজ শুরু করেন মীরা। সামনে এক নতুন জগত খুলে যায়। তাঁর ভাস্কর্য দেশের বহু জায়গায় সংরক্ষিত আছে।

লন্ডনে শ্যামশ্রী বসু'র প্রদর্শনীতে মহারানি গায়ত্রী দেবী
শিল্পী শ্যামশ্রী বসু ও শিল্পী সন্তোষ রোহতগী
গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেন ১৯৬০ সালে। তাঁর সহপাঠী ছিলেন সুনীল দাস, যোগেন চৌধুরী, অনিতা রায় চৌধুরীরা। দেশে-বিদেশে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর কাজ, বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
শিল্পী সন্তোষ রোহতগীও কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের প্রাক্তনী। পরে প্যারিসেও গেছিলেন পড়তে। ভারতীয় ও পশ্চিমা চিত্রকলা দুই বিদ্যাই পেয়েছিলেন। সহপাঠী ছিলেন কার্ত্তিক পাইন, গোপাল হালদার, গণেশ হালুইরা। ১৯৬০-এ ফরাসি সরকারের বৃত্তি পেয়ে তিনিও প্যারিস গেছিলেন। তিনি এবং নিপা মৈত্র সেই দুজন শিল্পী, যাঁদের কাজ সিডনির ‘ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট্রেট একজিবিশন’-এ প্রদর্শিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে।

২০২৩-এ দ্য গ্রুপ-এর বার্ষিক প্রদর্শনীর পোস্টার
মোট কথা, পঞ্চকন্যার প্রত্যেকেই শিল্পী হিসেবে ছিলেন আন্তর্জাতিক। ১৯৮১ সাল নাগাদ শিল্পজগতের ‘সেক্সিজম এবং রেসিজম’ নিয়ে নিউ ইয়র্কে গেরিলা গার্লস গ্রুপ তৈরি করেছিলেন সেখানকার প্রতিবাদী মহিলা শিল্পীরা। আমেরিকায় যদি এ অবস্থা হয়, তখন ভারতের অবস্থা ভাবুন! সেই সময় দ্য গ্রুপের পাঁচজন সদস্যই বিভিন্ন দেশ ঘুরে শিল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করে এসেছেন। তাঁরা দেখলেন এখানেও মহিলা শিল্পীরা কোণঠাসা হয়ে আছেন, কারোরই যেন স্বাধীন বক্তব্য নেই। এর ছত্রছায়া থেকে বেরতে চাইলেন তাঁরা। তৈরি হলো ‘দ্য গ্রুপ’। ১৯৮৩ সালে দলের প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। নৃত্যশিল্পী রানি কর্নার, সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী, সাংবাদিক আরুণি মুখার্জি, ইতিহাসের অধ্যাপিকা রত্নাবলী চ্যাটার্জি, ভাস্কর শিল্পী স্বনামধন্য উমা সিদ্ধান্তও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। চিত্রকলার জগতে মেয়েদের প্রথম দল হিসেবে তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। অনেক মহিলা শিল্পীই পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছেন এই দলে। মৌলিকতা ও স্বতন্ত্র শিল্পের পরিচয় দিয়ে ‘দ্য গ্রুপ’ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শনী করেছে, এমনকি এখনও করে চলেছে। ৪০ বছর ধরে প্রদর্শনীর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এই শিল্পীদল। প্রতিবছরই দলের বার্ষিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় অ্যাকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। পঞ্চকন্যাদের সকলেই আজ প্রয়াত। তবে, দলের ব্যাটন তুলে দিয়ে গিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। তাঁরাই সচল রেখেছেন ভারতের প্রথম মহিলা শিল্পদলটিকে।
“পঞ্চকন্যারা কেউই আজ আর নেই। গতবছরই চলে গিয়েছেন দলের শেষ জীবিত সদস্য শ্যামশ্রী বসু। তবে, এখনও আমাদের সঙ্গে আছেন দলের বর্তমান সভাপতি এবং সবথেকে পুরোনো সদস্য অঞ্জলি সেনগুপ্ত, প্রায় শুরু থেকেই দ্য গ্রুপের সঙ্গে আছেন। সব মিলিয়ে মোট তেরো জন সক্রিয় সদস্য আছেন দ্য গ্রুপ-এ। এছাড়াও বহু মহিলা শিল্পী আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বার্ষিক প্রদর্শনী ছাড়াও আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করি। বছরের বিভিন্ন সময়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয়, কোভিডের সময় একটা এনজিও-র জন্য দেওয়ালচিত্র করে দিয়েছিলাম আমরা। যেসব মেয়েরা গুণী শিল্পী হয়েও শিল্পীমহলে জায়গা পান না, প্রদর্শনী করার সামর্থ নেই যাঁদের, তাঁদেরকে একটা জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করি আমরা।” বলছিলেন দ্য গ্রুপ-এর সক্রিয় সদস্য-শিল্পী তমালী দাশগুপ্ত।
এখনও কি শিল্পীগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মহিলা শিল্পীদের কোণঠাসা করার প্রবণতা রয়ে গেছে? তমালী দাশগুপ্ত’র কথায় “ভালো ভাবেই আছে। এটা একটা প্রথার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে; বড়ো বড়ো শিল্পী গোষ্ঠীগুলোর দিকে একটু নজর দিলেই তা বোঝা যায়। একটা চালু ধারণা আছে যে মহিলারা শিল্পের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না, সংসারে তাঁদের কাজ থাকে, Full Time Active Artist নয়, এইসব আর কি! এটা সত্যি যে মেয়েদের সংসার সামলাতে হয়, কিন্তু সংসার সামলে ছবি আঁকা যায় না, এ ভ্রান্ত ধারণা। লিঙ্গ নির্বিশেষে পুরুষতান্ত্রিকতার শিকড় অনেক গভীরে ছড়িয়েছে। মেয়েদের তো আলাদা করে দল গড়ার প্রয়োজনই থাকতো না যদি তাঁরা যোগ্য জায়গাটা পেতেন।”
তথ্যসূত্র:
https://www.calcuttayellowpages.com/adver/109202aboutherself.html
https://criticalcollective.in/SpecialProjectEssayListing.aspx?id=1465
https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/https/example-com/last-surviving-founder-member-women-artists-group-panchya-kanya-no-more/articleshow/106107630.cms
https://www.banglaworldwide.com/post/international-womens-day-the-group
https://www.banglaworldwide.com/post/shilpi-dol-shilpo-vabna
নতুন পথের পথিক : শমিতা বসু (আনন্দবাজার)
কৃতজ্ঞতা:
শিল্পী অলোকানন্দা সেনগুপ্ত
শিল্পী তমালী দাশগুপ্ত (দ্য গ্রুপ-এর সক্রিয় সদস্য)