শম্ভু সাহা : সত্যজিতের আগে বনলতা সেন-এর প্রথম প্রচ্ছদ-শিল্পী

জীবনানন্দ দাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন’

জীবনানন্দ দাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন’। সে-প্রজন্ম থেকে এ-প্রজন্ম, সাধারণ থেকে কেউকেটা – নাটোরের বনলতা সেন অধরা মাধুরী হয়ে ধরা দিয়েছে সকলের কল্পনায়। বাঙালির হৃদয়ে বনলতা সেন কখনও ভিঞ্চি-র মোনালিসা’র মতো রহস্যময়ী, কখনও প্রথম প্রেমের ইস্তেহার। দুঃখের বিষয়, প্রথম প্রকাশের পর জনপ্রিয়তা দূরে থাক, তৎকালীন সাহিত্য-সমাজ, পাঠককূল মোটেই গুরত্ব দেয়নি বনলতা সেন ও তার জনককে। সেকারণেই বোধহয় বেশিরভাগের কাছেই অজানা থেকে গেছে, সত্যজিতের আগে বনলতা সেন-এর প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ করেছিলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শম্ভু সাহা।

জীবনানন্দের জীবনে বুদ্ধদেব বসু অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছিলেন। জীবনানন্দ দাশকে আজ আমরা যত ভাবে চিনি, তার প্রথম পরিচয়টি করিয়ে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু। তিনি টের পেয়েছিলেন যে, জীবনানন্দের কবিতা পড়লে যেভাবে কানে লেগে থাকে সে অনুপাতে পাঠক তাঁকে তখনও পর্যন্ত নিতে পারেননি; বরং কবিসমাজ ভেতরে ভেতরে তাঁর অনুকরণের লোভ সংবরণ করতে পারছেন না। বুদ্ধদেব বসুর নিরন্তর চেষ্টায় ‘কবিতা ভবন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল আধুনিক বাংলা কবিতার প্রথম সংকলন – যা শুরুই রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। কবিতা ভবন-এর অভিজ্ঞান বা ‘এমব্লেম’ ছিল – ঢেউ এর উপর একটা নৌকো।

কবিতা ভবন থেকে প্রকাশিত বনলতা সেনের প্রথম সংস্করণ

কবিতা ভবন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল আরও অনেক বই কিন্তু বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘এক পয়সায় একটি’ সিরিজের বইগুলো। অভিনব কবিতার দিকে পাঠকের মন টানাই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, কম দামে একগুচ্ছ  ভালো কবিতা তুলে দেওয়া কবিতা-পাঠকের হাতে। ডিমাই সাইজের ষোলো পৃষ্ঠার বই। প্রতি পৃষ্ঠার দাম এক পয়সা হিসেবে ষোলো পয়সা – সেই সময়ের চার আনা দাম। ষোলোটি পৃষ্ঠায় অর্থাৎ এক ফর্মায় যতগুলি কবিতা যেভাবে সাজানো যেতে পারে – ততগুলিই থাকত। অনেকে বলেন এই সিরিজ-এর নেপথ্যে বিদেশি আদর্শ ছিল। শোনা যায়, প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক জেমস জয়েসের তেরোটা কবিতার সংকলন ‘POMES PENY each’ -থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু। তবে, সিরিজের নামের ইঙ্গিত তিনি জয়েসের থেকে নিলেও এই গ্রন্থমালার পরিকল্পনা ছিল তাঁর নিজস্ব। 

শম্ভু মিত্র হলেন সেই আলোকচিত্রী, যিনি একসময় শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের একচেটিয়া ছবি তুলে আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তাঁর তোলা ছবিগুলো শান্তিনিকেতনের ঐতিহাসিক নমুনা। শম্ভু সাহা’র সম্পাদনায় Faces and Places of Visva-Bharati –বইতে সেসব দেখা যায়।

বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত – সবসুদ্ধ সংখ্যায় আঠারোটা। জানা যায়, প্রত্যেকটাই জনপ্রিয় হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছিল চারটি বইয়ের। এই সিরিজেই প্রকাশিত হয় বনলতা সেন-এর প্রথম সংস্করণ (১৯৪২)। প্রচ্ছদশিল্পী ফটোগ্রাফার শম্ভু সাহা। ব্রাউন কভারের মাঝখানে ছোট্ট লাল রঙের একটা স্কেচ। যতসামান্য কয়েকটা রেখায় পিছন ফিরে থাকা এক মহিলার ছবি। শম্ভুর এই প্রচ্ছদ ভাবনার বিষয়ে কখনও চর্চা হয়নি। জানা যায় না, এই প্রচ্ছদ ছাড়া আর কোনও প্রচ্ছদ তিনি হাতে এঁকে করেছেন কিনা। শম্ভু সাহা হলেন সেই আলোকচিত্রী, যিনি একসময় শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথের একচেটিয়া ছবি তুলে আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তাঁর তোলা ছবিগুলো শান্তিনিকেতনের ঐতিহাসিক নমুনা। শম্ভু সাহা’র সম্পাদনায় Faces and Places of Visva-Bharati –বইতে সেসব দেখা যায়। 

১৯৩০-৪০ সাল ও তার পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনের এরকম প্রচুর ছবি ধরা পড়েছিল শম্ভু সাহা'র ক্যামেরায়। তাঁর তোলা  বেশিরভাগই ছবিই আজ বিরল সংগ্রহ হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

শম্ভু সাহা’র সম্পাদনায় ‘Faces and Places of Visva-Bharati’

 

প্রথম সংস্করণে শম্ভু সাহা’র প্রচ্ছদটি নিয়ে জীবনানন্দ কখনও কোনও মন্তব্য করেননি। অথচ, দশ বছর পরে সিগনেট থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে, সত্যজিৎ রায়ের করা বনলতা সেন-এর প্রচ্ছদ মোটেই পছন্দ হয়নি তাঁর। “আমার বনলতা সেন দেখে আমি অত্যন্ত হতাশ হয়েছি। এত খারাপ প্রচ্ছদপট আমি জীবনে দেখিনি”। ১৯৫২ সালে বইটা প্রকাশের তিনমাসের মধ্যেই সুরজিৎ দাশগুপ্তকে লেখা চিঠিতে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বোন সুচরিতা দাশকে বলেছিলেন, “কাগজ, ছাপা, বাঁধাই সবই ভালো, কিন্তু ছবিটা আমার আদৌ পছন্দ হয়নি”। এইরকম আরও তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় জীবনানন্দ-গবেষক গৌতম মিত্রের একটি প্রবন্ধে।

সত্যজিৎ-কৃত বনলতা সেনের সিগনেট সংস্করণ

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,/মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর/ হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা/ সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,/ তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’/ পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” 

এই পংক্তিকেই যেন অজস্র রেখার আলপনায় বনলতা সেন হিসেবে কল্পনা করেছিলেন সত্যজিৎ। তাঁর এই প্রচ্ছদ নিয়ে চর্চাও কম হয়নি। পছন্দ হল না শুধু জীবননানন্দের। কেন? কবিতায় যে মেয়ের থেকে দুদণ্ড শান্তি চেয়ে আকূল হয়েছিলেন, কবি কি চাননি বাস্তবে সে কোনও রূপ পাক? জীবনানন্দের সেই রহস্যময়ী বনলতা সেন আসলে কে? কবির মনের তল পাওয়া কঠিন। এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা কখনও পাবো না। সেকারণেই বোধহয় জীবনানন্দ দাশ তাঁর বনলতা সেন-কে নিয়ে কবিতার রহস্যময়তায় চিরকাল অক্ষয় হয়ে থেকে যাবেন।  

তথ্যঋণঃ
বুদ্ধদেব বসুঃ স্বয়ং প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের স্রষ্টা : সুমিতা চক্রবর্তী (parabaas.com)
সত্যজিৎ-রায়-ও-বনলতা-সেন-এর প্রচ্ছদ : বৃষ্টির আশ্চর্য ছায়া, গৌতম মিত্র (sree-bd.com)

 

Developed by DXDasia