
১।
সুবর্ণরেখা (Subarnarekha/1965) ছবিতে ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak) ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন? শুধুই কি সেই ছবি ঘর ছাড়া মানুষের আশাহীনতার কথা বলে? শুধুই কি হতাশার? বা নচিকেতার ভাঙা স্বপ্নের উপাখ্যান বয়ে বেড়ায়? এই প্রশ্নগুলোই কি একমাত্র প্রশ্ন, যা সুবর্ণরেখা দেখলে মাথায় আসা উচিত? মনে হয়, এই প্রশ্নগুলো ছবিটার খুবই উপরিভাগের একটা স্তরকে চিহ্নিত করে। সুবর্ণরেখায় পৌঁছে ঋত্বিক ততদিনে হয়ে উঠেছেন আরও বেশি রকম গভীর ভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক। সেই দর্শন বয়ে চলে নদীর মতো, যে নদীর স্রোত কোথাও গিয়ে শেষ হয় তিতাসে। সেই নদী ইমেজ বা ছবির নদী। ঋত্বিককে নিয়ে যে সমস্ত লেখা পড়েছি, সেখানে ঋত্বিকের ভাবনা, লেখা, পড়াশোনা ও জীবন নিয়ে যতটা চর্চা হয়েছে, তাঁর ছবির নির্মাণ নিয়ে ততটা লেখালেখি চোখে পড়েনি। তাই এই লেখাতে যে বক্তব্যটা রাখার চেষ্টা করবো তা হল, ছবি বা দৃশ্যের মাধ্যমে কীভাবে ঋত্বিক ঘটক বাঙালি জনজীবনে ভারতীয় অবচেতনকে (Unconscious) পুননির্মাণ করেছেন। এর পাশাপাশি আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ছবিতে ঋত্বিক যে দৃশ্যপটের নির্মাণ করেছেন সেখানে কীভাবে তাঁর সমসাময়িক চিত্রশিল্পীদের কাজ তিনি সম্বল করেন।
ঋত্বিকের এই আধুনিক আখ্যানের প্রেক্ষাপটের ভূমি হল, এই শব্দহীনা সুবর্ণরেখা। যার পারেই ঘটবে আরেকটি মর্মান্তিক আখ্যান। আমরা দেখব এক আধুনিক রামায়ণ।

অবচেতন কী? অবচেতন নিয়ে জার্মান মনস্তাত্ত্বিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড বহু লেখা লিখেছেন এবং তিনিই ‘আনকনশাস’ শব্দের প্রবর্তক। ফ্রয়েডের মতে আমাদের পার্থিব অস্তিত্বে প্রতিনিয়ত আমরা বহুল অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আনাগোনা করি। কিছু সুখের কিছু দুঃখের। দুঃখের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সাপ্রেশনের দ্যোতনা। কোনো কিছুতে বাধা পড়লেই তো দুঃখ হয় আমাদের। সেই বাধাকে আমরা ধামাচাপা দিই চাপা কান্না গোঙানির মধ্যে। কিন্তু আদতেই কি আমরা পারি সেই সমস্ত অভিজ্ঞতা ধামাচাপা দিতে? ফ্রয়েড বলছেন, কিছুই আসলে হারিয়ে যায় না। আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্তরে তা লুকিয়ে পড়ে এবং বিশেষ কিছু সময় বা ট্রিগারিং-এর ফলে তা আবার মস্তিষ্কের উপরিভাগে ভেসে ওঠে।
২।
ঋত্বিক ঘটক সুবর্ণরেখা ছবিকে সেই রকম একটা বিশেষ ঘটনা হিসাবে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। যে ঘটনা বাঙালি জাতির অবচেতনে লুকিয়ে থাকা ব্রতকথা, দেশভাগ, মন্বন্তরকে উসকে দেবে এবং তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্রিটিকাল চিন্তনে ব্রতী করবে। সেই কারণেই ছবির শুরুতেই দেখা যায়, ২৬ জানুয়ারিকে ঋত্বিক প্রতিস্থাপন করছেন জালিয়ানাওয়ালাবাগ দিবস হিসাবে। প্রথম থেকেই তিনি পরিষ্কার যে তাঁর কাছে ২৬ জানুয়ারি মানে একটাই সত্য এবং সেটা হল জালিয়ানাওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড, ভারতীয় গণতন্ত্র প্রতিস্থাপনের দিন নয়। ঠিক তেমনি এই দৃশ্যের মাধ্যমে তিনি উসকে দিতে চান আরেকটা বৃহত্তর ধারণা, ১৯৪৭-এর ১৫ অগাস্ট আসলে কাকে উদ্দেশ্য করে, স্বাধীনতার উল্লাস নাকি দেশভাগের যন্ত্রণা! ঋত্বিকের কাছে, সেই দিনটা একটাই সত্যকে বহন করতে পারে, তা হল, দেশভাগের মর্মান্তিক পরিণতি।

সীতা পৃথিবীর কন্যা। তাই এই জঙ্গল তার জ্ঞাতি। নিয়তি তাকে ঠেলতে ঠেলতে আবার তার জ্ঞাতিদের কাছে নিয়ে এসেছে। এইবারে শুরু হবে কঠিন আখ্যান। এইখানেই অভিরাম ফিরে পাবে তার পরিচয়। দলিত পরিচয় এবং এই একটা ঘটনা এবার রামকে নির্বাসিত করবে।
দেশভাগের পরে এপারে এসে, ঈশ্বর এবং তার বোন সীতা খুঁজে চলেছে, তাদের নতুন আস্তানা। তাদের স্বপ্নের আস্তানা যা সীতা তার অবচেতনে নিয়ে কলকাতার কলোনিতে বাস করছে। অন্যদিকে ঈশ্বরের বন্ধু হরপ্রসাদ চাইছে সমস্ত বাস্তুহারা মানুষদের নিয়ে এক নতুন ভোর দেখার স্বপ্ন। এখান থেকে ঋত্বিক ছবিটিকে নিয়ে যান বাংলার ভিতরেই আরেক বাংলায়, যেখানে আছে সুবর্ণরেখা নদী। এটাও একভাবে অবচেতনকে উসকে দেবার প্রক্রিয়া। গঙ্গাই আমাদের একমাত্র নদী নয়, যা সবসময় আমাদের কাছে একপ্রকার গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ঋত্বিকের এই আধুনিক আখ্যানের প্রেক্ষাপটের ভূমি হল, এই শব্দহীনা সুবর্ণরেখা। যার পারেই ঘটবে আরেকটি মর্মান্তিক আখ্যান। আমরা দেখব এক আধুনিক রামায়ণ।
৩।
রামায়ণের মূল ভাগ জুড়ে আছে, রাম-সীতার বনবাস। রামায়ণ শুরুই হচ্ছে এক ধরনের নির্বাসন দিয়ে। ঋত্বিকের নায়ক ঈশ্বর কি তাহলে নিজেকে নির্বাসন দিলেন নাকি এক বাংলা থেকে অন্য বাংলায় এসে তিনি এবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন এবং সেই স্বপ্ন সাকার করতে হলে তাকে হয়ে উঠতে হবে এই গল্পের বৃহত্তর পেট্রিয়ার্ক। এই নতুন বাংলার সর্বত্র ঘিরে আছে এক শান্ত গহীন জঙ্গল ও একটি পাথুরে প্রাচীন নদী। কিন্তু সেই জঙ্গল আদিম নয়। বিশ শতকে দাঁড়িয়ে তা এখন এক আধুনিক ভূমি যার মধ্যে দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে একটা রানওয়ে। তাই সেই জঙ্গলও আজ ভুলে গেছে তার অবচেতনকে। তার বর্তমান ঘিরে আছে যুদ্ধের আওয়াজ, আকাশ থেকে যুদ্ধ বিমানের ভেঙে পড়া ও তার ধ্বংসাবশেষ। সেই কারণেই সীতা এবং অভিরামের প্রেমের দৃশ্যে আমরা তাদের মুখ দেখতে পাই না। লো অ্যাঙ্গেলে দুজনকে বসে ফিসফিসিয়ে প্রেম ব্যক্ত করতে শুনি। এইখানে এই ইমেজের নির্মাণ পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই রকমের দৃশ্যে পাত্রপাত্রীর মুখের অভিব্যক্তি দেখানোই জরুরি, অন্তত হলিউড আমাদের তাই দেখিয়েছে। কিন্তু ঋত্বিকের কাছে তাঁর দর্শন গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই দৃশ্যে সামনের জঙ্গলে নিশ্চুপ হয়ে শুনতে থাকা ফ্রেমবন্দি মহীরুহের সারি ঋত্বিকের কাছে সবচেয়ে জরুরি। কারণ তিনি সীতার চরিত্র নির্মাণ করছেন। সীতা পৃথিবীর কন্যা। তাই এই জঙ্গল তার জ্ঞাতি। নিয়তি তাকে ঠেলতে ঠেলতে আবার তার জ্ঞাতিদের কাছে নিয়ে এসেছে। এইবারে শুরু হবে কঠিন আখ্যান। এইখানেই অভিরাম ফিরে পাবে তার পরিচয়। দলিত পরিচয় এবং এই একটা ঘটনা এবার রামকে নির্বাসিত করবে। তবে এইবারে তার গন্তব্য আধুনিক কলকাতা।

৪।
ছবির কথা যখন উঠলই তখন ছবি (Image) ও দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করা যাক। ঋত্বিকের ছবি-দৃশ্যপট নির্মাণের ভাবনা ও প্রতিস্থাপন সেই সময় সব থেকে আলাদা ও ইউনিক বলে মনে হয়েছে। এক রকম আকর্ষণ তৈরি করেছে বারে বারে। তাই একটা খোঁজ শুরু হয় যে কোথা থেকে ঋত্বিক এই অদ্ভুতভাবে অন্যরকম দৃশ্যপট নির্মাণের রসদ সংগ্রহ করেছেন। এই রসদের ভাণ্ডার হল তাঁরই সমসাময়িক শিল্পীদের আঁকা ছবি। শুরুর এক দৃশ্যে আমরা দেখি হরপ্রসাদের বউ ছোটো সীতা, অভিরাম এবং তার দুই সন্তানকে নিয়ে বসে আছে। এই ছবি দেখার পরে যখন দেখেছি চিত্তপ্রসাদের বিখ্যাত ছবি ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’, তখন স্বভাবতই পরিষ্কার হল ঋত্বিকের ছবি নির্মাণের আধারটা আসলে কী?
তবে যে ছবি প্রথম ভাবিয়েছিল তা হল, সীতার আত্মহত্যার পরে ঈশ্বরের সেই রক্তাক্ত বঁটি হাতে তুলে নেবার দৃশ্য। এই দৃশ্যে ঋত্বিক যেভাবে আলোর প্রয়োগ করেছেন পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখাতে, সেটা দেখে আমাদের মন চলে যেতে পারে চিত্তপ্রসাদ তথা সমস্ত জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট আমলের উডকাট ছবির ক্যানভাসে। চিত্তপ্রসাদও একটা সময়ের পরে প্রচুর উডকাট এঁকেছেন। উডকাটের পদ্ধতিতে থাকে কাঠের সার্ফেসের ওপর পাতলা ছেনি দিয়ে সেই কাঠের ত্বককে খুঁড়ে একরকম ভাস্কর্য শিল্পের মতোই একটা ফিগার বের করে আনার পদ্ধতি। এই বঁটি হাতে নেবার দৃশ্যটিও সেই রকম। দরমার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে আলো, কিন্তু তা দেখে মনে হচ্ছে একটা একটা আলোর তলোয়ার। আলো যেন ছবি চিড়ে ঢুকতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। এর সঙ্গে আরও এক হারিয়ে যাওয়া গল্পের কথা মনে করিয়ে দিয়ে যান ঋত্বিক। কলকাতার পটচিত্রে অমর হয়ে থাকা এলোকেশীর ছবি, যাকে তাঁর স্বামী বঁটি দিয়ে মাথা কেটে হত্যা করেছিল। অর্থাৎ মহিলাদের ওপর হতে থাকা অপরাধের এক প্রকার ধারাবাহিকতাকেই ঋত্বিক এখানে আবার উসকে দিতে চেয়েছেন বাঙালি মননে।

