স্বদেশী যুগে বিপ্লবের জোয়ার তুলেছিল শাক্ত গান
সবে তখন রাত শেষ হয়েছে। এক মা, দরজা খুলে দেখে বাঘছাল পরা তার জামাই দরজায় এসে দাঁড়িয়ে। “বেরোও গণেশ মাতা” বলে খুব হাঁকডাক করছে সে। হিমছোঁয়া ভোরের এমন নিষ্ঠুরতায় মায়ের বুকটা যেন ফেটে গেল তখন। চোখের জলে সেই মা তখন টের পেল বিধাতার বিধানে মেয়ে এখন আর তার নেই । অতএব তারপর, সেই মা শতকষ্টেও নিজের মেয়েকে তুলে দিল ‘হরের হাতে’।
এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য ঠিক কি ভুল সে বিতর্ক নাই বা এল। তবু, বাঙালি, অবাঙালি নির্বিশেষে ভারতীয় সমাজে, বিয়ের পর কন্যা বিদায়ের এ এক চিরকালীন ছবি। এ ছবি তাই ছুঁয়ে থাকে আমাদের আধ্যাত্মিকতায়, সাহিত্যে, সংগীতে, বিশ্বাসে, চেতনায়। বাংলার সাহিত্য সংরূপের অনেকখানি জায়গা জুড়ে থাকা শাক্তপদাবলী বা শ্যামাসংগীতেও এ ছবির পবিত্র প্রকাশ। তবে শুধু কন্যাবিদায় নয়, পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের সব সুখ-দুঃখে সেখানে অনুভূত হয় আদ্যাশক্তি, জগজ্জননীর পরিপূর্ণ উপস্থিতি। সৃষ্টিকর্ত্রী মহামায়া সেখানে কখনও পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ কখনও বা তাঁর জগৎ সংহারকারী এলোকেশী রূপে প্রকাশিত। বিষয়ের বিষ আর সময়ের করাল স্পর্শে জর্জরিত মানুষ চিরকাল বিশ্বাসের বেড়া বেঁধেছে ভক্তির তার দিয়ে। আর তাতেই বর্ণে গন্ধে গীতিতে ছন্দে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে এমন সব পদাবলী।
আঠারো শতকের সময়পর্বে বাংলায় শাক্তপদাবলীর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হলেও এর বহু বছর আগে থেকেই এখানে শক্তি পুজোর প্রচলন ছিল। বেদের যুগেই অন্ধকার, কালহরণের যে রূপ কল্পনা করা হয়েছিল তাতেই লুকিয়ে ছিল কালীমূর্তির প্রতিরূপ। জগজ্জননীর রূপকল্পনায় শক্তির উপাসকরা তাই সেই রূপকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। ভক্তের বিশ্বাসে সর্বশক্তিমান এই দেবী তার মা। আর সেইভাবেই পুরাণ, তন্ত্রশাস্ত্র, চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য এইসব হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে শাক্তপদাবলীর প্রেরণা। বিপর্যয় থেকেই নতুন আশার যেমন উদ্ভব, ধ্বংসের স্তূপে দাঁড়িয়েই যেমন সৃষ্টির জয়গান। তেমনই এক ঘোর অরাজক অবস্থায় বহুবছর ধরে চলা এক সংস্কারের, স্বমহিমায় পুর্নপ্রতিষ্ঠার সুযোগ মেলে আঠারো শতকের এই বাংলায়। বিদেশি বণিকের অশুভ ছোঁয়াচ যখন সবে লাগতে শুরু করেছে আমাদের সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতিতে, তখন দৈনন্দিন জীবনেও হতাশা মুক্তিতে একটু আলোর খোঁজে কালহরণকারী কালীর আরাধনা ও শাক্তপদের পুনর্জন্ম হয়। আলোর পথ আসলে অন্ধকার খুঁড়ে খুঁড়ে পথ চলা। তাই কোথাও গিয়ে মিলে যায় বিজ্ঞান ও বিশ্বাস। সংবেদী পাঠক, দর্শকমাত্রই তাই অনুভব করতে পারে ব্ল্যাক হোল থিয়েরির কৃষ্ণগহ্বরে ছায়া ফেলে শাক্তপদের আখর। সৃষ্টিজন্মের অপার রহস্য ধরা পড়ে শাক্তকবির অনুভবে, “…ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন মুণ্ডমালা কোথা পেলি!”
দিল্লি সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়ে নতুন করে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের শোষণের উগ্রতায় অষ্টাদশ শতাব্দীর বাঙালি বিধ্বস্ত হয়েছে বারবার। সঙ্গে বিষফোঁড়া হয়ে ছিল বর্গির আক্রমণ। এইসবে মিলে জেরবার বাঙালি এক পরিপূর্ণ সমর্পণের আশ্রয় খুঁজেছে শ্যামাঙ্গিনী মাতৃমূর্তিতে, আদিভূতা সনাতনী দেবী মূর্তিতে। ফলে করের বোঝায় নুয়ে পড়া বাঙালি, শাসকের হাতে অত্যাচারিত বাঙালির দুর্বিষহ পীড়িত ছবিও উঠে এসেছে এ সময়ের শাক্তপদে। ভক্তহৃদয় শাক্তকবি রামপ্রসাদের সঙ্গে গেয়ে উঠেছে, “মা গো তারা ও শঙ্করী, কোন অবিচারে আমার ’পরে, করলে দুঃখের ডিক্রি জারি?” কিংবা “আমায় ফিকিরে ফকির বানায়ে, বসে আছ রাজকুমারী”। আর এইসব পঙক্তির আড়ালে লেখা হয়ে গিয়েছিল শক্তিপূজার অন্তর্ভুক্ত তন্ত্রসাধনার গূঢ় তত্ত্বকথাও।
বাংলার সমাজজীবন যে নানা কুসংস্কারের চাদর জড়িয়ে বহুকাল আরামের ওম নিয়েছে নির্বিকার চিত্তে, শাক্তকবিদের নজর এড়ায়নি সে বিষয়ও। গৌরীদান প্রথা, সতীন কাটা, পুরুষের বহুগামিতার নানা নিদর্শনও তাই উঠে এসেছিল শাক্তপদে। শাক্তপদকর্তা কমলাকান্তের পদে মেলে তেমনই ছবি, “এক সতীনের জ্বালা, না সহে অবলা, যাতনা প্রাণে কত সয়েছে../তাহে সুরধুনী, স্বামী সোহাগিনী, সদা শঙ্করের শিরে রয়েছে।” সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে ব্যক্তিগত জীবনে যে শক্তির উন্মোচন প্রয়োজন হয়েছিল, তারই সুষ্ঠ আধার ছিল এই শাক্তপদাবলী। তাই কেবল কালী নয়, শক্তির বিভিন্ন রূপ দুর্গা, চণ্ডী, চামুণ্ডা প্রভৃতি সব শক্তি আরাধনাই স্থান পেয়েছিল শাক্তপদে। শাক্তপদাবলীর তাই অন্যতম পর্যায় ‘আগমনী ও বিজয়া’। শতশত বছর পেরিয়ে আজকের দিনেও বাঙালি সযত্নে আগলে রেখেছে যে গানগুলিকে। ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী’ রবে আজও আমাদের দুর্গাপুজো আসে।
প্রতিক্ষণেই ‘সময়’ কথা বলে। বহুকাল আগে এই শাক্তপদাবলীর যে নাম ছিল ‘মালসী’ সে কথা তাই জানা যায় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর চর্যাপদগুলিতে। পরে পরে আরও প্রমাণ মিলেছে যে আঠারো শতকে যে নতুন কলেবরে শাক্তপদাবলীর জন্ম হল, সেখানে কেবল ‘আগমনী ও বিজয়া’ নয়, ‘জগজ্জননীর রূপ’, ‘ভক্তের আকুতি’, ‘মনোদীক্ষা’ ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায় ছিল। একই সঙ্গে ধর্মের তত্ত্বকথা ও বাস্তব সমাজের নানাদিক সেইসব ‘পর্যায়ে’ স্থান পেয়েছে সুকৌশলে। বাংলার শাক্তপদাবলীর প্রবাহমানতার ইতিহাসটিও বেশ চমৎকার। মাতৃসাধক রামপ্রসাদ সেনের হাতে অষ্টাদশ শতকে শাক্তপদের জনপ্রিয়তা শুরু। এতই সে প্রভাব যে শাক্তপদ অনেক সময়েই ‘প্রসাদী সংগীত’ বলে পরিচিত হত। এই ধারারই সৃজনশীল প্রকাশ শাক্ত সাধক রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, শাক্তকবি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, কালী মির্জা, শ্রীধর কথক, মহারাজা মহাতাব চাঁদ, অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, রামলাল দত্ত, গোবিন্দ অধিকারী প্রমুখের হাতে। পরবর্তীতে নিজে না লিখলেও বহু শাক্তগানই দক্ষিণেশ্বরে বসে কন্ঠে ধরেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ‘সংগীতকল্পতরু’তে স্বামী বিবেকানন্দ সংকলন করেছেন বেশ কিছু শ্যামাসংগীত। আর রবীন্দ্রনাথ! তিনি তো ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় লিখে ফেলেন আস্ত একটি শাক্ত পদ, “কালী কালী বল রে আজ”। শুধু তাই নয়, অক্ষয় চৌধুরীর “এত রঙ্গ শিখেছ কোথা মুণ্ডমালিনী’ আর ‘রাঙাপদ পদ্মযুগে প্রণমি গো ভবদারা” এই বিশেষ গান দুটিও ব্যবহার করেন তাঁর ওই নাটকে।
‘মন রে কৃষিকাজ জানো না’ বলে যে সাধনপথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন রামপ্রসাদ, সেখানে প্রথাগত ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানবধর্মের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে বারবার। তাই পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি শুধু “জয়া যোগেন্দ্র মহামায়া” বা “খৃষ্টে আর কৃষ্টে কিছু প্রভেদ নাই রে” গেয়ে খান্ত হননি এই বাংলায়, তাঁর নামে কালীমন্দিরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলকাতার বুকে। মুন্সি বেলায়েৎ খান এই কলকাতার বুকেই “কালী কালী বলে কালী সহায় হইলে কালী…. ঘুচিবে এই বিরহানল” লিখে ‘কালীপ্রসন্ন’ খেতাব পেয়েছেন। ভক্তি প্রেম আত্মনিবেদনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বলতে পেরেছেন, “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন”। স্বদেশী যুগে বিপ্লবের জোয়ার তুলতেও এইজন্যে সক্ষম হয় শ্যামাসংগীত। কারণ সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথ ছোঁয়ার তীব্র আকুতি সবযুগেই ধরা পড়েছে শ্যামাসংগীতে। শ্রদ্ধেয় ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য, লালচাঁদ বড়াল, আখতারিবাই, রামকুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে এইসময়ের শিল্পীর কন্ঠেও শাক্তপদাবলীর সেই সর্বধর্ম সমন্বয়ী সুরটিই বেজেছে বারবার। ‘চরণ কালো ভ্রমর কালো’ পেরিয়ে কালো যেখানে ‘কালোয়’ মেশে, ‘আলোয়’ মেশে, যুগপৎ ‘বিশ্বাস ও যুক্তি’ তে মেশে, সেখানেই যুগ যুগ ধরে বাঁধা আছে, থাকবেও শাক্তপদের প্রাণ।
তথ্যঋণঃ ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য, শ্রী শশিভূষণ দাশগুপ্ত
ছবি – পার্থ দাশগুপ্ত
