অপ্রাকৃতিক প্রমাণ করতে গেলেও তা একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হয় – পর্ব ২
বিজ্ঞানীরা বললেন, একই পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা দু’জন যমজ ভাইদের দেখে তা বোঝা সম্ভব নয়। কারণ তাদের মধ্যে এত মিল এবং তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশও এতই এক যে পরিবেশগত প্রভাবের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পার্থক্য বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ধরা যাচ্ছে না। তখন তারা তাদের গবেষণার ধরনে একটা বদল ঘটালেন। তারা সেই সমস্ত যমজ ভাইদের ওপর গবেষণা করলেন যারা বিভিন্ন কারণে ছোটো থেকে একে অপরের থেকে দূরে থেকেছেন। বললেন, ছোটো থেকে একে অপরের থেকে দূরে বেড়ে ওঠার পরও, দুই ভাইয়ের মধ্যে যে মিল পাওয়া যাবে সেগুলিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই জিনগত বলে ধরে নেওয়া যাবে। অন্যদিকে, অমিলগুলোকে পরিবেশের প্রভাব বলে নির্দিষ্ট করা যাবে। কিন্তু, পরিবেশগত সেইরকম কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হল না, যা তাদের যৌনাভিমুখতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। উপরন্তু একটি চমকপ্রদ প্রবণতা সামনে এল।
এই যমজ ভাইয়েরা যারা সমকামী এবং ছোটো থেকে আলাদা বড়ো হয়েছেন, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তারা তাদের ভাইয়ের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করছেন। এই প্রবণতা, যে ভাইয়েরা একসঙ্গে বড়ো হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। একই সঙ্গে তারা পরিবেশের প্রভাবের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ উড়িয়েও দিলেন না। তারা বললেন, জিনের মাধ্যমে যৌনাভিমুখতার উত্তরাধিকারের সম্ভাবনা (হেরিটেবিলিটি ফ্যাক্টর) ০.৫। ফলে এর ওপর পরিবেশগত প্রভাবেরও অনেকটাই অবকাশ রয়েছে।
আরও পড়ুন: সমকামিতা ও প্রকৃতি : কতটা বিজ্ঞানমনস্ক আপনি?
সমকামিতাকে ধ্রুপদী অভিযোজনীয় তত্ত্ব মানতে হলে তার কোনো প্রজননীয় পারদর্শিতা দেখাতেই হবে। কিন্তু সেটা কী? কিছুজন বলেলেন, সমকামীরা তাদের বিষমকামী ভাই-বোনদের বাচ্চাদের প্রতি বেশি স্নেহপ্রবণ, তাদের বেশি ভালোবাসেন ইত্যাদি। অর্থাৎ তারা নিজেরা বাবা-মা না হয়েও অপরের বাচ্চাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেন। কিন্তু, কিছু গবেষণা আবার বলল, এ সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। সমকামীরা কোনো দিক থেকেই বিষমকামীদের থেকে বেশি স্নেহপ্রবণ বা সাহায্যশীল নন।
বিজ্ঞানীরা অন্যান্য প্রজাতি, যাদের মধ্যে সমকামিতা দেখা যায়, তাদের পরীক্ষা করে বললেন, এদের মধ্যে আন্তর্লৈঙ্গিক টানাপোড়েন মেটানোর একটা বৈশিষ্ট্য আছে। সামাজিক বা লৈঙ্গিক এই টানাপোড়েনের মিটমাট হয় সমকামী যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। আবার Dungflies-দের মধ্যে দেখা যায় যারা সাবালক তারা নাবালকদের প্রজননগত ট্রেনিং দিতে, অর্থাৎ তারা সাবালক হয়ে কিভাবে নারী মাছিদের আকৃষ্ট করবে ইত্যাদি শেখানোর সময় অনেকসময়ই সমলিঙ্গের নাবালক মাছিদের সঙ্গে (ছদ্ম) যৌন ক্রিয়ায় মগ্ন হয়। একটি পুরুষ মাছের উল্লেখ পাওয়া যায় যে কিনা ক্ষণিক নারী রূপ ধারণ করে আরেকটি পুরুষ মাছের সঙ্গে মিলিত হয়। পুরুষ মাছ ছদ্ম-প্রজননের ফলে ক্লান্ত হয়ে গেলে, সেই পুরুষ মাছ আর কোনো স্ত্রী মাছের সঙ্গে সঙ্গম করতে পারে না। তখন যে মাছটি নারী রূপ ধরেছিল সে পুনরায় পুরুষরূপে ফিরে এসে স্ত্রী মাছের সঙ্গে মিলিত হয়। তারা এইভাবেই অন্যান্য পুরুষ মাছকে সরিয়ে নারী মাছের সঙ্গে মিলনের এবং তার বীর্য সম্বলিত সন্তানাদি উৎপাদনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। বিজ্ঞানীরা এই বিচিত্র প্রজননীয় কৌশল দেখে ক্ষণিক বা কৌশলগত সমকামের সঙ্গে সারাজীবন শুধুমাত্র সমকামী থেকে যাওয়ার বৈশিষ্ট্যকে আলাদা করতে চাইলেন। এই জাতীয় লৈঙ্গিক অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটানোর কিংবা এরকম আরও অনেক প্রজননীয় কৌশল আছে যারা ধরণে অযৌন। সেহেতু অনেকেই এই প্রশ্ন তুললেন এই সমস্ত প্রক্রিয়াগুলো থেকে এই সাময়িক সমকামী আচরণকে আলাদা করা কি উচিৎ হবে শুধুমাত্র তার যৌন চরিত্রের জন্য?
বিজ্ঞানীরা এই বিষয়েই আরেকটি সম্ভাবনার কথা বলছেন। যার আভিধানিক নাম ইন্ডিরেক্ট জেনেটিক এফেক্ট (IGE)! একটা উদাহরণ নিয়ে ব্যাপারটা বোঝা যাক। আগের অনুচ্ছেদেই সেই গুবরে মাছির কথা লিখেছি যারা নিজেরা সাবালক হয়ে নাবালক মাছিদের প্রশিক্ষণ দেয়, কীভাবে প্রজনন করতে হবে ইত্যাদি। এই করতে গিয়ে কোনোভাবে সাবালক মাছিটি নাবালক মাছির জিনে ইন্ডিরেক্ট প্রভাব ফেলতে পারেন, যার ফলে এবার থেকে নাবালক মাছির যৌন জীবন অন্য খাতে প্রবাহিত হতে পারে। সে যখন সাবালক হবে, তখন সে’ও নাবালক মাছিকে প্রশিক্ষণ দেবে, কিন্তু তার জিনে ইন্ডিরেক্ট প্রভাবের জন্য সে হয়তো এই প্রথাগত প্রশিক্ষণের বাইরেও, যৌনভাবেই সমকামী যৌনতা অভ্যাস করবে।
বিজ্ঞানীরা মানুষের কাছাকাছি প্রজাতির মধ্যেও এই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। প্লেটিরাইন প্রাইমেট ও ক্যাটারাইন প্রাইমেটদের মধ্যে গবেষণা করা হয়েছে। প্লেটিরাইনদের নিজেদের মধ্যে সমকামে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা অনিয়মিত এবং এর কারণ মূলত অযৌন। মূলত বন্ধুত্ব স্থাপন, বিবাদ মেটানো কিংবা অন্যের ওপর প্রভুত্ব অর্জনই তাদের এই জাতীয় আপাত যৌন, কিন্তু আসলে অযৌন সমকামিতার কারণ। অন্যদিকে, ক্যাটারাইন প্রাইমেটরা, যারা অভিযোজনীয় স্তরে মানুষের আরো কাছের, তাদের মধ্যে সমকামী যৌনতা অনেক নিয়মিত এবং তার কারণও বিবিধ, যেমন : বিবাদ মেটানো, অন্তর্লৈঙ্গিক দ্বন্দ্ব মেটানো থেকে শুরু করে (বিভিন্ন কারণে) জোট বাধা কিংবা সঙ্গী হিসাবে বেছে নেওয়া প্রভৃতি। এমনকি, তাদের মধ্যে সমকামিতা যৌন এবং সমলৈঙ্গিক যৌন সঙ্গী বাছাকে কেন্দ্র করেও অনেকসময় তাদের মধ্যে অন্তর্লৈঙ্গিক ও আন্তর্লৈঙ্গিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়। অর্থাৎ, অভিযোজনীয় স্তরে সমকামিতার স্বাভাবিক উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।
গবেষণার আরেকটি ধারায় মানুষের মস্তিষ্কে এই সমকামিতার কারণ খোঁজার চেষ্টা চলেছে। তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সমকামী ও বিষমকামী পুরুষদের হাইপোথ্যালামাসে পার্থক্য লক্ষিত হয়েছে। হাইপোথ্যালাসের সম্মুখভাগের যে অংশটি মানুষের যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে মোট চারটে অঞ্চল রয়েছে। এদের বলে ইন্টারস্টিসিয়াল নিউক্লিয়াই অফ দ্য অ্যান্টেরিয়র্ হাইপোথ্যালামাস ১, ২, ৩, ৪। এর মধ্যে তৃতীয় অঞ্চলটি বিষমকামী পুরুষদের, নারীদের ও সমকামীদের তুলনায় দ্বিগুণ বড়ো। সেখান থেকেই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, হাইপোথ্যালামাসের এই অংশটি যৌন অভিমুখতার জন্যও নির্দিষ্ট হতে পারে। কিন্তু, এখান থেকে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে তবে কি নারী আর সমকামীদের হাইপোথ্যালামাস এক? বিজ্ঞানীরা বলছেন না। কারণ, যে গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে, তার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। AIDS মহামারির সময় যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের ব্রেণ থেকেই এই স্যাম্পেল গুলো নেওয়া হয়েছিল। সেখানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম ছিল। যারা ছিলেন তারা বিষমকামী। তাই হাইপোথ্যালামাসের সংশ্লিষ্ট অংশ যদি যৌন অভিমুখতাকে নির্দিষ্ট করে থাকে, আর দুজনেরই পুরুষদের প্রতি আকর্ষণের জন্য বিষমকামী নারী ও সমকামী পুরুষের মতিষ্কের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আকার এক হয়ে থাকে, তাহলে একই যুক্তি মেনে লেসবিয়ান এবং বিষমকামী পুরুষদের হাইপোথ্যালামাসের এই ৩য় অঞ্চলের আকারও এক হওয়ার কথা। কিন্তু সেই পরীক্ষা করা যায়নি। কারণ কোনো সমকামী নারীর স্যাম্পেল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সমকামীদের যাদের থেকে স্যাম্পেল সংগ্রহ করা গেছিল তার সংখ্যাও সম্পূর্ণ সমকামী গোষ্ঠী সাপেক্ষে খুবই ছোটো। উপরন্তু, সমকামীদের তারাই এই মহামারিতে বেশি মারা গেছিলেন যারা যৌন মিলনে গ্রহীতার ভূমিকায় থাকেন। সেহেতু, যারা ইন্সার্টিভ ভূমিকা নেন, তাদের হাইপোথ্যালামাসের স্যাম্পেলও গ্রহণ করা যায়নি। ফলে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তের সত্যতা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, সমকামী পুরুষদের মস্তিষ্কে সুপ্রাচ্যাওস্ম্যাটিক নিউক্লিয়াস (SCN), বিসমকামীদের তুলনায়, ১.৭ গুন বড়ো আর সেখানে ২.১ গুন বেশি নিউরোন থাকে। ভ্যাসোপ্রেসিন নিউরোনের উপস্থিতির ক্ষেত্রেও একই ধরণের ছবি চোখে পড়ে। SCN-র রস্ট্রোকডাল অক্ষও সমকামীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড়ো। এর ঠিক সন্নিহিত অঞ্চলে সেক্সুয়ালি ডাইমরফিমক নিউক্লিয়াসের (SDN) অবস্থান। পুরুষদের SDN নারীদের তুলনায় ২.২ গুন বড়ো এবং কোষের সংখ্যাও বেশি। সেখানে সমকামী ও বিষমকামী পুরুষদের মধ্যে আকার ও কোশের সংখ্যার কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। অতএব, সমকামী ও বিষমকামী পুরুষেদের মধ্যে পার্থক্যের জায়গা হল SCN। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে SCN অনেকটা জৈবঘড়ির মতো কাজ করে এবং এটি বিভিন্ন হরমোনঘটিত শারীরিক ও ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপ ও সার্কেডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। এই অঞ্চলটি মানুষের যৌন জীবনও নিয়ন্ত্রণ করে বলে মনে করা হয় কারণ মানুষের যৌনতার সাথে সার্কেডিয়ান ছন্দের যোগাযোগ আছে।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও সমকামিতার অভিযোজনীয় গুরুত্ব কি তা নিয়ে ধন্ধ ও দ্বন্দ্ব দুই-ই রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বাস করেন, আপাত প্রজননীয় প্রতিকূলতা দ্বারাই একে বিচার করা উচিৎ নয়। কারণ অভিযোজন একটি বৃহৎ প্রক্রিয়া, জটিলও। তাই শুধুমাত্র প্রজননগত সীমাবদ্ধতা দিয়েই একে ব্যাখ্যা করা বা বোঝা হয়তো সম্ভব নয়। যদি অভিযোজনীয় কোনো স্তরে অযৌন কারণেও এটি শুরু হয়ে থাকে, সময়ান্তরে তার ব্যবহারিকতা ও অভিযোজনীয় গুরুত্ব বদলেও যেতে পারে। যেমন, যদি লৈঙ্গিক অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটানো বা উপরে বর্ণিত অন্যান্য যে অযৌন কর্মলক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে তার জন্যেও অভিযোজনীয় কোনো স্তরে এর আবির্ভাব হয়ে থাকে এবং তা মাঝের প্রতিটি অভিযোজনীয় স্তরে উদ্বর্তিত হয়ে আজ আধুনিক মানুষের মধ্যেও বর্তমান, তাহলে তা থেকে দুটো জিনিস প্রমাণিত হয়ঃ
এক, এটি যদি কোনো একটি অভিযোজনীয় স্তরের র্যানডম কোনো মিউটেশনও হয়, তার অন্য স্তরে এসে ভিন্ন ব্যবহারিকতা থাকতে পারে। তবে প্রাণীজগতে এর প্রাচুর্যতা দেখে অনেক বিজ্ঞানীই একে ‘র্যা নডম মিউটেশন’ বলে মনে করেন না। আবার, অনেক বিজ্ঞানীরা আগের দাবিটিকেই উল্টোভাবে বলেন। সমকামিতা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম (উল্লেখ্য, সমকামীরা ব্যক্তিবিশেষে অক্ষম নন, কিন্তু সমকামী যৌনতা সন্তান উৎপাদনে সহায়ক নয়), অতএব, এই স্তরে এটির ঋণাত্মক নির্বাচন সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই স্তরে এটির নির্বাচন ঋণাত্মক হলেও, অভিযোজনীয় অন্য স্তরে এটি ধনাত্মকও হতে পারে, যেমন লৈঙ্গিক অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটাতে, বা দলের মধ্যে ভ্রাতৃত্বভাব বজায় রাখতে, কিংবা ছদ্ম মিলনের মাধ্যমে নিজের প্রজনন সুনিশ্চিত করা বা মায়েদের উর্বর গর্ভের অধিকারিণী করা ইত্যাদিতে সমকামিতা কার্যকরী, অর্থাৎ ধনাত্মক। সেহেতু, অনেকেই মনে করেন, এই রকম বহু ছোটো ছোটো ধনাত্মক জিনগত অনুকূলতাই একসাথে সমকামিতায় ভাষা পেয়েছে। সমকামিতার একমাত্রতা কিভাবে আমাদের সমাজে এল সেটা এখনও গবেষণা সাপেক্ষ। তবে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না সমকামিতার একমাত্রতা অনেকটাই সাংস্কৃতিক।
আর দুই, প্রাণী জগতের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে যেমন সমকামিতা বর্তমান, তেমনই মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও সুনির্দিষ্ট ভাবে এই চারিত্রিকতা বর্তমান। আমরাও উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের থেকেই এটি পেয়েছি, তাতে সন্দেহ নেই। ফলে এতে এটি যেমন প্রমাণিত হয় যে সমকামিতা নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই মনুষ্যপ্রজাতির এই অভিযোজনীয় স্তরে বিদ্যমান, তেমনই এ’ও প্রমাণিত হয় এটি যৌনতার একটি পছন্দের বিকল্প বা favoured variant। তা না হলে কোনোভাবেই অভিযোজনে স্তরের পর স্তর উদ্বর্তিত হত না।
এইক্ষেত্রে একটি গবেষণা পত্রের বয়ান খুবই প্রণিধানযোগ্য। তাঁরা বলছেন, সমকামিতার আপাত প্রজননগত সীমাবদ্ধতার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ আমরা এর যে অভিযোজনীয় গুরুত্বের কথা স্বীকার করছি, সেই গুরুত্বকে খুব বড়ো বা দুর্দান্ত কিছু হওয়ার প্রয়োজন নেই। সে খুবই ছোটোও হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই হইচই, বৈজ্ঞানিক আয়োজন ও বৌদ্ধিক তর্কের এর মধ্যে সেই ছোটো ক্ষুদ্র সম্ভাবনাটি ঢাকা পড়ে আছে।
যেখান থেকে লেখাটা শুরু করেছিলাম, শেষ করার আগে, সেখানে একটু ফিরে যাওয়া যাক। মাননীয় পাঠক যে গবেষণার রিপোর্টের লিংক শেয়ার করেছিলেন, সেই গবেষণাটি এখনও পর্যন্ত সব থেকে বেশি সংখ্যক স্যাম্পেল নিয়ে হওয়া গবেষণা। এই গবেষণায় প্রায় পাঁচ লক্ষ্য মানুষের জিনোম স্টাডি করা হয়েছে। তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলের কথা উপরেই লিখেছি। সেই রিপোর্টটির শেষের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আছে। মন্তব্যটি করছেন ইএমবিএল ইউরোপিয়ান বায়োইনফরমেটিক্স ইন্সটিটিউট এর ডিরেক্টর, যিনি নিজেও একজন জিনতত্ত্ববিদ্। তিনি বলছেন LGBTQ+ মানুষদের দাবিদাওয়া নিয়ে সামাজিক আন্দোলন চলছে, তার পাশাপাশি চলছে সমাজতত্ত্বের নিরিখে এই বিষয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা। কিন্তু এর পাশাপাশি এই আলোচনাকে একটি শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজন রয়েছে কারণ এটি গুরুত্বপূর্ণ।
তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদের মধ্যেও অনেক সময় দেখা যায় সমকামিতা নিয়ে ছুঁৎমার্গ রয়েছে। অনেকসময়ই তাঁরা বিজ্ঞানমনস্কতার ভানের আড়ালে তাদের সামাজিক শুচিবায়ুতাকে ঢাকার চেষ্টা করেন। অনেকে একে ‘অপ্রাকৃতিক’ বলে দাগানোর চেষ্টা করেন। তারা ‘অপ্রাকৃতিক’ শব্দটির অর্থ বুঝে বলেন কী না তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই যেখানে প্রকৃতি সেখানে পৃথিবী, যা কিনা সেই ব্রহ্মাণ্ডেরই অতি ক্ষুদ্র একটি পরিসর তাতে কী করে ‘অপ্রাকৃতিক’ কিছুর অস্তিত্ব এল তা তাঁরা ভেবে দেখেন না। বিজ্ঞানমনস্কতার প্রাথমিক শর্তগুলোর একটি হল কোনো কিছুকে অবৈজ্ঞানিক, ‘অপ্রাকৃতিক’ প্রমাণ করতে গেলেও তা একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হয়। তার জন্য বিষয়টিকে বোঝার এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই জটিল ক্রিয়াকাণ্ডের নিরিখে তাকে স্থাপন করার দ্যোতনা নিহিত থাকে। নিজেদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শুচিবাইগ্রস্থতাকে বিজ্ঞানের নাম দিয়ে নিজেকে মহান ও অন্যান্যদের (এক্ষেত্রে, LGBTQ+ মানুষদের) হীন প্রতিপন্ন করার মধ্যে অবিজ্ঞানের বীজ, শোষণের বীজ এবং সর্বোপরি অজ্ঞতার বীজ নিহিত থাকে।
বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হল এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বোঝা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বোঝা সহজ নয়, এটি একটি জটিল গ্র্যালন্ড ডিজাইন। আমরা আমাদের মানুষিক সীমাবদ্ধতা দিয়ে সেই গ্র্যাজন্ড ডিজাইনটিকে বোঝার চেষ্টা করছি। সেই প্রচেষ্টায় বিজ্ঞান ততটাই যতটা এখনও পর্যন্ত আমরা আমাদের বিভিন্ন প্রকার সীমাবদ্ধতা ও মতান্তরের মাধ্যমে সেটিকে বুঝতে পেরেছি বা বুঝতে পেরেছি বলে মনে করছি। কিন্তু, প্রকৃতি আমাদের কাছে আমাদের বোধগম্যতার নিরিখে ধরা দেয় না। সে তার নিজস্ব জটিল বিচিত্র বৈশিষ্ট্য নিয়েই বর্তমান। অতএব, কোনোকিছু আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না মানেই তা অপ্রাকৃতিক হয়ে যায় না। এক্ষেত্রে সমকামিতাকে ধ্রুপদী অভিযোজনীয় তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারছে না মানে, এটি সমকামিতার দোষ বা সীমাবদ্ধতা নয়। এটি তত্ত্বটিরই সীমাবদ্ধতা।
(শেষ)
বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ কৌস্তভ চক্রবর্তী
বিঃ দ্রঃ সহজ এবং বোধগম্য করে লেখার জন্য অনেকাংশে গবেষকদের বিশ্লেষণকে সরলীকরণ করা হয়েছে। পাঠকরা এই বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে এই ভেবে গ্রন্থপঞ্জীটি দেওয়া হলঃ
https://drive.google.com/file/d/1iCPnf-rUW_fWqnDxC79YKuEgFm6WCAOD/view?usp=drivesdk
