
নোবেলজয়ী রজার পেনরোজের গবেষণায় কলকাতা-যোগ
এবছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন ব্রিটেনের রজার পেনরোজ, জার্মানির রেনহার্ড গেঞ্জেল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্দ্রেয়া ঘেজ। মহাবিশ্বের রহস্যময় ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণার জন্য যৌথভাবে তাঁদের এই সম্মাননাপ্রাপ্তি। নোবেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরস্কারমূল্য ১০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনারের অর্ধেক দেওয়া হবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পেনরোজকে। বাকি অর্ধেক রেনহার্ড গেঞ্জেল এবং আন্দ্রেয়া ঘেজকে ভাগ করে দেওয়া হবে।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুর ১০ বছর পর পেনরোজ গাণিতিকভাবে দেখিয়েছিলেন, সাধারণ আপেক্ষিকতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিই ব্ল্যাকহোল। সেগুলির উৎপত্তি কীভাবে, পেনরোজ তা গণিতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, ব্ল্যাকহোলের মধ্যে একটা সীমানায় পৌঁছে ভেঙে পড়ে প্রকৃতির যাবতীয় নিয়ম। সেই গবেষণার জন্যই এত বছর পর নোবেল পেলেন তিনি। ব্ল্যাকহোল গবেষণায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং।
আন্দ্রেয়া ঘেজ এবং রেনহার্ড গেঞ্জেল
পেনরোজের এই গাণিতিক সমাধানের ভিত্তি ছিল বাঙালি বিজ্ঞানী অমল কুমার রায়চৌধুরীর উদ্ভাবিত সমীকরণ। যাকে ‘রায়চৌধুরী সমীকরণ’ নামে ডেকে থাকেন পদার্থবিজ্ঞানীরা। ‘লান্ডাউ-রায়চৌধুরী সমীকরণ’ নামেও এটি পরিচিত, কারণ, অমলবাবুর কিছু পরে এটিকে স্বতন্ত্রভাবে আবিষ্কার করেন রুশ বিজ্ঞানী লেভ লান্ডাউ। মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণায় এই সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অমল রায়চৌধুরীর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন রজার পেনরোজ। দু’জনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। কলকাতাতেও এসেছিলেন পেনরোজ।
বিজ্ঞানী অমল কুমার রায়চৌধুরী ১৯২৩ সালে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সেই পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতা। তীর্থপতি ইনস্টিটিউশন এবং হিন্দু স্কুলে অধ্যয়নে পর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৪ সালে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে এমএসসি উত্তীর্ণ হন। ডিএসসি করেন নিজের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই। আশুতোষ কলেজে অধ্যাপনা করার সময়ে তিনি এই বিখ্যাত সমীকরণটি আবিষ্কার করেন। যখন তিনি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (আইএসিএস)-এ কর্মরত ছিলেন, তখনই সমীকরণ নিয়ে তাঁর এই গবেষণা প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। পরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজ করতেন। শেষ জীবনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাকাশবিদ্যা চর্চা কেন্দ্রের দায়িত্ব পান। ২০০৫ সালে প্রয়াত হন এই বিরল প্রতিভাধর বিজ্ঞানী।
রজার পেনরোজ
অমল রায়চৌধুরী ভারতে সেভাবে খ্যাতি না পেলেও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে তাঁর নাম যথেষ্ঠ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্বীকৃতির ক্ষেত্রে প্রাচ্যের বিজ্ঞানীরা থাকেন অবহেলিত। প্রচারের আলো পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদেরই বেশি করে তুলে ধরে। আগে জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো যুগান্তকারী বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও এমন ঘটেছে বলে মনে করেন প্রচুর মানুষ। পদার্থবিজ্ঞানী অমল রায়চৌধুরী নোবেল পাননি ঠিকই, তবে রজার পেনরোজের নোবেলপ্রাপ্তিই তুলে ধরল অমলবাবুর গবেষণার কার্যকারিতা।
