‘বৃদ্ধিমান’ পাছে সাহেবি উচ্চারণে ‘বারডোয়ান’ হয়ে যায়, যন্ত্রের নাম বদলে দিলেন জগদীশচন্দ্র

গাছেরা আনন্দও পায়—তাঁর আবিষ্কারে চমকে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব

গাছেরও যে প্রাণ আছে, সে-কথা ছোটোরাও বুঝুক, চাইতেন জগদীশচন্দ্র। অথচ, এই কথা বোঝানো সহজ নয়। প্রকৃতিবিজ্ঞানের দুরূহ যুক্তি তিনি কীভাবেই বা ছোটোদের বোঝাবেন। তার সঙ্গে জুড়ে আছে গাছকে নির্জীব বস্তু ভেবে আসার দীর্ঘদিনের অভ্যেস। কিন্তু হাল ছাড়া যাবে না। তিনি চ্যালেঞ্জটা নিলেন। ছোটোদের পত্রিকা ‘মুকুল’-এ ১৩০২ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যায় একইসঙ্গে দুটি নিবন্ধ লিখলেন জগদীশচন্দ্র– ‘গাছের কথা’ ও ‘উদ্ভিদের জন্ম মৃত্যু’। পরে লিখলেন ‘নির্বাক জীবন’। নিবন্ধগুলি সে-সময়ে শুধু ছোটোদের মনোজগতে নয়, ‘বড়ো’-দের ভাবনার দুনিয়াতেও আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। এই যে ডালটা ভেঙে নিলাম, পাতা ছিঁড়ে নিলাম, কেটে ফেললাম আস্ত গাছ—এ যে হত্যা, অত্যাচার করা, এই বোধ হঠাৎ জন্ম নিলে তোলপাড় তো স্বাভাবিকই।  

তবে এমন সত্য খুব সহজে কেউ মেনেও নিতে চায় না। জনশ্রুতি, বার্নার্ড শ-ই নাকি মানতে চাইতেন না প্রথমে। ধুস, গাছের আবার প্রাণ থাকে নাকি! তারপর, ১৯২৮ সালে রয়্যাল সোসাইটির সভায় জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা শুনে ও তারপর আরো নানা প্রমাণ পেয়ে তিনিও চমকে গেলেন। এতদিনের ভাবনাগুলো বদলে বদলে যেতে লাগল। বিস্মিত বার্নার্ড শ নাকি রয়্যাল সোসাইটির সভায় জগদীশচন্দ্রের ভাষণ শুনে পরদিনই হাজির হয়েছিলেন তাঁর বাসায়। জগদীশচন্দ্র তখন বাসায় ছিলেন না। ফিরে এসে দেখেন, ঘরে উপহার হিসেবে কতগুলো বই। বার্নার্শ শ নিজের হাতে লিখে গেছেন, “জীবনবিজ্ঞানে পণ্ডিত এক ব্যক্তিকে জীবনবিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ এক ব্যক্তির উপহার।”

এই চমকে যাওয়ার ঘটনা তৎকালীন যুগে অনেকের সঙ্গেই ঘটেছে। জগদীশচন্দ্রকেও তাই নিরলস প্রচার আর পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হয়েছে উদ্ভিদজগত নিয়ে। ‘প্রবাসী’-তে ১৩২৬-এর বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর ‘আহত উদ্ভিদ’ লেখাটা তো চারপাশে বিপুল চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। এই প্রবন্ধ প্রকাশের প্রায় ন’বছর পর রবীন্দ্রনাথ লিখবেন ‘বলাই’ গল্পটি। বাগানের ‘আগাছা’ কাটা হলে বলাই সহ্য করতে পারে না। গাছেদের ব্যথায় কষ্ট পায়। এই ব্যথা, বিজড়ন কোত্থেকে পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বলাই? জগদীশচন্দ্রের গবেষণা ও লেখা কি আড়ালে ছিল না কোথাও?

গাছের বৃদ্ধি মাপার যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। তাঁর সাধ ছিল, যন্ত্রটির নাম বাংলায় রাখবেন—‘বৃদ্ধিমান’। কিন্তু ইংরেজদের জটিল উচ্চারণে সেই নামই ‘বারডোয়ান’ হয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে নাম বদলে রাখলেন ‘ক্রেস্কোগ্রাফ’। এই আবিষ্কার তোলাপাড় ফেলেছিল গোটা বিশ্বেই। বিখ্যাত ‘পাঞ্চ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কার্টুনে দেখা গিয়েছিল, একজন ঘরে বসে বাজনায় সুর তুলছে, আর সেই সুরে সাড়া দিয়ে গাছেরা নাচতে নাচতে ঢুকে পড়ছে ঘরের জানলা দিয়ে।

 জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন, গাছেরা ব্যথা পায়, তাদের আনন্দবোধও আছে। সম্প্রতি পিটার উলহেভেন দেখান, গাছেরা নিজেদের মধ্যে সমাজও তৈরি করে। মুমূর্ষূ গাছকে বাঁচিয়েও রাখে অন্য গাছ। এইভাবে গাছেদের পৃথিবীটাকে দেখার তৃতীয় নয়ন এঁকে দিয়ে গেছেন জগদীশচন্দ্রই। এ এক অপার বিস্ময়ের জগৎ। আমরা বুঁদ হতে পারি সেই দুনিয়ায় আজো…

কিন্তু, গাছেদের ব্যথা বুঝতে পারে কি আমাদের ‘উন্নয়ন’-এর যুক্তিবোধ ও লোভ? তাহলে এত ভয়ঙ্কর হারে সবুজ ধ্বংস হত না যে। আজ জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিন। এই সবুজ ধ্বংসের দুনিয়ায় বেঁচে থাকলে তিনি আজ সুখী মানুষ হতেন না নিশ্চয়ই।

ঋণ: স্বরাজ চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক সমীপেষু: গাছের প্রাণ বলেছেন, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯।  

Developed by DXDasia