
রানিম সাহিত্য আন্দোলন ভারতের দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল মাত্র ছয়জন লেখকের হাত ধরে। যা পরবর্তীকালে ত্রিপুরা, অসম-সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ইস্পাত কারখানা মানে বিশাল ভয়ংকর যন্ত্রদানবের রাজ্যপাট। গোটাকয়েক গ্রাম, পুকুর, টিলা, ধান, মাঠ, বন, জঙ্গল সব চলে যায়। পেটে ফার্নেসের ১২০০ ডিগ্রির লাল হাঁ, রোলিং মিলের মৃত্যুদাঁত, অ্যাসিড ট্যাঙ্কের পুকুর প্রতিমুহূর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে। নাইটশিফট ডিউটিতে সারা পৃথিবী যখন ঘুমের স্বপ্নরাজ্যে, তখন এই ছয় জন লেখকের ক্লান্তি অস্তিত্ব পিষ্ট হয় ধোঁয়া-ধুলো-গ্যাস আর ১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উত্তাপে প্রতিদিন। তাঁরা পালাতে পারেন না। কারণ মৃত্যুর এই ভয়ংকর মুখব্যাদনই ছিল তাঁদের সিকিউরিটি তথা ক্ষুধা নিরসনের বন্ডেড শর্ত।
এই রুক্ষতা ক্ষোভ বিদ্বেষের একটা ভেন্টিলেশন চাই যেমন হাড়গিলে চাষা রাগে পিষে মারতে পারে বড়োজোর ক্ষোভের কিছু পিঁপড়ে। ভুখা শ্রমিক ক্ষোভে পেটাতে পারে একমাত্র রোগা বউকে। কিন্তু সেই ছয় জন লেখক ইস্পাত কারখানাকে শায়েস্তা করতে গিয়ে প্রথাগত সাহিত্যের ড্রয়িংরুম তছনছ করলেন ভাষাকে রোলে চিড়েচ্যাপ্টা করে, নিজেদের মূল্যবোধের ওপর গেঁথে সৃষ্টি করলেন এক নতুন পরাভাষা, নতুন পরাবয়ন, নিজস্ব পরাজগৎ। যা হল – নিমসাহিত্য। নিমসাহিত্যের একটি ক্যাপশন, ‘জীবনের কোনো ধর্ম নেই – কার্যকারণের কোনো ব্যাখ্যা নেই।’ যা কিছু স্রেফ ধাঁধা চারপাশ জুড়ে এই বিশাল সিস্টেমেটিক চলমানতার বিরুদ্ধে নেটিভ নিম – লেখকরা ছিল অসম শক্তি। ফলে, এই আপ্তবাক্যটি দিয়ে সিস্টেমকে আঘাত করতে তারা আর কিছু না পেরে ভেন্টিলেশন হিসেবে নিম-লেখাকেই হাতিয়ার করেছিলেন।
নিম সাহিত্য কোনো তথাকথিত সাহিত্য বা নাদুসাহিত্য নয়। নিম সাহিত্য একটি জীবন্ত মনুষ্য শরীরের জীবনযাপনের, সেই শরীরের মুহুর্মুহু মানসিক অবস্থানের, সেই শরীরের বিচিত্র এবং নানা অনুভূতির, সেই শরীরজাত সুস্থ প্রলাপ, বাণীরূপ, গর্জন, হুঙ্কার, হাসি-কান্না-যন্ত্রণার এক একটি উলঙ্গ উচ্চারণ।
অর্থাৎ বন্ড দিয়েছিলেন, এই ইস্পাত কারখানার বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক সিস্টেম, এই পেশাগত মৃত্যুভয় তাদের সত্তাজিজ্ঞাসায় নিজেদের বদলে নেবেন। প্রথমে একই কারখানায় কাজ করলেও, তারা কেউ কাউকে চিনতেন না। লিখতেন টুকটাক গৃহস্থ অভিজ্ঞতার অভিধাবলী। কিন্তু পেশাগত এই যন্ত্রণা তাদের ধীরে ধীরে এক বছরের মধ্যেই একত্রিত করে ফেলে। রবীন্দ্র গুহ, সুধাংশু সেন, বিমান চট্টোপাধ্যায়, অজয় নন্দী মজুমদার, নৃসিংহ রায়, মৃণাল বণিক – এঁরা একে অপরের ক্ষোভ, রাগ দেখে বুঝে যান তা একই জাতের। অর্থাৎ আইনসম্মত মৃত্যুভয়!

সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিতে এল এক অস্থিরতা। শুরু হল পরিবর্তনের সৃয়মান যুগসন্ধিক্ষণ। নিম-লেখকরা লেখা শুরুর অনেক আগে থেকেই একটা সন্দেহ বহন করছিলেন দীর্ঘদিন চলে আসা সাহিত্য সম্পর্কে। মানুষের অবয়ব কি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে? জীবনের মূল্যবোধে কোনো নির্দিষ্ট ধরনই পাওয়া যাচ্ছে না। সন্দেহ থেকেই নিম-লেখকদের এল জগৎ ও জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধা।
নিম লেখকদের প্রাক-নিম আন্দোলনের পড়াশুনায় কখনও অ্যাংরি বা বিট জেনারেশনের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যা ছিল, তা একই দেশ, জাতি,জলবায়ু ও রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে জীবনযাপনের মিল হাংরি লেখকদের সঙ্গে। ফলে নিম আন্দোলনের Principal provoking factor যদি হয় ইস্পাত কারখানার জীবসত্তা, তবে Auxiliary factor ছিল হাংরিদের যাপিত এই ভূখণ্ডের অন্যান্য প্রেক্ষিতসকল। এছাড়াও নিম লেখালেখির মধ্যে অ্যাংরি বিট ধাঁচের মনন – প্রক্রিয়ার উপস্থিতি কিছু কিছু টের পাওয়া যায়। নিম-লেখকদের লেখায় কলকারখানার নতুন টেকনো-শব্দ, টেকনো-টেক্সচার, টেকনো-উপমা, টেকনো-ফর্ম, যা আগে কখনোই বাংলা লেখায় দেখা যায়নি।
এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন নিমসাহিত্য কী ও কেন? নিমসাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক বিমান চট্টোপাধ্যায় এ-বিষয়ে ব্যাখা করেছেন বিভিন্ন বইয়ে। নিমসাহিত্য কোনো তথাকথিত সাহিত্য বা নাদুসাহিত্য নয়। নিমসাহিত্য একটি জীবন্ত মনুষ্য শরীরের জীবনযাপনের, সেই শরীরের মুহুর্মুহু মানসিক অবস্থানের, সেই শরীরের বিচিত্র এবং নানা অনুভূতির, সেই শরীরজাত সুস্থ প্রলাপ, বাণীরূপ, গর্জন, হুঙ্কার, হাসি-কান্না-যন্ত্রণার এক একটি উলঙ্গ উচ্চারণ।
তাঁদের খাওয়া, ঘুম, আড্ডা, বোহেমিয়ানিজম, Politics of knowledge, Politics of choice, Politics of change ইত্যাদিতে শুরু হল একটা গুড়গুড় কম্পন। মনের রিখটার স্কেলে একজনের কম্পন অন্যজন পরিষ্কার পড়ে ফেলতে পারা যাচ্ছে। এই কম্পনের ফল – বিনির্মাণ। অথবা, ভাঙচুর অবশ্যম্ভাবী। নিমসাহিত্যের সার্বভৌমত্বে ঢুকতে গেলে তিনটি গেটওয়ে ১) না-সাহিত্য ২) অল্প-সাহিত্য ৩) তিক্তবিরক্ত সাহিত্য। যেকোনো গেট দিয়েই প্রবেশ হোক না কেন – কেন্দ্রবিন্দু একটাই।
শিল্পাঞ্চলের লালদুর্গ দুর্গাপুর টাউনশিপে ৭/৬ শর্ট রোড হয়ে উঠল নিম সাহিত্যের ঘাঁটি। কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল এইভাবে – মেরুদণ্ড : সুধাংশু সেন, পাকস্থলী : রবীন্দ্র গুহ, নাভিমূল : বিমান চট্টোপাধ্যায়, ফুসফুস : মৃণাল বণিক, কণ্ঠাস্থি : নৃসিংহ রায়, নিতম্বাস্থি : অজয় নন্দী মজুমদার। আসানসোল থেকে উদয়ন ঘোষ এসে একদিন বললেন, “আমিও আছি। মনুষ্যতন্ত্র গদ্য চাই। শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাই আমার প্রথম শর্ত।” এলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় রূপনারায়ণপুর থেকে। বললেন, “আমিও আছি। বাংলা ভাষার প্রবহমান স্রোতধারা অন্যখাতে প্রবাহিত করার স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন নয় – প্রতিস্পর্ধীও নয়।” কলকাতা থেকে এলেন শংকর চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল বসাক, জামশেদপুর থেকে বারীন ঘোষাল, কুচবিহার থেকে অরুণেশ ঘোষ। হাংরির সুবো আচার্য স্মরণযোগ্য নিমবাক্য লিখলেন। আরও অনেকে এলেন গণেশ সেন, রবীন সুর, প্রদীপ দাশ শর্মা, সুকৃতি বক্সী, তুষার চট্টোপাধ্যায়, অরুণ আইন, নিখিল বসু, সুভাষ ভট্টাচার্য, ক্ষিতীশ দেবশিকদার। শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিম সাহিত্যের লেখকদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন, কিন্তু নিম সাহিত্যের জন্য কোনো লেখা বা চিঠি পাঠাননি। পাঠিয়েছিলেন একটি বিজ্ঞাপন। সঙ্গে ৫ টাকা। বিজ্ঞাপনটির বিষয় ছিল, ‘বাংলা কবিতার বকেয়া মিটিয়ে দিন।’ শক্তির মতোই মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরী নিম সাহিত্যকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পত্রিকার জন্য কিছু লেখেননি। হয়তো হাংরি হাঙ্গামার দরুন যে হেনস্থা, তার জন্য কোনো নতুন ঝামেলায় জড়াতে চাননি। বস্তুতই নিম সাহিত্য নিয়ে তখন সর্বত্র উত্তেজনা, তিক্ত আলোচনা। শোনা যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিম সাহিত্য লুকিয়ে পড়তেন। অপবাদ রটেছিল নানারকম। নিম সাহিত্য অপ সাহিত্য, শিকড়হীন সাহিত্য, অনৈতিক সাহিত্য, স্টান্ট তথা চমকদার সাহিত্য বা নিম সাহিত্য আদৌ সাহিত্যই নয়। উৎপল কুমার বসুর মতো আরও অনেকেই নিম সাহিত্যকে পাত্তা দেননি।
নিম সাহিত্যের মূল বিষয়গুলি ছিল:
১) সাহিত্য অভিজ্ঞতার ফল নয়, অবিকৃত অভিজ্ঞতাই সাহিত্য।
২) জীবনের কোনও ব্যাখা নেই, কার্যকারণের ভবিষ্যৎ নেই।
৩) শিল্পহীনতার থেকে বন্ধনহীনতার দিকে।
৪) বোধের মূলে নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করুন।
৫) ব্যক্তিগত বিস্ফোরণ চাই।
৬) নিম সাহিত্য একটি গাণিতিক চেতনা। সাহিত্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বদলকরণ। নতুন ব্যাকরণ।
৭) ব্যারেলের ওপর থেকে প্রজাপতিটি উড়িয়ে দিন।
৮) লেখক হওয়ার বাসনা জাগা মাত্রই আত্মহত্যা করুন।
৯) দুঃসাহসিক শাব্দিক বৈভব, বোধচর্চিত শ্লেষ জীবনের যাবতীয় ধোঁয়া ধুলোর কথাই সাহিত্য।
১০) এই মুহূর্তে চাই গদ্যের উল্লম্ফন, বিতর্ক ব্যঙ্গ, বীভৎস বক্রোক্তি।
১১) মানব আত্মা + দৃশ্য জগতের আত্মা = কবিতা। কবি ঈশ্বরের সমগোত্রীয়।
১২) জীবনের প্রায় সবকিছুই তছনছ। এখন চাই আত্মিক দ্বিধাদ্বন্দ সঙ্গম সংঘর্ষ এবং তদজ্জনিত রক্তক্ষরণের পুনরালোচনা।
১৩) নিম লেখকদের অস্তিত্ব অবিরাম হা-হা আর্তনাদ। তাঁরা ঘিলুর ফাঙস সাফ করতে চান। তাঁদের রক্তে টগবগ করে ফোটে ভালোবাসা। তাঁরা বিশ্বাস করেন শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হামেশাই বদল করে।
১৪) জগতের যাবতীয় বিষয় সম্পদের ওপর মানুষ ও কীট পতঙ্গের সমান অধিকার।
১৫) তত্ত্ব বিতরণ নয়, তৈরি হোক জীবনের শব্দজোট। বিবেক+আত্মা+হৃদয়।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিম সাহিত্যের লেখকদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন, কিন্তু নিম সাহিত্যের জন্য কোনো লেখা বা চিঠি পাঠাননি। পাঠিয়েছিলেন একটি বিজ্ঞাপন। সঙ্গে ৫ টাকা। বিজ্ঞাপনটির বিষয় ছিল, ‘বাংলা কবিতার বকেয়া মিটিয়ে দিন।’
নিম লেখকদের মধ্যে অন্তত দুজন তরুণ তুর্কি ছিলেন। মৃণাল বণিক এবং বিমান চট্টোপাধ্যায়। নিম লেখকরা যথেষ্ট ভেবেচিন্তে একটি ছক তৈরি করলেন। সেটা ফের খচিয়ে দিল কলকাতার মসিহস্তিদের। ছকটা আগুন জ্বালিয়ে দিল সুতানুটি গোবিন্দপুরে। ১ নং সুতারকিন স্ট্রিট ক্রোধে ফেটে পড়ল। চুনোপুটিদের লেলিয়ে দিল আর মসিহস্তিরা ছুটলো লালবাজারে।

হাংরি এবং শাস্ত্র বিরোধীদের পৌনঃপুনিকতা থেকে না-সাহিত্য অল্প সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন – অতিষ্ঠ অস্তিত্বের প্রাণবায়ু। এঁরা তৎকালীন, অর্থাৎ সত্তরের সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার জ্যামিতিক নকশাও বানিয়েছিলেন। এই নিম-নকশা নিয়ে তখনকার বাংলা বাজারে লেখক মহলে খুব ধামাকা হয়েছিল। কফি হাউসে হাতাহাতি, ইস্পাত কারখানার গেটে পোস্টার: ‘সাহিত্যের অতীত মৃত। এখন আমাদের নিয়ে সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য নিম সাহিত্য। সমুদয় মৃত সাহিত্যকে আসুন জ্বালিয়ে দিই।’
ঘনঘন টেলিফোন আর তারবার্তা গেল দুর্গাপুরে। পুলিশি তহকিকাৎ আর পার্টির ধমকানি শুরু হয়ে গেল। কালো ভ্যান আসে আর ধমক দিয়ে ফিরে যায়। বারবার আসে। কখনও রবীন্দ্র গুহ, কখনও সুধাংশু সেন কিংবা বিমান চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এসব কাণ্ড সুতারকিন স্ট্রিটের মসিহস্তিদের মাথা থেকে বেরোচ্ছে। নাটের গুরু হলেন উদার স্নেহশীল সাগরময় ঘোষ। বেঁটেখাটো লোকটির পিঠের ওপর মস্তবড় একটা থলে। থলের ভেতর উঁকিঝুঁকি মারে জবর জবর মুণ্ডু। একটি মুণ্ডু বিমল করের, একটি সমরেশ বসুর, একটি গৌর কিশোর ঘোষের, একটি সন্তোষ কুমার ঘোষের, একটি সুনন্দর। সর্বকনিষ্ঠ মাথাটি ছিল সুনীল গাঙ্গুলির। আরও অনেক নামী মাথা ও মুণ্ডু – যেমন নীরদ সি চৌধুরী, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী।
এভাবে নিম সাহিত্যের স্রোত স্টিল সিটি থেকে জব চার্ণকের মহানগর পর্যন্ত গড়িয়ে গেল, সাহিত্যের ঘাঁটিগুলিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটল। গঙ্গা পেরোতে পারলেন না বিমান চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্র গুহ বিতাড়িত হলেন কলেজ স্ট্রিট থেকে। বাড়ির সামনে পুলিশের কালো ভ্যান। যাই হোক, নিম সাহিত্য করার শুরুতেই লেখকরা মেনে নিয়েছিলেন শব্দের সংকরায়ণ একটি জরুরি ব্যাপার। শব্দ বানানোর জন্য যেকোনো ভাষা থেকে মাল মশলা নেওয়া যেতে পারে। বাংলা নয় এমন শব্দও বাংলার পাশে স্থান করে নিতে পারে। সম্ভবত এই কারণেই বঙ্গভাষা বাবু মানসে খুব ব্যথা লেগেছিল। ভাষার প্রতি খরদৃষ্টি এবং জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক আছে এমন দুজন বাকসফল লেখক সতীনাথ ভাদুড়ী ও কমলকুমার মজুমদার এঁদের চিন্তা চেতনার খুব কাছাকাছি ছিলেন।
এবার দেখা যাক নিম লেখকেরা কী ধরনের সাহিত্য প্রচেষ্টা করেছিলেন। প্রথমত রবীন্দ্র গুহর ‘ঝুঁপড়ি’। তাঁর ক্ষিপ্ত টালমাটাল নিম উপন্যাস, ‘নাভিকুণ্ড ঘিরে’। মৃণাল বণিকের শিল্পায়ন ভিত্তিক গররাজি গল্প ‘মানুষ মর্কটমচ্ছব’, বিমান চট্টোপাধ্যায়য়ের তিক্ত বিরক্ত গল্প ‘প্রথম সমীকরণ’, নৃসিংহ রায়ের না-গল্প ‘বর্তমান পুরুষ’, নন্দ চৌধুরীর অল্পস্বল্প গল্প ‘সুখের পায়রা’, সুধাংশু সেনের হরাইজেন্টাল কবিতা ‘আদিখ্যেতা’ এবং তাঁরই না-প্রবন্ধ না-আলোচনা ‘নকশী কাঁথার ফানুস ও অস্ত্রশস্ত্র’। কিন্তু, যেহেতু কলকাতার একশো আশি কিলোমিটার দূরে থেকে সাহিত্যে মুক্কা বা ঘুঁষি মেরে ভূকম্পন তোলা যায় না। সুতরাং পাঁজরে ঘি মালিশ না করে রক্তে কব্জি ডোবালেন নিম লেখকেরা। অতিরিক্ত স্লোগান থাকল:
১) জীবনকে অষ্টপ্রহর বিব্রত করো। রক্তমোচনই মোক্ষ। শাশ্বত।
২) না-গল্প, না-কবিতাই সাহিত্যের মূল্যমান। স্থানিকতা প্রশ্রয়ী কার্যক্রম।
৩) সাহিত্যে বৃহৎ বিষয় বলে কিছু নেই।
৪) যৌনতাই যথার্থ হৃদয়বত্তা। ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সাবধান।

নিম-নকশা নিয়ে তখনকার বাংলা বাজারে খুব ধামাকা হয়েছিল। কফি হাউসে হাতাহাতি, ইস্পাত কারখানার গেটে পোস্টার: ‘সাহিত্যের অতীত মৃত। এখন আমাদের নিয়ে সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য নিম সাহিত্য। সমুদয় মৃত সাহিত্যকে আসুন জ্বালিয়ে দিই।’
সব শেষে বলা যায় সমকাল বা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের উপর নিম সাহিত্য কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছিল। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে কিছু কিছু তরুণ লেখকের লেখায় প্রথা ভাঙার ধাঁচ, প্রতিবাদ, নতুন ফর্ম খোঁজার চেষ্টা, কিছু শব্দকে বিকল্পভাব প্রকাশের কাজে ব্যবহার – un conventional ক্রাফট, বক্তব্যে লজিক্যাল ক্র্যাক, মাল্টি ডাইরেকশনাল গতি ইত্যাদি লক্ষ করা গিয়েছিল। দুই দশক ধরে এবং এখনও হাংরি চর্চা ও নিম চর্চা ধারাবাহিকভাবে বহমান। নতুন শতকের পর থেকে নিম নিয়ে এই প্রজন্মের তীব্র কৌতূহল প্রকাশ পাচ্ছে। দু-হাজার সালের পর থেকে নিম সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রচুর লেখা হচ্ছে। কেউ কেউ নিম-গবেষণায় পিএইচডি করছেন।
অসাধারণ নিম-দলিল করে প্রয়াত হয়েছেন প্রিয় কবি অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় (২০০৩)। তারপর আলোর পাখি (২০০৫), অভিমুখ (২০১৫), কবি সম্মেলন, তথ্য সংস্কৃতি (২০১০), বিকল্প শরীর (২০০৮), সপর্যা (২০০৮), গল্পবিশ্ব (২০০৮), নবাবী (২০০৩, ২০০৪), বাংলা সাহিত্য আন্দোলন (২০১৪) এছাড়াও আরও অনেক পত্র পত্রিকা আছে। ভাষা বা ফর্মে নিমকে দেখে-পড়ে অনেকেই সাহসী হয়েছেন। যা তাঁদের লেখায় ফুটে উঠছে। বিষয় ভাবনা ও লেখালেখিতে বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
___________________
তথ্যসূত্র:
নিমসাহিত্য সংকলন: সৌম্যব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় | রবীন্দ্র গুহ, কালবৃত্তের বাইরে স্বনির্বাসিত এক যুবরাজ: অজিত রায়
