
বাঙালির জীবনকে যে বিশেষ কয়েকটি জিনিসের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায় তাদের মধ্যে ‘চপ – মুড়ি’ অন্যতম। চপ-মুড়ি থেকে আমাদের বাঙালি সমাজের শ্রেণিবিন্যাস করা সম্ভব। যাঁরা গরিব মানুষ বা খেটে খাওয়া মানুষ তাঁদের কাছে ব্রেকফাস্ট এই চপ-মুড়ি। যাঁদের কাছে এঁদের থেকে বেশি পয়সা আছে, কিন্তু নিম্নবিত্ত তাঁরা সন্ধেবেলায় চপ–মুড়ি খেয়ে টিফিন সারেন। যাঁরা ছোটো দোকান চালান, বা দোকানে কাজ করেন তাঁদের মধ্যে এই প্যাটার্ন দেখা যায় । যাঁরা মধ্যবিত্ত তাঁরা মাঝে মাঝে সন্ধেবেলার আড্ডা জমাতে বাড়িতে চপ কিনে এনে মুড়ি মাখেন। এছাড়া যারা রেগুলার বাইরে আড্ডা মারেন তাঁদের মধ্যেও এই চপ–মুড়ি খাওয়ার প্রবণতা আছে। বড়োলোকেরা চপ–মুড়ি খান না। খেলেও, জাস্ট ব্যাপারটা টেস্ট করার জন্যই খান। যদিও এই চপ–মুড়ি কোথাও প্রতিষ্ঠিত ব্রেকফাস্ট। এটা একধরনের কমফর্ট ফুড। সহজেই কিনতে পাওয়া যায়, দাম কম, সুস্বাদু। তাই সাধারণ মানুষের জীবনের অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এই খাবার। যদিও ডাক্তারবাবুদের কাছে এই খাবার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা আছে বলে মনে হয় না। আমি ডাক্তার নই, তাই খালিপেটে ব্রেকফাস্ট হিসেবে মুড়ি আর চপ খাওয়ার অপকারিতা নিয়ে জ্ঞান বিতরণের গুগুল নির্ভর স্পর্ধা দেখানোর রাস্তায় হাঁটতে আগ্রহী নই।
একসঙ্গে বসে চপ-মুড়ি খাওয়ার মধ্যে আসলে জাতি-ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে এক শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।
শহর বা মফঃস্বলে কান পাতলে শোনা যায় বিভিন্ন তেলেভাজার দোকানের নাম। এই দোকানগুলোর নাম আসলে ঢুকে পড়েছে আমাদের ফোকলোরের মধ্যে। জমজমাট পাড়ায় অবশ্যই একটি চপের দোকান গজিয়ে উঠবেই। আমি চন্দননগরে বড়ো হয়েছি। তাই, ছোটোবেলা থেকে বলা তেলির চপ, বা অজিতদার দোকানের চিকেন পকোরার কথা আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে। নৈহাটিতে আমার মামার বাড়ি। সেখানে ন্যাড়া ছাদে বসে পানুর দোকানের চপ আর তেলমুড়ি অন্য লেভেলে হ্যালু দিত এককালে। তারপর জীবনের অনেকটা সময় কলকাতা শহরে কাটিয়েছি। সেখানে লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ, কালিকা, মুখরুচি, পটলার দোকানের গপ্পো শুনেছি, খেয়েওছি। কোথাও চপ খেতেন শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, গিরীশ ঘোষ, কোথাও আবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। আমি যদিও কলকাতা শহরের চপ খেয়ে হতাশ! এমএসসি পড়ার সময় দুই বছর কল্যাণী শহরে কাটিয়েছি। সেখানে লোটে মাছের চপ ছিল ইউনিক। আমার মনে হয় এই তেলেভাজার টেস্ট ছোটোবেলা থেকে যেভাবে তৈরি হয় সেটাই আপনাকে ফিউচারে চালিত করে। তাই হয়তো আমার চন্দননগর মার্কা স্বাদকোরক কল্যাণীর চপকে আপন করে ফেললেও কলকাতার চপকে পর করে ফেলেছে। কলকাতার চপের সঙ্গে বিভিন্ন মহাপুরুষের স্মৃতির স্পর্শ জুড়ে থাকলেও আমার স্বাদকোরক সেসব বোঝেনি!
এই প্রসঙ্গে বলতে ইচ্ছে করছে যে, ক্যাফেময় সাউথ কলকাতার চপ, নর্থ কলকাতার চপের চেয়ে স্বাদে অনেকটাই পিছিয়ে। এখন যদিও আমি চাপযুক্ত এবং চপমুক্ত জীবনযাপন করি। কী করবো বলুন, ফেসবুক খুললেই ডাক্তারবাবু আর ডায়েটিশিয়ানদের ভিডিও দেখে ভয় ধরে গেছে। চপে একটা কামড় দিতে গেলেই ব্রেন হিসেব করতে থাকে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ আর কতটা খারাপ হল! ফেসবুকে একজন জলে ভাজা, কোলেস্টেরলমুক্ত, গ্রিন চপের কথা বলছিলেন বটে। ওটা নির্ঘাত ঢপের চপ! অনেকেই বিশুদ্ধ গুলতাপ্পি বোঝাতে ‘ঢপের চপ’ কথাটা বলে থাকেন। কিন্তু, যাদবপুর ইউনিভার্সিটির মিলনদা’র ক্যান্টিনে সত্যি সত্যিই ‘ঢপের চপ’ নামে একটি চপ কিনতে পাওয়া যায়।
তেলেভাজার দুনিয়ার চারমূর্তি — আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজি আর ফুলুরি। এছাড়া মোচার চপ, মাংসের চপ, ভেজিটেবিল চপ, ধনেপাতার বড়া, ক্যাপসিকামের চপ, লঙ্কার বড়া, টমেটোর চপ, মাছের চপ, সয়াবিনের চপ, মাশরুমের চপ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইংলিশ ব্রেকফাস্টে যে ‘হ্যাশ ব্রাউন’ এর উপস্থিতি তাঁকে আমার আলুর চপই মনে হয়! চপের দোসর মুড়ির বয়স কিন্তু চপের চেয়ে অনেকটাই বেশি। মঙ্গলকাব্যে মুড়ির উল্লেখ মেলে। যদিও চপ বা মুড়ি আবিস্কারের সঠিক ইতিহাস আমার জানা নেই। চপ বানাতে গেলে তার পুর হাতে চটকে বানাতে হয়। এক সময়ের বাঙালি সমাজে জাতপাত আর ছোঁয়াছুঁয়ির কথা ভাবলে চপ যে সমাজে গ্রহণযোগ্য হবে না এই কথা সহজেই অনুমেয়। তবে বিভিন্ন লেখাপত্তর উলটে-পাল্টে জেনেছি যে চপের আগমন ব্রিটিশ যুগেই।
শহর বা মফঃস্বলে কান পাতলে শোনা যায় বিভিন্ন তেলেভাজার দোকানের নাম। এই দোকানগুলোর নাম আসলে ঢুকে পড়েছে আমাদের ফোকলোরের মধ্যে। জমজমাট পাড়ায় অবশ্যই একটি চপের দোকান গজিয়ে উঠবেই।
ইংরেজিতে ‘চপ’ শব্দের অর্থ ফালি করে কাটা। সাহেবদের মধ্যে মাংস ফালি করে কেটে সেখান থেকে চপ – কাটলেট বানিয়ে খাওয়ার রীতি ছিল। ভারতবর্ষে এসেও তাঁরা সেইসব চপ – কাটলেট খেতেন। এদিকে তাঁদের এইসব খাবার দেখে বাঙালিদের যে লোভ হয়নি, এই কথা আমার জানা নেই। কিন্তু, সাহেবরা যেসব মাংস দিয়ে চপ বানিয়ে খেতেন তা বাঙালি ঘরে রান্না করা মুশকিল। তাই জীবহত্যা করে চপ বানিয়ে খাওয়ার পাপ থেকে বাঁচতে তাঁরা বেগুন, কুমড়ো, আলু এঁদের ‘চপ’ করা অর্থাৎ ফালি করে কেটে সেখান থেকে চপ বানানো শুরু করলেন। তারপর একদিন সেই চপের দোসর হয়ে উঠলো মুড়ি। সেই থেকেই শুরু চপ– মুড়ির জয়যাত্রা। আমার মনে হয় চপ–মুড়ির জনপ্রিয়তার নেপথ্যে টেস্ট, কম দাম ছাড়াও অন্য একটি ব্যাপার আছে। একসঙ্গে ডিনার টেবিলে খাওয়া, বা দস্তরখান বিছিয়ে মেঝেতে একসঙ্গে কয়েকজন মিলে ভোজন, অথবা মেঝেতে আসন পেতে পরপর বাড়ির লোকেদের খেতে বসা এইসব চিত্রগুলির দিকে একে একে চোখ রাখলে আমরা দেখতে পাবো যে আমাদের দেশে প্রায় সব ধর্মের মধ্যেই এই ‘একসঙ্গে বসে খাওয়া’ বিষয়টা কমন।
আমার কোথাও যেন মনে হয় এই চপ–মুড়ি খাওয়ার সঙ্গে এই একসঙ্গে বসে ভোজনের এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়। তৈরি হয় মানুষের মধ্যে দূরত্ব ঘোচার পরিস্থতি। এই কারণেই চপ-মুড়ির মধ্যে এই সাংঘাতিক ‘মাস অ্যাপিল’। তাই চপের জন্ম ব্রিটিশ যুগে হলেও বিপ্লবী আখড়ায় শালপাতার ঠোঙা আর চপ-মুড়ির জমাটি আসরের কথা জানা যায়। আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দশটি ‘মুড়ির মেলা’ হয়। মেলা মানেই ‘sense of togetherness’। হুড়ুম মেলা, মুলো মুড়ি মেলা, মুড়ির চাকের মেলা ইত্যাদি মেলার কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। হুগলির জিরাট, বাঁকুড়ার জয়পুর, উত্তর চব্বিশ পরগণার বসিরহাট, মালদার চাঁচল ইত্যাদি জায়গায় এই ধরনের মেলা বসে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার মুড়ি মেলা যার বয়স প্রায় ২০০ বছর। প্রতি বছর মাঘমাসে বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার দ্বারকেশ্বর নদের সঞ্জীবনী ঘাটে হয় এই উৎসব। লেখার শুরুতে চপ–মুড়ি খাওয়া নিয়ে সমাজের এক কাল্পনিক শ্রেণিবিন্যাস দেখিয়েছিলাম। কিন্তু, এই একসঙ্গে বসে চপ-মুড়ি খাওয়ার মধ্যে আসলে জাতি-ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে এক শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন লুকিয়ে আছে।
