কবিতা দিয়ে মনের চিকিৎসা কলকাতায়

শহরে কবিতা ক্লিনিকের আয়োজন করছে ‘হিলিং ওয়ার্ডস’

কলকাতার Zoom Tea-O-Graphy-তে আয়োজিত কর্মশালায়

গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ সং অফারিংস-এর ভূমিকায় উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস লিখেছিলেন, ‘আমি প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথ পড়ি, তাঁর কবিতার একটা লাইনই জগতের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারে।’

“I read Rabindranath every day, to read one line of his is to forget all the troubles of the world.”

ছবিতে আছেন মনবিশেষজ্ঞ নীলাঞ্জনা চ্যাটার্জি, ‘হিলিং ওয়ার্ডস’-এর রন্তিদেব মুখার্জি, বর্নমালা রায়, আয়েশা বেগম এবং Zoom Tea-O-Graphy-র সদস্যরা

‘কবিতা থেরাপি’ বিষয়টির সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছে শহরবাসী। সম্প্রতি, কলকাতার Zoom Tea-O-Graphy-তে রন্তিদেব মুখার্জি, বর্নমালা রায়, আয়েশা বেগম এবং অরিন্দম লাহিড়ী পরিচালিত একটি কর্মশালায়, এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা হয়, একাধিক কবিতা লেখা হয়।

কবিতা কি একজন ব্যক্তির মানসিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে? এ নিয়ে বিশ্বজুড়েই গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। তাতে ইতিবাচক সাড়াও মিলছে। ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধের বদলে কবিতা কিনে পাওয়া যাচ্ছে, এমনই একটি ফার্মেসির খবর পাওয়া গেছে ইংল্যান্ডের বিশপস ক্যাসেলে। ফার্মেসির নেপথ্যে আছেন কবি ডেবোরাহ আলমা ও জিম শেয়ার্ড। তাঁরা দুজনই কবিতার মাধ্যমে মনোরোগীদের চিকিৎসা করেন। এমনকি তাঁদের একটি অ্যাম্বুলেন্সও আছে। ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে রোগীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাঁদের ‘ইমার্জেন্সি পোয়েট’ও বলা হয়। (এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন এখানে ক্লিক করে

তবে, এহেন উদ্যোগে কলকাতাও কিন্তু আর পিছিয়ে নেই। ‘কবিতা থেরাপি’ বিষয়টির সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছে শহরবাসী। সম্প্রতি, কলকাতার Zoom Tea-O-Graphy-তে রন্তিদেব মুখার্জি, বর্নমালা রায়, আয়েশা বেগম এবং অরিন্দম লাহিড়ী পরিচালিত একটি কর্মশালায়, এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা হয়, একাধিক কবিতা লেখা হয়। সঙ্গে ছিলেন মনবিশেষজ্ঞ, অনুসরণ মেন্টাল হেলথ ওয়েলনেস ক্লিনিক অ্যান্ড রিসার্জ সেন্টার-এর প্রতিষ্ঠাতা নীলাঞ্জনা চ্যাটার্জি। এই কর্মশালার উদ্যোক্তারাই ‘হিলিং ওয়ার্ডস’ (Healing Words) নামে একটি কবিতা ক্লিনিক সিরিজের আয়োজন করেছেন, যার প্রথম অনুষ্ঠান হবে আগামী ১০ মার্চ। 

কবিতাকে ‘ওষুধ’ মনে করেন আরও অনেকেই। ২০১৮ সালে উইলিয়াম সিঘার্টের (William Sieghart’s) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একটি প্রতিষেধক পকেট বই। নাম ‘দ্য পোয়েট্রি ফার্মেসি : ট্রাইড অ্যান্ড ট্রু প্রেসক্রিপশনস ফর দ্য হার্ট, মাইন্ড অ্যান্ড সোল’। কলকাতায় ‘হিলিং ওয়ার্ডস’-এর এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য হলো, বিভিন্ন ধরনের মনের অসুখে কবিতাকে নিরাময়ের একটি উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা। নিঃসঙ্গতা, ভয়, মন ভাঙা, হতাশা ও মাত্রাতিরিক্ত অহংকার—এসব সমস্যার ক্ষেত্রে কাব্যিক প্রতিকারের কথা বলা। এই উদ্যোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন আয়েশা বেগম, বর্ণমালা রায়, রন্তিদেব মুখার্জি, অরিন্দম লাহিড়ী এবং শ্রেয়সী। কেউ সংস্থা সামলান, কেউ কবিতা এবং সংস্থা দুইয়েরই দায়িত্বে। “উইলিয়াম সিঘার্টের ‘দ্য পোয়েট্রি ফার্মেসি’ (The Poetry Pharmacy) থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আমাদের এই উদ্যোগ নেওয়া। বইটির জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কবিতা সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় কবিতা প্রেসক্রাইব করতেন।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন ‘হিলিং ওয়ার্ডস’-এর আয়েশা বেগম।

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল পোয়েটিকস-এ ট্রাজেডির আলোচনায় ‘ক্যাথারসিস’-এর কথা লিখেছেন। চিকিৎসাবিদ্যায় এর অর্থ হচ্ছে, অন্ত্রের অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান অপসারণ করা। প্রাচীনকালে রোগীর শরীরে রক্তচাপ বেশি হলে চিকিৎসকেরা কিছু রক্ত নিঃসারণ করতেন। অ্যারিস্টটল মনে করতেন, ট্রাজেডি দর্শকের মনে প্রবল ভীতি ও করুণা উদ্রেক করে। এভাবে দর্শকের মোক্ষণ ঘটে। সংস্কৃত আলঙ্কারিকেরা একে বলেছেন, সহৃদয়হৃদয়সংবেদী হয়ে ওঠা। মন তখন আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। মানুষ ভুলে যায় তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ-রাগ-ক্ষোভ। এই যে মনের সাময়িক মুক্তি, একেই স্থায়ীত্ব দিয়ে এ কালের মনোরোগ চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞরা হয়তো থেরাপির কাজে লাগাতে চাইছেন। তাঁদের মতে, ‘মন’ নিয়ে আরও কথা হোক, তবেই দূর হবে ‘সামাজিক কলঙ্ক।’ 

১০ মার্চ, বিকাল ৪টেয় দক্ষিণ কলকাতার সারফায়ার কোস্টাল ক্যাফে (Surfire Coastal Café)-তে ‘হিলিং ওয়ার্ডস’-এর অনুষ্ঠানটি হবে। অভিনেতা ও কন্ঠশিল্পী সুজয় প্রসাদ চ্যাটার্জি, নীলাঞ্জনা চ্যাটার্জির সঙ্গে কথোপকথন ছাড়াও অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের জন্য বেশকিছু কবিতাও পাঠ করবেন। প্রবেশ অবাধ (আসন সংখ্যা সীমিত)।  

Developed by DXDasia