সুকেশ মণ্ডল : হকার, রিকশাচালক, ক্ষেত মজুরদের বই প্রকাশ যাঁর লক্ষ্য

১০০-১৫০ লেখকের বই এ পর্যন্ত প্রকাশ করেছেন সুকেশবাবু

স্কুলের দরিদ্র ছাত্র বিমল মণ্ডলের কবিতা লেখার হাত ছিল চমকপ্রদ। স্কুলের শিক্ষকরাই কতবার তাঁর কবিতার সুখ্যাতি করেছেন। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের বিমল মণ্ডল কবি হতে পারেননি। চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটির কবিতা কোথাও কেউ পড়েনি, কেউ ছাপেনি তাঁর কবিতা। মান্না দে-র কালজয়ী গানে যেমন অমলের কথা রয়েছে – “কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ/ মুছে যাবে অমলের নামটা/ একটা কবিতা তার হলো না কোথাও ছাপা/ পেল না সে প্রতিভার দামটা।”

কিংবা বলা যায় ৬৫ বছরের শশাঙ্ক রাণার কথা। ক্লাসে তৃতীয় শ্রেণির ওপরে যাঁর আর ওঠা হয়নি। পশ্চিম মেদিনীপুরে ডেবরায় তাঁর বাড়ি। মেলায় বেলুন বা বাদাম ভাজা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ কবিতা লেখার অভ্যাস ছাড়েননি শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও। লোহার কারখানার শ্রমিক পাথরপ্রতিমার বসুদেব নস্কর কবিতা লিখেছেন ১,২০০-র বেশি। সঙ্গে নাটক, যাত্রাপালা। বাজকুলের শেখর পাল ৩০-৪০ বছর ছোট্ট চা দোকান চালিয়েও কবিতা লেখেন। চা দোকান চালিয়ে আর হয়ে ওঠেনি তাঁর কবিতার বইয়ের জন্য প্রকাশকদের দরজায় গিয়ে তদ্বির করা।

কবিতা লেখা হয়তো হয়ে যায়। কিন্তু তাঁদের কবিতার বই প্রকাশ যে স্বপ্নই রয়ে যায়! এরকম অনেকের স্বপ্ন কেবল স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়নি। বিমল মণ্ডল, শেখর পাল, বসুদেব নস্কর কিংবা শশাঙ্ক রাণার মতো ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষজনের কবিতার বই দিনের আলো দেখেছে। নেপথ্যে একজনই। তিনি বিমল মণ্ডলেরই গ্রামের ছাত্র। সুকেশ মণ্ডল। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু পাবলিশিং হাউস-এর মূল কারিগর। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর থানার জয়পুর গ্রামে দরিদ্র পরিবারে তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা। নিজে দরিদ্র প্রান্তিক পরিবারে মানুষ হওয়ার সুবাদে নিজেই উপলব্ধি করেছিলেন ‘প্রতিভার দাম’ যাতে সকলে পান সে চেষ্টা তাঁকেই করতে হবে। একাধারে সাহিত্যিক, প্রকাশক, গবেষক সুকেশ মণ্ডল নিজের সাহিত্য চর্চার বাইরেও উদ্যোগ নিয়েছেন একটা বৃহৎ ভাষাচর্চার বা ভাষা আন্দোলনের। প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহ দিতে তিনি তাঁদের বই ছেপে চলেছেন নিজের খরচে। এ পর্যন্ত আট জনের সাহিত্যকর্ম ছেপেছেন নিজের খরচে। ১০-১২ জনকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে বই প্রকাশ করেছেন।

বিমল মণ্ডল, শেখর পাল, বসুদেব নস্কর কিংবা শশাঙ্ক রাণার মতো ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষজনের কবিতার বই দিনের আলো দেখেছে। নেপথ্যে একজনই। সুকেশ মণ্ডল। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু পাবলিশিং হাউস-এর মূল কারিগর। পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর থানার জয়পুর গ্রামে দরিদ্র পরিবারে তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা।

সুকেশ মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বঙ্গদর্শন.কম। সুকেশবাবু জানান, “সুন্দরবন এলাকার বাসন্তী থানার নফরগঞ্জ গ্রামের হিমাংশু মিস্ত্রি পেশায় হকার। অভাবের সংসারে তিনি বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। হাতের লেখা মুক্তোর মতো। এবার কলকাতা বইমেলায় তাঁর কবিতার বই প্রকাশ হবে। কলকাতা থেকেই তাঁর খবর পেয়েছি। তাঁকে এখনও চোখে দেখা হয়নি।”

কেন তিনি এমন উদ্যোগ নিলেন? তাঁর বক্তব্য , “আমি যদি মুদ্রণ ব্যবসায় না আসতাম তাহলে আমার ভাবনা এত সহজে প্রকাশ করা যেত না। আমার নিজের লেখালেখি সবই সম্ভব হয়েছে এই মুদ্রণ কারিগরি বিদ্যা জানার জন্যই। অথচ আমি একজন প্রান্তিক পরিবারের সন্তান। সেরকমই প্রান্তিক মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর কথা তখনই ভাবি।”

সুকেশবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় থেকেই কঠিন লড়াইয়ের সাক্ষী থেকেছেন। চাকরি না পেয়ে আসেন ব্যবসায়। মুদ্রণ ব্যবসায় এসে খুঁজে পান নিজের জীবনের প্রিয় বিষয়টি- সাহিত্য। সাহিত্যিক হিসেবে সুকেশ মণ্ডলকে পরিচিতি দেয় ‘পণ্ডিত স্যার’ উপন্যাস। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন রাইসিনা হিলে। এরপর তৎকালীন রাজ্যপালের আমন্ত্রণে রাজভবনেও গিয়েছেন। বাংলাদেশের পাবনার মানসিক হাসপাতাল নিয়ে গবেষণা করেছেন। ১০০-১৫০ লেখকের বই এ পর্যন্ত প্রকাশ করেছেন সুকেশবাবু।

এরপরই তাঁর মনে হয়েছিল বিমল মণ্ডলের কথা। ৬৪ বছরের বিমল মণ্ডলকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন নিজের ছাপাখানায়। ২০১৭ সালে প্রথম বিমল মণ্ডলের কবিতার বই প্রকাশ হল। সেই পল্লীকবির প্রথম বইয়ের নাম ছিল ‘মায়ের আঁচল’। এরপর তাঁর ১২টি বই প্রকাশ করেছেন সুকেশবাবু। বেলুন বিক্রেতা শঙ্কর রানার ‘স্মৃতিকণা’ নামের একখানি কবিতার বই দিনের আলো দেখেছে। সুকেশবাবু খুঁজে খুঁজে এমন সব মানুষদের বের করেছেন যাঁরা কেউ দিনে রিকশা চালান, রাতে কবিতা লেখেন। আবার কেউ কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেও কবিতা লেখায় ভাটা পড়তে দেননি।

৫৬ বছরের সুকেশবাবু বলেন, “বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার সুবাদে আমার মনে হয়েছিল বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, মুকুন্দদাস, জসীমউদ্দীন এঁদের কখনওই প্রকাশকের দরজায় যেতে হয়নি। সে যুগে সংযোগের তেমন প্রচলন ছিল না। কিন্তু আজ প্রান্তিক মানুষরা তাঁদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে যাবেন না কেন? মূলত প্রকাশকদের টাকার চাহিদাই তাঁদের আটকে দেয়। খেটে খাওয়া মানুষরা কষ্টের পয়সা খরচ করে সাহিত্যকর্ম ছাপাতে কেন পারবেন? তাছাড়া জঙ্গলমহল বা সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষরা বই ছাপানোর জন্য কলকাতায় প্রকাশকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না।”

সেই ভাবনা থেকেই আজ প্রান্তিক মানুষের বই প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর মূল লক্ষ্য, বই প্রকাশ করে এঁদের সাহিত্যে আরও উৎসাহিত করা। বারবারই প্রান্তিক মানুষদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন তিনি। বিভিন্ন সাহিত্যসভায় গিয়ে খোঁজ করেন সেই প্রান্তিক কলমের অধিকারী লেখকদের। বই প্রকাশের পাশাপাশি তাঁদের সাহিত্যকর্ম জাতীয় গ্রন্থাগার, এশিয়াটিক সোসাইটিতে মূল্যায়ন করার কথাও বলেন। কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো তিনিও যেন বলতে চান, “আমি প্রকাশক যত কামারের আর কাঁসারির আর ছুতোরের,/ মুটে মজুরের/ যত হকারের…”

Developed by DXDasia