গুজবে কান দেবেন না

গুজব থেকে কী ভাবে দাঙ্গার সৃষ্টি হয়? কেনই বা রাষ্ট্রকে ঘোষণা করতে হয়, গুজবে কান দেবেন না?

আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের ঠিক দশ বছর আগের কথা। সালটা ১৭৬৬। কবি বায়রনের ঠাকুরদা দক্ষিণ আমেরিকা সফর সেরে তার জাহাজ ডলফিন এনে ভেড়ালেন লন্ডনের বন্দরে। ক্রমে রটে যেতে শুরু করল যে দক্ষিণ আমেরিকায় ডলফিন- এর অভিযাত্রীরা কিছু বিশালাকার মানুষের সন্ধান পেয়েছেন। প্রথমে জেন্টলম্যান্স ম্যাগাজিন এবং পরে লন্ডন ক্রনিকল-এর মত কিছু সংবাদপত্রে এই রটনা দিব্যি ঠাঁই পেয়ে গেল। জনশ্রুতিতে ঘুরতে লাগল সেই সুবিশাল আকৃতির মানুষ বা দানবদের কথা এবং তা ক্রমে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল। প্যাটাগন অর্থাৎ বৃহদায়তন পা এর অধিকারী এই প্রজাতিটি সম্পর্কে পরে যা জানা গিয়েছিল তাতে এই আদিবাসী প্রজাতির বিশালত্ব সম্পর্কে যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে।

গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে- আর সেই রটে যাওয়ার ব্রাহ্ম মুহূর্তেই সেই বার্তার শরীর থেকে উবে যায় সত্যের ছিটে ফোঁটা। এই বার্তাকে আমরা কখনও রটনা ইত্যাদি না মেডাকিবটে, তবে এহেন বার্তার ভালো নাম হল 'গুজব'। এ জাতীয় ছড়িয়ে পড়ার বার্তাকে ওই নামে ডাকতেই আমরা অভ্যস্ত। সাধারণ ভাবে মিথ, লিজেন্ড বা কিংবদন্তী বলতে আমরা যা যা বুঝি তার থেকে গুজব-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। মিথ বা লিজেন্ড মানুষের যৌথ অচেতনে বাহিত হয় দীর্ঘ দিন ধরে। ফ্রয়েড মানবীয় আকাঙ্খার প্রতি রূপ খুঁজে পেয়েছিলেন মিথ-এর মধ্যে। ইয়ুং ফ্রয়েডের মত কে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে। সমষ্টির অচেতনে, যৌথ স্মৃতি প্রদেশে মিথ এর উপস্থিতি হয়ে উঠে ছিল তার উপজীব্য। কিন্তু যৌথ অচেতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েও গুজব-এর চরিত্র এ ক্ষেত্রে আলাদা। জনশ্রুতি আসলে আধুনিকতার সঙ্গে এক রকম ভাবে সম্পৃক্ত, আবার নয়ও বটে। প্রাচীনকাল থেকেই কথা-র যে বিপুল ঐতিহ্যবাহিত হয়েছে গণ পরিসরে, গুজব তারই অঙ্গ। কিন্তু গুজবের সঙ্গে আরও বেশ কিছু বিষয়কে অবশ্যম্ভাবী ভাবে জড়িয়ে ফেলেছে আধুনিকতা। সেই প্রসঙ্গে আলোচনায় আসা যাক।

এই উদাহরণটি বাদ দিয়েও ইতিহাসে আরও বহু উদাহরণ মেলে গুজবের। এখন ইতিহাসে গুজব বিষয়টির ভূমিকা নিয়ে অনেক গবেষণা মূলক কাজ রয়েছে এবং ইতিহাস আলোচনায় গুজবের ভূমিকা রীতি মত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালে গর্ডন অ্যালপোর্ট এবং লিওপোস্ট ম্যান নামক দুই গবেষক গুজব সংক্রান্ত একটি গবেষণা করেন অনেকটা গাণিতিক পদ্ধতিতে। তারা একটি সংশয়াত্মক গুজব বাজারে ছড়িয়ে দেন এবং নজর রাখেন সেই গুজবের গতিবিধি সম্পর্কে। তারা লক্ষ্য করেন তারা প্রাথমিক ভাবে যে গুজবটি ছড়িয়ে ছিলেন তার জটিলতা ক্রমে তরলায়িত হচ্ছে জনশ্রুতিতে বাহিত হতে হতে। দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে এই গবেষণা কিন্তু এক অন্য ধরনের পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। পাশ্চাত্যের সভ্যতার প্রাণ কেন্দ্রে দক্ষিণ আমেরিকার একটি আদিবাসী প্রজাতির সম্পর্কে যে গুজব রটল, তা আসলে পাশ্চাত্যের জনমানসে অজানিত বর্বর সভ্যতা সম্পর্কে যে সাধারণ ধারণা বর্তমান ছিল তার অব্যবহিত ফল। অ্যালপোর্ট এবং পোস্টম্যানের গবেষণায় যখন দেখা যায় যে গুজবে পরিণত হতে হতে প্রাথমিক শ্রুতিতে যা ছিল তা ক্রমে অপেক্ষাকৃত কম জটিল এবং স্মৃতি ধার্য হয়ে উঠছে তখন এটা বুঝতে হয় যে সমাজ মানসের নির্দিষ্ট গঠনই জনশ্রুতির নির্মাণে একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং জনশ্রুতির এক প্রকার অভিযোজনে সাহায্য করে।

মৌখিক পরম্পরার এক আধুনিক স্তরে পৌঁছে গুজব বিষয়টির এক জাতীয় চারিত্রিক বদল ঘটেছে বলা চলে। মৌখিক পরম্পরার মধ্যে কিছু হল পুরা কথা, পুরাণ ইত্যাদি, এমনকি যদি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দেখি তাহলে রামায়ণ মহাভারত জাতীয় মহাকাব্য ও অনেকাংশে জনশ্রুতিতে বাহিত হয়েছে। রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী একবার বলেছিলেন মহাকাব্য পাঠের প্রয়োজন হয় না, মানুষ তা এমনিই মনে রাখে। মৌখিক পরম্পরার আরেক অংশ হল লোককথা, রূপকথা ইত্যাদি। আগেই বলেছি কথার এই দীর্ঘ ইতিহাসে গুজবের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। উনিশ শতকের কলকাতায় যে কেচ্ছা কাহিনীর প্রচলন ছিল তারও ভিত্তি কিন্তু ছিল অনেকাংশেই জনশ্রুতি। ছাপাখানা আসার আগে মৌখিক ছড়া ইত্যাদিতে বাবু সম্প্রদায়ের বিবিধ কেচ্ছা কিসসা ইত্যাদি ভ্রমণ করে বেড়াত। ছাপাখানা আসার পরে বটতলার বই এবং নকশা সাহিত্যে সেই সব জনশ্রুতিই স্থান পেল। এ জাতীয় কিছু বিক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। তবে মূল বক্তব্য এটিই যে আধুনিক সমাজে জনশ্রুতির পরিসর যাইই হোক; তার পরিণতি চিরন্তন নয়, শাশ্বত নয়। ইতিহাসে ক্ষেত্র বিশেষে তা উল্লেখ্য হতে পারে, নাও হতে পারে।

এ জাতীয় জনশ্রুতি যুদ্ধে বা দাঙ্গায় গুরুতর ভূমিকা নিতে পারে। মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত গণ মাধ্যমের যে বিবর্তন হয়েছে, মাস কালচার যা গ্রামশি কথিত হেজিমনির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তার যে পরিবর্তনশীল ধারা আমরা দেখেছি, তাতে জনমানসকে চাল না করার নানাবিধ পদ্ধতির সুলুক সন্ধান মেলে। নোয়াম চমস্কি তার বিখ্যাত মতবাদ 'ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট' নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন জনতা সাধারণত শান্তিপ্রিয়। তাকে উস্কে দেওয়ার জন্য গণমাধ্যম নানান ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। হিটলারের সময় গোয়েবেলস জার্মানদের মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ে ছিলেন গণ মাধ্যমের সাহায্য নিয়েই। আমেরিকাতে ও এই প্রবণতা বহুলাংশে জারি ছিল। 'ভিয়েতনাম সিনড্রোম'  এর মধ্যে ছিল গণমাধ্যম মারফত মানুষের মনকে তার বিপক্ষের বিরুদ্ধে যথেষ্ট বিষিয়ে তোলা। এদেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রচার করে অপর কোনো রাষ্ট্রকে মারপিটের বাইনারিতে দাঁড় করাতে রাতে গণমাধ্যম সব সময় সক্রিয় থেকেছে, সানি দেওলের বলিউড থেকে অর্ণব গোস্বামীর নিউজ আওয়ার। আর গণমাধ্যমের এই নিয়ন্ত্রক ভূমিকা গুজব বা জনশ্রুতির মাধ্যমে জনমত তৈরির লোকসাংস্কৃতিক ভিত্তিতে অনেকাংশেই আঘাত হেনেছে।

কিন্তু গণমাধ্যমের প্রচলিত কাঠামোকেও ব্যাপক ভাবে ধাক্কা দিয়েছে ইন্টারনেট। অন্তর্জালের দুনিয়া তামাম জনসাধারণের কাছে শুধু তথ্যের দরজাই খুলে দেয়নি, তাকে উপহার দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। মতামত প্রকাশের পাশাপাশি মিডিয়ার আলো পৌঁছোয় না এমন বহু ঘটনাকে প্রকাশ্যে আনার মাধ্যম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া প্রবল জনপ্রিয় হয়েছে। ফলে জনশ্রুতির গতি বেড়েছে। মৌখিক ভাবে ছড়িয়ে পড়ার থেকেও বেশি কার্যকরী এখন এই হাইটেক মাকড়সার জালের নতুন দুনিয়া। ভুয়ো মৃত্যু সংবাদ থেকে এলিয়েন আসার খবর সবই অনায়াসে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এই মাধ্যমে। কোনো মানচিত্রের গন্ডিও তাকে মানতে হয় না।

সাম্প্রতিক কালে দুটি গুজব পশ্চিমবঙ্গে আলোড়ন ফেলেছিল যে প্রসঙ্গে কথা বলে এ আলোচনায় আপাতত ইতি টানব। একটি হল বোরখা পরা ভূতের গুজব। পশ্চিমবাংলার গ্রামে গঞ্জে নাকি এক জাতীয় বোরখা পরা রক্ত চোষার আবির্ভাব ঘটেছে যারা মূলত শিশুকন্যাদের অপহরণ করছে। এই গুজবের প্রভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন কিছু ব্যক্তি ইতিউতি মার খেলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ছবি পর্যন্ত প্রকাশিত হল এবং লেখা হল তারা মানুষ নয়, মানুষের মতন দেখতে প্রাণী। এই নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে গঞ্জে। আর শহরে একই ধরনের আতঙ্ক ছড়ালো প্লাস্টিকের ডিম। চীন থেকে চালান হওয়া প্লাস্টিকের ডিম ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় বাজারে, এহেন খবরে নড়ে চড়ে বসল শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজ। সরকারকে আলাদা করে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করতে হল, 'গুজবে কান দেবেন না'।

আতঙ্ক গুজবের এক অনিবার্য প্রতিক্রিয়া। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। আসলে বিশেষ সম্প্রদায় হোক, বিশেষ জাতি হোক, যখনই সে প্রতিপক্ষের বাইনারিতে থাকবে তখনই তার চিহ্নায়ন ঘটবে। চিহ্নায়নই অপর তৈরিতে সাহায্য করে। আর এই চিহ্নায়নে যে চিহ্নগুলি উঠে আসে তাই বিকট চেহারা নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে মানুষের মধ্যে। দাঙ্গার সময় তা পরিণত হতে পারে বিদ্বেষে। কিন্তু সে কথা থাক, বক্তব্য এটাই, রাষ্ট্রের শত নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও গণমাধ্যমের প্রক্রিয়ার ভেতরে কিন্তু অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে গুজব হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র একটি গণমাধ্যম, যার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রকে ঘোষণা করতে হয়, 'গুজবে কান দেবেন না'।

Developed by DXDasia