ডলফিন মিত্র : দেশের জাতীয় জলচর প্রাণী সংরক্ষণে বাংলার নতুন প্রয়াস

ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী ডলফিন

র্তমান সময়ে, পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের তৈরি করা দূষণ ও বর্জ্যপদার্থের কারণে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে, তার ফলে বিপন্ন এবং বিলুপ্ত হচ্ছে বহু প্রজাতির প্রাণী। তার মধ্যে রয়েছে ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী ডলফিন, যা আজ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকাভুক্ত। কেন্দ্রীয় সরকার ২০০৯ সালে ডলফিনকে জাতীয় জলচর প্রাণী হিসাবে ঘোষণা করেছিল।

ডলফিন বাস্তুতন্ত্রে, বিশেষত সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেকধরনের সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ শিকারি প্রাণী হলো ডলফিন। তারা তাদের শিকার তালিকাভুক্ত প্রাণীদের সংখ‍্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ‍্যমে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। ডলফিন হলো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের সূচক। ডলফিনের উপস্থিতি এবং আচরণের মাধ‍্যমে তাদের শিকার তালিকাভুক্ত বিভিন্ন প্রজাতির প্রাচুর্য এবং প্রাকৃতিক বাসস্থান সম্পর্কে ধারণা করা যায়। ডলফিনের উপস্থিতি এবং আচরণকে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করলে, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর পরিবেশ বদলের প্রভাব সম্পর্কে সম্যক ধারণা মেলে। বাস্তুতন্ত্রের জন্য এতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, মানুষের উন্নয়ন-যজ্ঞের কারণে আজ তারা বিলুপ্তির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। 

প্রচুর সংখ্যায় ডলফিনের মৃত্যু হওয়ার অনেকগুলি কারণ রয়েছে, যাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো মানুষের অমনোযোগিতা এবং অজ্ঞতা। গাঙ্গেয় ডলফিন-এর দেখা মেলে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকায়। তারা বসবাস করে বিশ্বের অন‍্যতম জনবহুল অঞ্চলে। এই স্তন্যপায়ী জলচর প্রাণীটি মাছ শিকারের জন‍্য তীরের কাছাকাছি আসে। তখনই জেলেদের মাছ ধরার জালে ধরা পড়ে প্রাণ যায় অসংখ্য ডলফিন। ডলফিনকে বলা হয় ‘উপজাত শিকার’, অর্থাৎ এরা হলো মাছ শিকারের উপজাত। 

গাঙ্গেয় ডলফিনেরা একমাত্র মিষ্টি জলেই বাঁচতে পারে। এদের আলট্রাসাউন্ড ভিশন আছে। সাধারণ দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ায় এবং নদীর জল ঘোলা হওয়ার কারণে এরা মাঝেমধ্যেই নৌকা বা লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা খায়।

মাছেরা নিশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজে ঝিল্লি ব‍্যবহার করে। কিন্তু জলে থাকা সত্ত্বেও ডলফিন ফুসফুস দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালায়। তাই ডলফিনকে মাঝেমধ্যেই জলতলের উপরে উঠে আসতে হয়। এই সময়ও জালে ধরা পড়ে তারা। অনেক এলাকায় ডলফিন শিকার করা হয়, মাংস খাওয়ার জন্য এবং তাদের শরীরে থাকা তৈলাক্ত অংশকে ব‍্যবহার করার জন‍্য। এটা একধরনের বর্বর অভ্যেস, কারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্য হিসাবে বহু বিকল্প রয়েছে। গঙ্গার অববাহিকা অঞ্চলগুলিতে প্রচুর কল-কারখানা রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৯০০০ টন কীটনাশক এবং ৬ লক্ষ টন রাসায়নিক সার নদীবক্ষে জমা হয়। এই দূষণের কারণেও অনেক ডলফিন মারা পড়ে। গাঙ্গেয় অববাহিকাতে পঞ্চাশের উপর ড্যাম এবং সেচপ্রকল্প রয়েছে। ড্যামের জলে আটকা পড়া ডলফিনগুলিকে খুব সহজেই শিকার করে ডলফিন শিকারিরা। ড্যামের কাছাকাছি অঞ্চলে এসে পড়লে শিশু ডলফিনও বেশিদিন বাঁচতে পারে না। পাচারকারীদের হাতেও মৃত্যু হয় ডলফিনের। 

গাঙ্গেয় ডলফিনেরা একমাত্র মিষ্টি জলেই বাঁচতে পারে। এদের আলট্রাসাউন্ড ভিশন আছে। সাধারণ দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ায় এবং নদীর জল ঘোলা হওয়ার কারণে এরা মাঝেমধ্যেই নৌকা বা লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা খায়। মা-ডলফিন ২ বা ৩ বছর অন্তর অন্তর একটি করে শাবকের জন্ম দেয়। মানুষের বিকাশকার্যের খেসারত দিচ্ছে পরিবেশ, হয়ে উঠছে বসবাসের অযোগ্য। খেসারত দিচ্ছে সুন্দর, নিরীহ এবং পরিবেশবান্ধব এই স্তন্যপায়ী জীবটিও। 

রাজ্যের বনদপ্তর গাঙ্গেয় ডলফিনকে সংরক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সম্প্রতি ৯টি জেলার আধিকারিকদের নিয়ে বর্ধমানে একটি উচ্চ-পর্যায়ের মিটিং আয়োজিত হয়েছিল। আলোচনার মূল বিষয় ছিলো পরিবেশে ডলফিনের প্রয়োজনীয়তা এবং সংরক্ষণ। কীভাবে ডলফিন সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে। 

 

গাঙ্গেয় ডলফিনের দেখা মাঝেমধ্যেই মেলে নদিয়া, মুর্শিদাবাদে, পূর্ব বর্ধমান আর হুগলিতে। তবে এসব জায়গাতেও প্রায়শই ডলফিনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ডলফিন সংরক্ষণের এবং তাদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার। বন দপ্তরের আধিকারিকরা গাঙ্গেয় অববাহিকাতে থাকা মানুষদের এ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। 

ডলফিন সংরক্ষণ-এর উদ্দেশ্যে শীঘ্রই ডলফিন মিত্র নামে একটি প্রকল্প শুরু করা হবে। পরের বছর থেকে, গাঙ্গেয় ডলফিন-সহ আরও কয়েকটি প্রাণী সংরক্ষণের জন্য কিছু বিশেষ প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের ৯টি জেলার বনদপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা ভবনে। 

আলোচনাটিতে উপস্থিত ছিলেন বনদপ্তরের শীর্ষকর্তা সৌমিত্র দাশগুপ্ত। উপস্থিত ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, মালদা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া জেলার আধিকারিকেরা। তাঁরা বাস্তুতন্ত্রের জন্য উপকারী বিভিন্ন জলজ প্রাণী, যেমন ডলফিন, ঘড়িয়াল, শুশুক সংরক্ষণের ব্যাপারে আলোচনা করেন। 

ঠিক হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা এবং জেলে সম্প্রদায়কে এই কাজে লাগানো হবে। তাদেরকে ট্রেনিং দেওয়া হবে এবং সচেতনতার কাজে নিয়োজিত করা হবে। ডলফিনদের সংখ্যা নির্ণয়ের কাজে এবং নদী পরিষ্কার করার কাজেও এঁদেরকে যুক্ত করা হবে। 

বনদপ্তরের একজন অধিকর্তা জানালেন, “গাঙ্গেয় ডলফিনের মৃত্যুর কারণ এবং সেগুলিকে প্রতিরোধ করা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে এই সভাতে। আমাদের জাতীয় জলচর প্রাণীর জীবনরক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য সবরকম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। গঙ্গার সৌন্দর্যায়নে কোনওরকম আপস করা হবে না, কারণ ডলফিন নদীর জল পরিষ্কার রাখায় এবং নদীর সৌন্দর্য বজায় রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”

Developed by DXDasia