দূষিত জলঙ্গি নদীতে পদ্মফুলের কলোনি গড়ে তুলেছেন নিশীথ মণ্ডল

গঙ্গার শাখানদী জলঙ্গি

লঙ্গি (পূর্বতন নাম খরিয়া নদী) হল গঙ্গার শাখানদী, যা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভগবানগোলা অঞ্চলে গঙ্গা বা পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছে। ২৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী, নদিয়া জেলার নবদ্বীপে এসে, ভাগীরথী-হুগলিতে মিশেছে। এই নদীর দুইপাড়ে রয়েছে অনেকগুলি প্রসিদ্ধ জনপদ ও শহর- কৃষ্ণনগর, তেহট্ট, মায়াপুর, নবদ্বীপ

জলঙ্গি নদীর প্রকৃত বয়স আজও অজানা। মনে করা হয়, কয়েক শতাব্দী আগে এই নদীর জন্ম। এর উল্লেখ রয়েছে ভ্যান ডেন ব্রুকের (Van Den Brouck) ম্যাপে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই নদীর জল ক্রমশই দূষিত হচ্ছে। কোনও কলকারখানার জন্য নয়, বরং গার্হস্থ্য বর্জ্য এবং কৃষিজাত বর্জ্যের জন্য। বৃষ্টিপাতের হার কমে যাওয়াও অন্যতম কারণ। ফলে জলস্তর ক্রমেই নামছে, নদী ভরে উঠছে শ্যাওলায়। মানুষ প্রায়শই নদীর জলে বর্জ্য ফুল, মাটির পাত্র, মালা ইত্যাদি ফেলেন, যার ফলে নদীর জল দূষিত হয়। এই কারণে প্রচুর পরিমাণে মাছও মারা যাচ্ছে।

আরপিএফ কর্মী নিশীথ মণ্ডল

এই দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন আরপিএফ কর্মী (RPF Employee) নিশীথ মণ্ডল (Nishit Mondal)। তিনি দু’বছরের চেষ্টায় নদীর জলে পদ্মফুল ফোটাতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর উদ্যোগেই দূষিত জলঙ্গি নদী ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে পদ্মফুলের কলোনি-তে। পদ্মফুলে ভরা পুকুর বা লেক দেখে তিনি এই উদ্যোগের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আগের বছরও নদীর জলে পদ্মফুল ফোটানোর চেষ্টা করেছিলেন নিশীথবাবু, কিন্তু সফল হননি। এই বছর, অনেক চেষ্টা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর,  অবশেষে সফল হয়েছেন। যার ফলে নদীর সৌন্দর্য বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। স্থানীয়রাও তাঁর এই উদ্যোগে মুগ্ধ। তাঁরা নদীর জলে বর্জ্য পদার্থ ফেলাও বন্ধ করে দিয়েছেন। নিশীথ দুষ্প্রাপ্য ফুল এবং ফলের চাষ করতে ভালোবাসেন, নিজের বাড়ির ছাদে পদ্মফুলের বীজ এবং চারা উৎপাদন করেন এবং সেইগুলিই নদীর জলে রোপণ করেন। 

এখন আর সবজায়গায় পদ্মফুল পাওয়া যায় না। দিনে দিনে এটি দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এই কারণেই তিনি জলঙ্গি নদীতে পদ্মফুল চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই উদ্যোগটি খুব একটা ছোটো নয়। কাজেই নিশীথের একার পক্ষে সব পদ্মফুলের দেখভাল করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। স্থানীয় মানুষ, বিশেষত যুবকেরা, তাঁকে সহায়তা করেছেন। তাঁরা নজর রাখতেন, যাতে কেউ গাছগুলির ক্ষতি করতে না পারে, বা সেগুলিকে চুরি করতে না পারে। নিশীথ নিজের কাজে অত্যন্ত নিঁখুত। গাছ লাগানোর পরে পদ্মফুলগুলিকে ফুটতে দেখে তবেই তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। 

ভারতীয়দের কাছে পদ্ম হল পবিত্র ফুল। এই ফুল ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার এবং পুজোর কাজে। এই ফুলটি লক্ষ্মীপদ্ম নামেও পরিচিত। পদ্ম সাধারণত জন্মায় শান্ত নদীতে এবং ব-দ্বীপ অঞ্চলে। পুকুরের জলে প্রতি বছর একশো থেকে হাজার পদ্মের বীজ পড়ে। তার মধ্যে কিছু বীজ থেকে গাছ হয় আর বেশিরভাগটাই জলচর জীবেরা ভক্ষণ করে। বাকি বীজগুলি জল শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সুপ্ত থাকে। বন্যার সময়, বীজগুলির উপরে জমা পলি ধুয়ে যায়, তারা সুপ্ত অবস্থা থেকে জেগে ওঠে, এবং জন্ম হয় নতুন পদ্মফুলের কলোনি (Lotus Colony)-র। 

পদ্মফুল বিভিন্ন উপায়ে জন্মাতে আর বেড়ে উঠতে পারে। কারোর বাড়ির বহিঃপ্রাঙ্গণে রাখা পাত্রে বা পুকুরে। পদ্মফুলের বেড়ে ওঠার জন্য সারাদিনে ৬ ঘণ্টা সূর্যালোকের দরকার হয়। গাছগুলিকে স্রোতযুক্ত জল বা ঝরনার থেকে দূরে রাখতে হয়। খেয়াল রাখতে হয়, যাতে গাছের পাতা জলে ডুবে না যায়। একটি বাড়ন্ত পদ্মগাছকে পাখি আর পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হয়। পদ্মগাছগুলিকে রোপণ করা হয় গ্রীষ্মকালে এবং গাছগুলিতে ফুল ফোটে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকের মধ্যে। 

জলঙ্গি নদীতে পদ্ম কলোনি

দুটি পদ্ধতিতে কোনও ড্যাম বা লেকে পদ্মগাছ রোপণ করা যায় :

১) একটি নার্সারি পাত্রের পাশের দিক থেকে ১৫০ মিমি অংশ কেটে নিন (নিচের দিক থেকে নয়)। এবার গাছটিকে একটি রৌদ্রজ্জ্বল স্থানে, ড্যামের ধারের কাছাকাছি অঞ্চলে, ৩০-৫০ সেমি শান্ত জলে রোপণ করুন। পাত্রের যে অংশটি কেটে ফেলা হয়েছে, সেখানে ড্যাম থেকে সংগৃহীত মাটি দিয়ে লেপে দিন।

২) খুব সাবধানে গাছটিকে পাত্র থেকে বের করুন, যাতে গাছের শিকড় নষ্ট না হয়। গাছটিকে ড্যামের পাশের কোনও রৌদ্রজ্জ্বল স্থানে, ৩০-৫০ সেমি শান্ত জলে রাখুন। গাছটির চারপাশ, ড্যাম থেকে সংগ্রহ করা মাটি দিয়া ঘিরে দিন।

প্রথম তিন-চার সপ্তাহ, গাছটির চারপাশ তার দিয়ে ঘিরে দিতে হয়। গাছটিকে পাখি, ক্রেফিশ, অন্যান্য জলজ প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। একটি পদ্মফুল জন্মে গেলে, সেই পংক্তি বরাবর অন্য পদ্মফুলগুলিও জন্মায়। ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসে, পদ্মের চারাযুক্ত বিশেষ ছোটো ঝুলিতে, পদ্মফুলের চাষ করা হয়।

Developed by DXDasia