দেওয়ালচিত্রের হাত ধরে সেজে উঠছে তিলোত্তমা, কিন্তু গ্রাফিত্তি শিল্প এখনও ‘ব্রাত্য’ কেন?

 

লকাতার বড়ো রাস্তার পাশে বা তস্য গলির দেয়ালের ভোল বদল আপনার চোখে পড়েছে? উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে একমাত্রিক বা দ্বিমাত্রিক ঝকঝকে ইলাস্ট্রেশনের মাধ্যমে রঙের আঁচড়ে ফুটে ওঠা বর্ণময় দেওয়াল চিত্র বা গ্রাফিত্তি? দেওয়াল চিত্র বা পোশাকি শব্দে এই আর্টফর্মের নাম ‘গ্রাফিত্তি’। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি কিংবা লন্ডনের রাস্তাঘাট ব্যাপকভাবে এই আর্টফর্মের  পরিচিত হলেও ভারতবর্ষের কেবলমাত্র দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু ও মুম্বাই-এর মতো মেট্রো সিটি বাদে কলকাতার বুকে এই গ্রাফিত্তি চিত্রায়ন কার্যত নতুনই বলা চলে।

তবুও অনেকদিন ধরেই এক্সাইড থেকে ভবানীপুরের দিকে যাওয়ার রাস্তা, সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের গলি-গালা, পার্কস্ট্রিটের রাস্তাঘাট, কাছেই কিড স্ট্রিটের একটা আস্ত গলি কার্যত মুড়ে রাখা হয়েছে এই রঙিন আঁকি বুকিতে। তবে শুধুমাত্র স্নবিশ দক্ষিণ কলকাতা বা সাহেব পাড়ার গলিঘুঁজিই নয়, সাবেকি উত্তর কলকাতার হাঠখোলার গলি, বাগবাজারের ঘাট, শোভাবাজারের অলিগলিও রঙিন হয়ে উঠেছে এইসব গ্রাফিত্তির মাধ্যমে। কোথাও ফুটে উঠেছে সিঁদুর খেলার ছবি, কোথাও আবার প্রমাণ মাপের চে গুয়েভারার একটা আস্ত মুরাল। এছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে কলকাতার বিভিন্ন পুরোনো ওয়ার হাউসে, ট্রাম ডিপোতেও ঢুঁ মারলে খুঁজে পাওয়া যায় কিছু অসাধারণ গ্রাফিত্তি।

 

নলিন সরকার স্ট্রিট

কলকাতায় আম-বাঙালির সঙ্গে এই আর্টফর্মের পরিচয় তুলনামূলক নতুন হলেও, সভ্যতা কিন্তু যুগ যুগ ধরে বয়ে বেড়িয়েছে গ্রাফিত্তির ইতিহাস। টাইমমেশিনে চেপে পিছিয়ে গেলে প্রস্তর যুগের গুহার দেওয়ালে শিকাররত দৃশ্য- সেগুলোও কি গ্রাফিত্তি নয়? বা গ্রাফিত্তির আদিরূপ বললে কি খুব ভুল বলা হবে?

বাগবাজার ঘাট

এছাড়াও মিশর, গ্রিস প্রভৃতি দেশের নানান সময়কালে গ্রাফিত্তির ব্যবহার মূলত পাথর খোদাই ও অন্যান্য ভেষজ রঙের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হত। অজন্তা ইলোরার গায়ে নাম না জানা শিল্পীর বুদ্ধ ও অন্যান্য মুরাল চিত্রায়ন এদেশের কৃষ্টিতে। শিলালিপির পরিবর্তন ও পরিমার্জনে পশুর হাড়গোড় বা জংলা গাছগাছালির ন্যাচারাল রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে আজকের আধুনিক যুগের স্প্রে-পেন্ট ক্যান আর অল্প বিস্তর স্টেন্সিল ও তুলির যৎসামান্য ব্যবহার।

বাগবাজার ঘাট

মূলত ফ্রি হ্যান্ড স্ট্রোকেই করা হয়ে থাকে গ্রাফিত্তি। সাধারণ ছবি বা রঙিন শব্দের বিচ্ছুরণে ফুটিয়ে তোলা কোথাও প্রতিবাদের ভাষা, কোথাও আবার সামাজিক সচেতনতার বার্তা বা পাশে থাকার অঙ্গীকার। গ্রাফিত্তির রংমিলান্তিতে কলকাতার ঘিঞ্জি দেওয়ালে কোথাও ফুটে উঠছে হারিয়ে যাওয়া গার্ল চাইল্ডদের খুঁজে মূল স্রোতে ফিরিয়ে দেওয়ার ডাক, বা কন্যা ভ্রূণ বাঁচানোর আর্জি।

এই শহরেরই প্রথিতযশা কলেজ তথা ইউনিভার্সিটিতে আপনি লক্ষ্য করবেন গ্রাফিত্তির মাধ্যমে প্রতিবাদের শৈল্পিক প্রতিবাদে কালির পোঁচ। তাই বিশ্বজুড়ে নানা দেশে গ্রাফিত্তি আর্টিস্টদের কিছুটা ঘৃণ্য বা অপরাধী তকমাও দেওয়া হয়েছে বারবার।

কিছুটা ‘প্রান্তিক’ এই গ্রাফিত্তি শিল্প বা দেওয়াল চিত্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে বিতর্ক এবং রাজনীতি। কারণ গ্রাফিত্তি মানে প্রতিবাদের ভাষাও। এই কলকাতারই বুকে আপনি খুঁজে পাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প বিরোধী স্পষ্ট দেওয়াল লিখন। মূলত আন্ডার গ্রাউন্ড আর্টফর্ম বা সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির প্রতিবাদের ভাষা স্বরূপ আধুনিক গ্রাফিত্তির উন্মেষ ঘটায়। তথাকথিত এলিট ক্লাসের শিল্প ব্যাপ্তিতে অনেকটাই ব্রাত্য গ্রাফিত্তি ও গ্রাফিত্তি আর্টিস্টরা বারবার গর্জে উঠেছেন সমাজের প্রান্তিক মানুষের দাবি দাওয়া নিয়ে।

 

বাগবাজার ঘাট

এই শহরেরই প্রথিতযশা কলেজ তথা ইউনিভার্সিটিতে আপনি লক্ষ্য করবেন গ্রাফিত্তির মাধ্যমে প্রতিবাদের শৈল্পিক প্রতিবাদে কালির পোঁচ। তাই বিশ্বজুড়ে নানা দেশে গ্রাফিত্তি আর্টিস্টদের কিছুটা ঘৃণ্য বা অপরাধী তকমাও দেওয়া হয়েছে বারবার। তবে একথা সত্যি, ইউরোপের নানা জায়গায় লোকাল হুলিগান বাহিনী গ্রাফিত্তি চিত্রায়নের মাধ্যমেই দাগিয়ে নেয় নিজেদের এলাকা। ভ্যান্ডালিজম অভিযোগ বারবার উঠেছে গ্রাফিত্তি আর্টিস্টদের বিরুদ্ধে। ঠিকই তো। কোনো দেওয়ালে গ্রাফিত্তি ইলাস্ট্রেশনে রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধাচরণ প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে দৃষ্টিগোচর করলে কোনো রাষ্ট্রেরই তা ভালো লাগার কথা নয়।

 

কিড স্ট্রিট

আর এদেশে আপনি যত্রতত্র প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে বা পান গুঠখার পিকে দেওয়াল রাঙানোর স্বাধীনতা পেলেও, গ্রাফিত্তি আর্টিস্টদের কোনো স্বাধীনতা নেই যে তাঁরা রাঙিয়ে তুলবেন নিজেদের ইচ্ছে মতো নানা দেওয়াল। তাই তাঁদের বেছে নিতে হয় কিছুটা লোকচক্ষুর আড়ালে সেই সব লোনা ধরা দেওয়াল এবং ফুটিয়ে তোলেন নিজেদের মর্জি মতো একের পর এক অসাধারণ শিল্পকীর্তি।

 

ওয়েলিংটন মোড়ের বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাহল

তবে এই আর্টফর্মের সামাজিক ব্যাপ্তি অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। যুদ্ধবিরোধী স্লোগান বা ফ্রি প্যালেস্টাইন-এর বার্তা দেওয়া শান্তিকামী আর্জির আহ্বানও চোখে পড়ে এ শহরের বুকে। না হয় বদলে যাক ওই সব রং চটা অমলিন দেওয়ালগুলো। নতুনের রূপ পাক তারা। আমার আপনার শহর রঙিন হয়ে উঠুক এই নতুন আর্টফর্মে।

দ্য পার্ক হোটেলের সামনে, পার্ক স্ট্রিট

কলকাতার রাস্তায় গ্রাফিত্তি। ছবি : লেখক

Written by