বৃক্ষচ্ছেদনের যুগে বনসাইকে শিল্পের রূপ দিচ্ছেন হাওড়ার গৌরব মজুমদার

মানুষের অন্তরের সৌন্দর্যবোধ যখন প্রাণ পায় ক্যানভাস অথবা মঞ্চে, তখন তা হয়ে ওঠে শিল্প। কিন্তু যার প্রাণ আছে সেটাই যদি শিল্পের মাধ্যম হয়ে ওঠে, আবার একই সঙ্গে তা যদি বাঁচার রসদ জোগায় পরিবেশে, তখন সেই শিল্পকে কী বলে জানেন? তাকে বলে বনসাই। শক্ত কাণ্ড যুক্ত গাছকে নান্দনিক ভাবে ছোটো করে‌ টবে পাত্রে প্রতিপালিত করার পদ্ধতিকে বনসাই বলা হয়।

‘বনসাই’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো টবে বা পাত্রে লাগানো গাছ। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় টবে বা কোনো পাত্রে বিভিন্ন ধরনের গাছের উৎপাদনের কথা জানা যায়। তবে ভারতে বনসাইয়ের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। বিভিন্ন ধরনের ওষধি গাছ থেকে ওষুধ পাওয়ার জন্য ভারতে টবে বা পাত্রে খর্বাকৃতি গাছের উৎপাদন করা হতো‌। জানা যায়, দ্বাদশ শতাব্দীতে ভারতে বামন বৃক্ষকলা বা ছোটো আকৃতির গাছের প্রচলন ছিল। প্রাচীনকালে চিন ও জাপানের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ইঙ্গিতও দেয় এই খর্বাকৃতি বৃক্ষশিল্প। ২৬৫ থেকে ৪২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেকার সময়ের চৈনিক লিপিতে প্রথম ‘পেনজাই’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই চৈনিক শব্দ ‘পেনজাই’ থেকেই ‘বনসাই’ শব্দের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। চিনে ছং রাজবংশের রাজত্বকালে জাপানে পাত্রে উৎপাদিত এই ধরনের গাছের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই ধরনের বৃক্ষ শিল্পের চর্চা ক্রমশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

মরশুমি ফুলের গাছগুলো কীভাবে আরও বেশিদিন বাঁচতে পারে? এই চিন্তা থেকেই একটা বটগাছের চারাকে টবে পুঁতে তাকে প্রতিপালন করতে থাকে ছোট্ট গৌরব। তারপর কারো এক মাধ্যমে জানতে পারা যে সে আসলে বনসাই করে ফেলেছে।

কৈশোরে নিজের অজান্তেই এই শিল্পের প্রেমে পড়ে যান হাওড়ার গৌরব মজুমদার। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার গৌরবের প্রথম প্রেমের নাম গাছ। সবুজ যখন ছোট্ট গৌরবের খেলার সঙ্গী তখনই কোনো এক সময় অসুস্থ হয়ে কয়েকদিন হাসপাতালে কাটাতে হয় গৌরবকে‌‌। তারপর বাড়ি ফিরে সে দেখে যত্নের অভাবে তার বন্ধুরা প্রাণ ত্যাগ করেছে। সেই থেকেই তার মনে হয়, কোনো ভাবে কি একটা গাছকে অনেকদিন অবধি বাঁচিয়ে রাখা যায় না? মরশুমি ফুলের গাছগুলো কীভাবে আরও বেশিদিন বাঁচতে পারে? এই চিন্তা থেকেই একটা বটগাছের চারাকে টবে পুঁতে তাকে প্রতিপালন করতে থাকে ছোট্ট গৌরব। তারপর কারো এক মাধ্যমে জানতে পারা যে সে আসলে বনসাই করে ফেলেছে। এরপরেই শুরু হয় বনসাই নিয়ে গৌরবের নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্রমশ বিশ্বের প্রথিতযশা বনসাই শিল্পীদের সঙ্গে আলাপ হয় গৌরবের। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এই জীবন্ত শিল্পের পাঠ নিতে শুরু করেন গৌরব। ইন্টারনেটের দৌলতেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় বনসাই শিল্পী এস.কে মিত্রর সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকেই গৌরব আরও ভালোভাবে এই বিষয়‌ সম্পর্কে শিখতে শুরু করেন।

প্রথাগত পড়াশোনা, চাকরি কোনো কিছুই বাধা হতে পারেনি গৌরবের বৃক্ষ প্রেমের পথে। প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ পড়াশোনা, চর্চা তাকে এনে দিয়েছে নানান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। শুধু স্বীকৃতি ‌লাভ নয়, অল্পবয়স থেকেই বনসাই তাকে আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর করে তুলতেও সাহায্য করেছে। তাঁর হাতে তৈরি গাছ বিদেশের মাটি থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নিয়ে এসেছে দেশের মাটিতে।

বনসাই শুধু শিল্প নয়, এর আরেকটি দিক হর্টিকালচার। এই প্রসঙ্গে গৌরব জানান, “বনসাই পৃথিবীর একমাত্র শিল্প যেখানে কোনো জীবন্ত প্রাণ শিল্পের মাধ্যম। আর জীবন্ত হওয়ার কারণেই বনসাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, গাছের পরিপোষণ। আমরা নিয়মিত খাদ্যগ্রহণ করার পরেও যেমন আমাদের শরীরে কিছু অতিরিক্ত ভিটামিন, প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের প্রয়োজন হয় তেমনই গাছেরও বেশ কিছু ম্যাক্রো নিউট্রিশন এবং মাইক্রো নিউট্রিশনের প্রয়োজন আছে। কারণ একটি গাছেরও পর্যাপ্ত পুষ্টি দরকার। বনসাইয়ের এই ধরনের পরিচর্যাকে বলা হয় হর্টিকালচার।”

শুধু নিজস্ব চর্চা নয়, উৎসাহী মানুষদের হাতে কলমে বনসাইয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন গৌরব। ই-বৃক্ষ নামে নামে একটি কোম্পানি শুরু করে তিনি বনসাইয়ের যাবতীয় সমস্যার সমাধান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবসা শুরু করেন।

এক একটি বনসাই বানাতে কতদিন সময় লাগে? এই প্রসঙ্গে গৌরব জানান, বনসাই একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প। একটি পূর্ণ ভালো মানের বনসাই তৈরি করতে ২৫-৩০ বছরও লাগতে পারে। তবে ভালো প্রজাতির গাছ নিয়ে কাজ করলে ৫-৬ বছরে গাছের প্রাথমিক গড়ন তৈরি হয়ে যায়। তাই মন দিয়ে বনসাইয়ের চর্চা করতে অত্যন্ত ধৈর্য্যের প্রয়োজন বলে জানান গৌরব।

কী ধরনের গাছের বনসাই ভালো হয়? গৌরব বলেন, বৃক্ষ জাতীয় গাছ যেমন, বট, অশ্বত্থ, পাকুড় প্রভৃতি গাছের বনসাই ভালো হয়। তাছাড়াও ফুলের গাছের মধ্যে বোগেনভিলিয়া, কামিনী গাছের বনসাই খুব সুন্দর হয়।

শুধু নিজস্ব চর্চা নয়, উৎসাহী মানুষদের হাতে কলমে বনসাইয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন গৌরব। ই-বৃক্ষ নামে নামে একটি কোম্পানি শুরু করে তিনি বনসাইয়ের যাবতীয় সমস্যার সমাধান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবসা শুরু করেন। এরপরে ধীরে ধীরে ৬ বিঘা জমি কিনে বনসাইয়ের এক বিশাল কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন। বর্তমানে তার উদ্যোগে প্রায় ৬০-৭০ জন বনসাই প্রেমী মিলে তৈরি করেছেন ‘বেঙ্গল বনসাই ক্লাব’ (Bengal Bonsai Club)। এছাড়াও বিভিন্ন জার্নালে লেখালিখি, ইন্টারনেটে ভিডিও আপলোড প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি বনসাই তৈরির পদ্ধতি ও তার রক্ষণাবেক্ষণ শেখান। 

কিন্তু নতুন প্রজন্মের কেউ যদি শুধুমাত্র বনসাইয়ের নেশাকেই পেশা করতে চান তাহলে সে আর্থিক ভাবে কতটা সুরক্ষিত থাকতে পারবে? গৌরব জানান, বাজারের চাহিদার দিকে তাকিয়ে বলা যায় বনসাইকে পেশা করাই যায়। এক্ষেত্রে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়া যেতেই পারে বলে তিনি মনে করছেন।

তবে ভারতে বনসাইয়ের জন্য যথাযথ আর্বোরেটামের অভাব ব্যথিত করে তোলে গৌরবকে। কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় সরকারের কাছেই তার প্রার্থনা বনসাইয়ের যথাযথ সংরক্ষণের জন্য আর্বোরেটামের ব্যবস্থা করা হোক।

বৃক্ষচ্ছেদনের যুগে পৃথিবী প্রায় ধূসর মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। ঠিক এই সময়, আধুনিক নাগরিক জীবনের সঙ্গী হয়ে রাস্তার ধারের বট গাছটার বা কামিনী ফুলগাছটার ছোট্ট সংস্করণ আমার আপনার বাড়ির সদস্য হয়ে উঠলে সেই হয়তো দিনের শেষে শুষে নেবে আমাদের যাবতীয় ক্লান্তি, আসলে এই ছোট ছোট প্রাণের শিল্পসম্মত সজীবতাই পিচগলা রোদ্দুরে দিতে পারে বৃষ্টির আশ্বাস।

________________
বেঙ্গল বনসাই ক্লাবের ঠিকানা: বেঙ্গল বনসাই, গৌরব মজুমদার, বালিটিকুরি চাকপাড়া লালবাড়ি, হাওড়া- ৭১১১১৩
ই-বৃক্ষ অফিশিয়াল ওয়েবসাইট লিংক: https://www.evrikshya.com/ 

Written by