
তিনি লক্ষ্য করতেন সেইসব কিছু যা সাধারণের নজর এড়িয়ে যায়
‘মাকড়সা, পিঁপড়ে এবং বিশেষ শ্রেণীর কীট-পতঙ্গের আচরণ ও তাদের শারীরবৃত্তীয় ধর্মাবলী সম্পর্কে গোপালবাবুর গবেষোণালব্ধ তথ্যগুলি শুধু ভারতেরই নয়, বিদেশের বিজ্ঞানী মহলেও যথেষ্ট সমাদর লাভ করেছিল বলে আমরা জানি…তিনি যে পঞ্চাশ বছরেরও অধিককাল মাতৃভাষায় বিজ্ঞানসাহিত্য সেবা করে আসছেন, তাতে তাঁকে এ যুগের অন্যতম পথিকৃৎ বললে অত্যুক্তি হয় না!’
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের লেখা ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ বইটির ভূমিকায় এমনটাই লিখেছিলেন ভারতের বিজ্ঞান কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি, কিংবদন্তী বিজ্ঞানী ও রসায়ন গবেষক অসীমা চট্টোপাধ্যায়।
আবার এই বইয়ের নতুন সংস্করণের প্রকাশক দে’জ-এর সুধাংশুশেখর দে বলেছেন, “বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের সেরা দশটির একটি ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’”।
শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখি, পোকামাকড় এমনকি উদ্ভিদরাও নাকি চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি করে থাকে, গোপালচন্দ্র সে বিষয়েও খুঁটিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। মেছো মাকড়সা, নেকড়ে মাকড়সা…সাইবেরিয়া বা আফ্রিকার নয় এই বঙ্গে যে কত ধরণের মাকড়সার বাস ছিল বা আছে, তাঁর গবেষনার কল্যাণে জানা যায়। পোকামাকড়দের নিজেদের জীবন আছে, কথা আছে, ক্ষুদ্র হয়ে তাদেরও যে বড় পরিসর রয়েছে গোপালচন্দ্র তা খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করতেন শুধু তাই নয়, তাদেরকে ভালোবাসতেন তিনি। অথচ তিনি ছিলেন স্বভাববিজ্ঞানী, আর্থিক কারণে ইন্টারমিডিয়েট অবধিই পড়তে পেরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে বিশ্বখ্যাত ‘কমিক ম্যান’ স্ট্যান লি’র কথা। তিনি মাকড়সা, পিঁপড়েদের সঙ্গে মানুষের মিউটেশন ঘটিয়ে লিখে গিয়েছেন বিশ্বখ্যাত কমিকস ‘স্পাইডার ম্যান’, ‘অ্যান্ট ম্যান’। আর গোপালচন্দ্র বাংলার মাকড়সা, পিঁপড়ে ও অন্যান্য পোকামাকড়দের নিয়ে লিখেছিলেন ‘তাঁতী-বউ মাকড়সা’, ‘নেউলে পোকার জন্ম রহস্য’, ‘নিশাচর প্রজাপতি’, ‘শ্রমিক-পিঁপড়ের জন্ম-রহস্য’, ‘পিঁপড়ের বুদ্ধি’, ‘কানকোটারীয় জীবন-কথা’ ইত্যাদি, যেগুলো প্রকৃতিবিজ্ঞানের নিগূঢ় রহস্যের দিকে আকৃষ্ট করে ছোটদের সঙ্গে বড়দেরও।
যেমন, ‘পিঁপড়ের বুদ্ধি’-তে তিনি একজায়গায় লিখেছেন, ‘প্রায় আধঘন্টার মধ্যে অবস্থা সঙীন হয়ে উঠলো। ইতিমধ্যে আরও নালসো এসে পোকাটাকে ক্ষুদে-পিঁপড়েদের কবল থেকে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করছিল এবং প্রায় এক ইঞ্চি উপরে শিকারটাকে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। শিকার হাতছাড়া হয় দেখে ক্ষুদেরা এবার সার বেঁধে দলে দলে আগ্রসর হতে লাগলো। সংখ্যাধিক্যের জেরে পরক্ষণেই তারা পোকাটাকে প্রায় তিন-চার ইঞ্চি নিচে টেনে আনলো। সঙ্গে সঙ্গেই উভয় দলের মধ্যে ‘হাতাহাতি লড়াই’ শুরু হয়ে গেল।’
যে কোনও একনিষ্ঠ থ্রিলার-পাঠক তাঁরা জানবেন এ লেখনীর মহিমা। আবার, ‘ভীমরুলের রাহাজানি’ গল্পের শুরুতে লিখেছেন, ‘জৈষ্ঠের অপরাহ্নে একদিন বেলগাছিয়া রোড দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পেলাম রাস্তার একপাশে কালো রঙের একদল পিঁপড়ে সার বেঁধে চলেছে। নিকটেই রাস্তার উপর রেল-লাইনের পুল। পিঁপড়েরা এই রেল-পুলের বাঁধের নীচেই একটা গর্তের মধ্যে ঢুকেছিল। একটু লক্ষ্য করতেই দেখা গেল—মাঝারি গোছের একটা কুনো ব্যাঙ পিঁপড়ের লাইনের প্রায় দু-তিন ইঞ্চি তফাতে ওঁত পেতে বসে আছে। ব্যাঙটাকে এইভাবে নিরিবিলি চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বড়ই কৌতূহল হল—দেখা যাক কী করে।’
তবে তাঁর সবচেয়ে আশ্চর্য আবিষ্কার বোধ হয় জৈব দ্যুতি। পরিত্যক্ত জায়গায় বৃষ্টির রাতে আগুন জ্বালায় কে? রহস্যভেদ করতে এক বৃষ্টিভেজা রাতে তিনি রওনা দিলেন ‘পাঁচীর মার ভিটা’র দিকে। সে এক জঙ্গুলে, জনমানবহীন জায়গা। দেখলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে জমাট-বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা অস্পষ্ট আলোর রেখা। কাছে যেতেই সেই আলো আরও স্পষ্ট, আরও উজ্জ্বল। হঠাৎই তা দপ করে নিভে গেল। ফের জ্বলে উঠল। আরও খানিক এগিয়ে দেখা গেল যেন বেশ বড় এক অগ্নিকুণ্ড। আগুনের শিখা নেই। কাঠকয়লা পুড়ে যেমন গনগনে আগুন হয়, অনেকটা সেই রকম। সে আলোর তীব্রতা নেই। তিনি লক্ষ করেন, শুষ্ক দিনে জঙ্গলে জল পড়লে রাত্রিবেলায় এই আলো দেখা যায়। অথচ দিনের আলোয় দেখা যায় না। পচা গাছপালার এই আশ্চর্য আলো বিকিরণের ক্ষমতার উপর তাঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশিত হয় ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়, ১৩২৬ বঙ্গাব্দে।
গোপালচন্দ্রের লেখনীই বলে দেয় তিনি একজন ‘টোটাল অবজার্ভার’। তিনি লক্ষ্য করতেন সেইসব কিছু যা সাধারণের নজর এড়িয়ে যায়। জীববিদ্যা সম্পর্কিত তাঁর লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায় কেন তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান, ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’।প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে বোঝাপড়া, পারস্পরিক সম্পর্ক বাংলা সাহিত্যে সেইসব কথাই সাবলীলভাবে তুলে ধরে গিয়েছেন গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য।
সূত্রঃ
বাংলার কীটপতঙ্গঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য
