গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের স্মরণে বেনজির প্রয়াস, স্কুল পড়ুয়াদের বানানো মডেল দেখে মুগ্ধ আম-জনতা

বিদ্যাসাগর উদ্যানে চলছে বিজ্ঞান মেলা

বাঙালি প্রকৃতিবিদ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিখ্যাত হয়ে আছেন কীটপতঙ্গ নিয়ে তাঁর গবেষণার জন্য। উদ্ভিদবিদ্যায় তাঁর অবদানও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।  বসু বিজ্ঞান মন্দির, বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকে তিনি বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। এবছর তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। সেই উপলক্ষ্যে এক বর্ণাঢ্য বিজ্ঞান মেলা আয়োজিত হয়েছে আমাদের মহানগরে। বিদ্যাসাগর উদ্যান অর্থাৎ কলেজ স্কোয়ারে এই মেলা শুরু হয়েছে শুক্রবার, চলবে রবিবার পর্যন্ত। এই ক’দিন দুপুর ২টো থেকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শকরা অংশগ্রহণ করতে পারেন মেলায়। এছাড়া রয়েছে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের জীবন ও কাজকর্মের ওপর বিশেষ প্রদর্শনী, যা মুগ্ধ করবে সবাইকে।


সমগ্র কর্মকাণ্ডটির আয়োজন করেছে ‘গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিজ্ঞান প্রসার সমিতি’।  ১৯৭৪ সালে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের কনিষ্ঠ পুত্র মিহিরকুমার ভট্টাচার্য। তিনি এবং তাঁর কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী মিলে গোপালচন্দ্রের জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবস পালন করতেন, ছোটোখাটো প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন। পরবর্তীকালে বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, কচিকাঁচাদের মধ্যে বিজ্ঞান সচেতনতা বাড়ানোর নানা কর্মসূচি নিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। 

এবছর গোপালচন্দ্রের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁরা আয়োজন করেছেন নেচার ক্যাম্প, কুইজ প্রতিযোগিতা, গোপালচন্দ্র ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের জীবনী নিয়ে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা এবং আরও বেশ কিছু অনুষ্ঠান। ৮ এপ্রিল গোপালচন্দ্রের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পরিবেশ ভবনে থাকছে বিশেষ সেমিনার। তাঁর স্মরণে একটি বইও প্রকাশিত হচ্ছে। 

এই বিজ্ঞান মেলায় গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের নামাঙ্কিত প্যাভিলিয়নটির উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদের চেয়ারপার্সন ডঃ অশোক কান্তি স্যান্যাল। পশ্চিমবঙ্গে সরকারের নগর উন্নয়ন ও পৌরবিষয়ক  দপ্তরের প্রধান সচিব ডঃ সুব্রত গুপ্ত মেলার অন্যান্য বিভাগগুলির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বিশিষ্টজনেরা।

বিজ্ঞানের প্রসারে যুক্ত ১৬টি সংগঠন এই মেলায় যোগ দিয়েছে। ‘স্কাই ওয়াচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর স্টলটিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে মহাকাশের বিভিন্ন আলোকচিত্রে। ছবিগুলি তুলেছেন এই সংস্থারই সদস্যরা। নীহারিকা, চন্দ্রগ্রহণ, আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মতো নানান মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনার ছবি সত্যিই অবাক করার মতো। এই সংস্থার অন্যতম সদস্য শমীন্দ্র বসু জানালেন, “মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য মেলায় আমরা একটি টেলিস্কোপও এনেছি। শহরের আকাশে লাইট পলিউশন খুব বেশি, তবুও আমরা চেষ্টা করছি দর্শকদের কিছু বিরল দৃশ্য দেখাতে”। ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’-এর থেকে হাজির ছিলেন সুনীশ দেব। তিনি বললেন, “পরিবেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে সাইকেলের মতো দূষণহীন যানের কোনো বিকল্প নেই। আগে ঘরে ঘরে সাইকেল থাকত। এখন নাগরিক জীবন থেকে সাইকেল ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই মেলায় আমরা এসেছি পরিবেশ দূষণ রোধে সাইকেলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে”। 

মেলায় আয়োজিত হয়েছে আন্তঃস্কুল মডেল প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করে এনেছে স্কুলপড়ুয়া কচিকাঁচারা। দর্শকরাও অধীর আগ্রহে সেগুলি দেখছেন। “দর্শকরা প্রচুর প্রশ্ন করছেন, বহু দর্শক আছেন যাঁরা এই মডেলগুলোর বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ সত্যিই বোঝেন”, জানাল যাদবপুর বিদ্যাপীঠের ছাত্র শুভ্রজ্যোতি রায়। ১৩টি স্কুল এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে। বিজ্ঞানের নানা দিন সহজভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য বেশ কিছু প্রদর্শনী রয়েছে মেলায়। যেমন, অলৌকিক নয় নিছক ম্যাজিক, খাবারে ভেজাল ধরার সহজ উপায়, ডারউইন ও বিবর্তনবাদ ইত্যাদি। 

‘গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিজ্ঞান প্রসার সমিতি’-র সেক্রেটারি তথা গোপালচন্দ্রের নাতনি মালা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য বললেন, “প্রথমবার আমরা এই মেলা করছি। আমাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। শুধু আমাদের আন্তরিক প্রয়াস ও দর্শকদের এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা চাই, এই মেলা এগিয়ে যাক। বিজ্ঞানকে ভয় যাঁরা পান তাঁরাও আসুন, বিজ্ঞানকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁরাও আসুন, সচেতন হন। পরিবেষ দূষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার ছোট্ট প্রয়াস এই মেলা”।

ছবি – শুভায়ন দাশগুপ্ত 

Post Tags
Developed by DXDasia