সামাজিকতা রক্ষা থেকে যৌনচেতনা : ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবিতে শাড়ির ব্যবহার

– “তোমার এই শাড়িটার নাম কী, রাই?”
– “কেন?”
– “দরকার আছে”
– “এবার একটু অন্যকিছু ভাবো। যবে থেকে বিয়ে হয়েছে, ইট স্টার্টেড। এখনও চলছে। হোয়াই মাস্ট ইয়োর হিরোইনস অলঅয়েজ ওয়্যার মাই সাড়িজ?”
– “অন্য কারোর ‘সাড়ি’ পরলে, তোমার ভালো লাগত?”

ত্তর না দিয়ে ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ সিনেমার নায়িকা ঘুমিয়ে পড়লেন এবং স্ক্রিপ্টের চলনমাফিক ভোরবেলায় অফিসের ট্যুরে বেরিয়েও যাবেন। নায়ক ইন্দ্রনীল, যিনি একজন কবি, তিনি ঘুম থেকে উঠে একটি চিরকুট পাবেন। তাতে লেখা, “দ্য সাড়ি আই ও্যর লাস্ট নাইট ইজ ফ্রম বেনারস। ইট ইজ কলড তসর মীনাকারি বেনারসি টু বি প্রিসাইস”। অবাঙালি উচ্চারণে, শাড়িকে ‘সাড়ি’ বলা নায়িকারও কিন্তু অভিমান হয়, যখন সে দেখে তার স্বামীর কবিতার নায়িকাদের পরনে তারই সমস্ত শাড়ির নাম। আবার, তার স্বামীর মৃত্যুর পর, স্মরণসভার জন্য সে শাড়ি বাছছে নন্দ-র মা-কে জিজ্ঞেস করে। নন্দ-র মা তখন নিজের শাড়ির আঁচলখানি মুখে চেপে ধরে, অনর্গল কেঁদে যাচ্ছে। কর্ত্রী-র সামাজিকতা রক্ষা এবং গৃহ-সহায়িকার কান্না – এই দুই-ই মিশে যাচ্ছে শাড়ির বুননে। কীভাবে এই নারীমন বুঝতেন পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ? নারীদের জীবনে শাড়ি আসলে ব্লটিং পেপারের মতো। ঋতুপর্ণ সে-কথা জানতেন। আর তাই হয়তো, তাঁর সিনেমায় শাড়ি এক গভীর মেটাফরের মতো ছাপ ফেলেছে। (ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় শাড়ির ব্যবহার)

সব চরিত্র কাল্পনিক (২০০৮)

শাড়ি নিয়ে মেটাফরের কথা যদি বলতেই হয়, ‘বাড়িওয়ালি’ সিনেমাটি তার অনন্য নিদর্শন। সাদামাটা শাড়ি পরিহিতা বিধবা বনলতা-র জীবনে এক বাঁকবদল ঘটল, যখন তার বাড়িতে শুরু হল সিনেমার শ্যুটিং। পরিচালক দীপঙ্করের উপস্থিতিতে, বনলতার মধ্য বয়সে নতুন করে এক যৌনচেতনার সাড়া জাগে। আর তা ক্রমে ফ্যান্টাসির পর্যায়ে পৌঁছয়। তাঁর ‘কাজের মেয়ে’ মালতীর একটি রগরগে প্রেম আছে। ঝড়ের মধ্যে শাড়ি-জামাকাপড় তুলতে গিয়ে, সে তার প্রেমিককে চুমু খায় পরম আশ্লেষে। এর ঠিক পরবর্তী দৃশ্যেই, কালো ঢাকাই-বেনারসি পরে যখন বনলতা ঘরে প্রবেশ করে, দেখা যায় পরিচালক বাড়ির একটি দেওয়াল রং করছিলেন। হঠাৎই রঙের টিন পড়ে যাওয়ায় সারাঘর মেঝে ভরে যায় লাল রঙে। দৃশ্য পরিবর্তিত হতে দেখা যায়, মালতী ওই একই শেডের লাল বেনারসি এবং চেলি পরে জামাকাপড় তুলছে। বনলতার বহু পুরাতন ভৃত্য প্রসন্ন উনুনে হাওয়া দেওয়ায় সেই আঁচে ভরে যাচ্ছে চারপাশ এবং মালতী যখন শাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখনও খানিক দূরত্বে উড়ছে দু-একটি শাড়ি। এমতাবস্থায়, বনলতার হাতে ধরা বইয়ের একটি পাতা দীপঙ্কর স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে খুলতে শুরু করে। বনলতার মুখে ছিটকে এসে লাগে লালের পরত। পুরোটাই বনলতার স্বপ্নদৃশ্য। কিন্তু এই যে, নারীমন এবং তার নানা স্তরের টানাপোড়েন, তা কেবল শাড়ি ও রঙের ব্যবহারে ঋতুপর্ণ আশ্চর্য উপায়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বনলতা এবং মালতীর অতি সঙ্গোপনে থাকা ভিন্ন ইচ্ছেগুলি ফিরে ফিরে আসছে শাড়ির ব্যবহারে। দামী কালো ঢাকাই জামদানী এবং মালতীর সস্তা লাল বেনারসি অন্তত তেমন কথাই বলে। (ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় শাড়ির ব্যবহার)

শাড়ি নিয়ে মেটাফরের কথা যদি বলতেই হয়, ‘বাড়িওয়ালি’ সিনেমাটি তার অনন্য নিদর্শন। সাদামাটা শাড়ি পরিহিতা বিধবা বনলতা-র জীবনে এক বাঁকবদল ঘটল, যখন তার বাড়িতে শুরু হল সিনেমার শ্যুটিং। পরিচালক দীপঙ্করের উপস্থিতিতে, বনলতার মধ্য বয়সে নতুন করে এক যৌনচেতনার সাড়া জাগে।

বাড়িওয়ালি (১৯৯৯)

তারকোভস্কির সিনেমায় আমরা রূপকের অতিসূক্ষ্ম ব্যবহার দেখি। ঋতুপর্ণ কিছুটা সেই পথে হেঁটেছেন। কিন্তু পুরোপুরি নয়। তিনি কিছুক্ষেত্রে সোজাসুজি কথা বলতে ভালোবাসেন। শাড়ির ব্যবহার সেক্ষেত্রে অন্য মাত্রা যোগ করে। ‘উনিশে এপ্রিল’ সিনেমায় অপর্ণা সেনের চরিত্র একজন ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পীর। তাঁর সাজসজ্জায় কটকি শাড়ি, কাঞ্জিভরমের সুস্পষ্ট ছাপ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তিনি একজন শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী। কয়েকটি সূত্র ধরে জানা যায় যে, ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজে নাকি দক্ষিণ কলকাতার একটি বিশেষ দোকান থেকে শাড়ি কিনতেন। এই যে নিজের হাতে শাড়ি বাছাই থেকে রং নির্বাচন করা, এই জন্যই কি তিনি নারীদের অতি গোপন আবেগের কথা ভাবতে পারতেন! এইখানে দাঁড়িয়ে ‘রেনকোট’ সিনেমায় ঐশ্বর্য রাইয়ের কথা মনে পড়ে। (ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় শাড়ির ব্যবহার)

উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪)

যে প্রেমিককে প্রত্যাখ্যান করে বিয়ে করেছিল উচ্চবংশে, ভাগ্যের ফেরে সেই প্রেমিকের সামনে নিজের দৈন্যদশা ঢাকতে, একটিমাত্র দামি শাড়ি পরে ঘুরে বেড়ায় সে। পুরো সিনেমায় বর্তমানের দৃশ্যে, ঐশ্বর্য রাই ওই একটি সিল্কের শাড়ি পরেই অভিনয় করেছেন। তেমনই আবার ‘চোখের বালি’-তে। বিনোদিনী রূপে ঐশ্বর্য যখন আশালতাকে ব্লাউজ পরানো শেখাচ্ছে, তখন বিনোদিনীর আঁচল খুলে কোমর থেকে মেঝের উপর গড়িয়ে যাচ্ছে যমুনার মতো। বিনোদিনীর গায়ে লাল রঙা ব্লাউজ, কনট্রাস্টে সাদা থান। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বেজে ওঠে, ‘মাধব মিলন তরে/ আমার রাধা বাসরসজ্জা করে’। এ তো আসলে অকাল বৈধব্য পাওয়া, বিনোদিনীর অন্তরের তীব্র সকাম ইচ্ছে, যা সমাজের জন্য লুকিয়ে রাখতে হয়। রাধা অর্থে আমরা নীল শাড়ি বুঝি। ঋতুপর্ণ এক্ষেত্রে সাদা-লালের আশ্রয় নিলেন। আরেকটি দৃশ্যে, বিনোদিনী যখন সাদা থানের উপর কেবলমাত্র স্বর্ণালঙ্কারে সেজে ওঠে, তার দিক থেকে চোখ ফেরায় কার সাধ্যি! এই যে প্রথাগত সোনার গয়নার সাজকে ভেঙে, তা কেবলমাত্র সাদা থানের সঙ্গে পরানোর ভাবনা, ঋতুপর্ণ এখানেই আলাদা।

আলাদা সেখানেও, যখন, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ সিনেমায় কবিপত্নী রাই হ্যালুসিনেট করে তার স্বামীর কবিতার প্রেয়সী কাজরীকে নিয়ে। দু’জনেই কালো পাড়ের সাদা ঢাকাই পরে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে কবির মৃত্যুর পর।

চোখের বালি (২০০৩)

আলাদা সেখানেও, যখন, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ সিনেমায় কবিপত্নী রাই হ্যালুসিনেট করে তার স্বামীর কবিতার প্রেয়সী কাজরীকে নিয়ে। রাইয়ের চরিত্রে বিপাশা বসু এবং কাজরীর চরিত্রে পাওলি দাম। দু’জনেই কালো পাড়ের সাদা ঢাকাই পরে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে কবির মৃত্যুর পর। কবিপত্নী ক্লান্ত। কাজরী তার ঘাড় টিপে দিচ্ছে। সামান্য আরাম। ভাগ করে নিচ্ছে সংসার। একই ঘরোয়া পোশাকে বালিশ, বিছানা, চাদর গুছিয়ে রাখছে। সেই কালো পাড়ের সাদা ঢাকাইয়ের দু-প্রান্ত ধরে দু’জন মিলে ভাঁজ করছে। কী আশ্চর্য দৃশ্যকল্প! ঋতুপর্ণ এক্ষেত্রে দু’টি সম্ভাবনা উস্কে দিয়ে যান দর্শকের ভিতর। এক, শাড়ি আসলে নারী জীবনের এক অবশ্যম্ভাবী বিষয় যা তাদের হৃদয়ের ভীষণ কাছের। এক্ষেত্রে কবিপত্নী যখন মনে মনে তার স্বামীর কবিতার প্রেয়সীকে গ্রহণ করে নিচ্ছে, তখন একসঙ্গে শাড়ি ভাঁজ করার অর্থ, কবিতার প্রেয়সীকে গ্রহণ করা। আরেকটি সম্ভাবনা হল, ক্রমাগত স্ত্রী-র শাড়ি কবিতার প্রেয়সীর গায়ে পরাতে পরাতে কি সংসারের নারীও কবিতার নারী কোথাও একটা গিয়ে আসলে মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে? সংসারে যাকে পাওয়া যায় না, কবিতায় সে ধরা দেয় পেলবভাবে। যেন কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গুপ্ত দাম্পত্যকথা’। ইন্দ্রনীল মারা যাবার পর, একটি দৃশ্যে দেখা যায়, রাই চুল খুলে কালচে রঙা বেনারসি পরে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে নববধূর বেশে। এ-ও এক স্বপ্নের দৃশ্য। সে দৃশ্যে বিধবা নন্দ-র মা, সধবার বেশে এসে রাইকে বরণ করছে। মেঝের উপর পড়ে রয়েছে ইন্দ্রনীলের নিথর দেহ। নন্দ-র মায়ের পরনে রঙিন শাড়ি, মাথাভর্তি সিঁদুর। ঠিক এমনই একটি দৃশ্য আমরা দেখি, ‘বাড়িওয়ালি’ সিনেমায়। বনলতা স্বপ্নের ভিতর দেখে, তার গায়ে হলুদ হচ্ছে। সেই পুরাতন ভৃত্য প্রসন্নকে কলাপাতা বেড়ে খেতে দিতে বললে দেখা যায়, প্রসন্ন শাড়ি, শাঁখা-পলা, সিঁদুর পরে এয়ো-স্ত্রীদের আচার করছে। বলছে, কলাপাতা দেওয়া যাবে না, মড়ার জন্য ভেলা তৈরিতে তা কাজে লাগবে! প্রসন্ন একজন পুরুষ; অথচ স্বপ্নের দৃশ্যে সে নারীবেশে সজ্জিত। যেন বনলতার অতিবাস্তব বৈধব্য এবং অন্তরে লালিত বিবাহজলের মাঝে সে দাঁড়িয়ে আছে শিখণ্ডীর মতো।

সব চরিত্র কাল্পনিক (২০০৮)

কিছু সিনেমায় ঋতুপর্ণ প্রেডিক্টেবল রাস্তায় হেঁটেছেন। অর্থাৎ, যুগ, সমাজ অনুযায়ী নারী চরিত্রদের শাড়ি বেছেছেন। কিন্তু নারী-পুরুষের একরৈখিক সামাজিক বিশ্লেষণ ভেঙে বারংবার উঠে আসা পরাবাস্তব চেতনার ক্ষেত্রে, শাড়ির ভূমিকা ও ভাবনা অবর্ণনীয়। হেমন্তকালে যেমন একটা ‘কী যেন থেকেও নেই বা আছে’ অনুভূতি কাজ করে, ঋতুপর্ণ-র সিনেমার নারীদের সাজে শাড়ি ঠিক তেমন ভূমিকাই পালন করে। মনে মনে ভেবে ফেলা যায়, “ইশ, আমরা এমন করে সাজতে পারলাম না কেন!” নারীদের নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে হলে, কাউকে নারী শরীর নিয়ে জন্মাতে হয় না। মনটাই আসল। ঋতুপর্ণ জানতেন, শাড়ি আসলে শুধু শাড়ি নয়; নারীজীবনে বেজে ওঠা পুরিয়া ধানেশ্রীর আলাপ…

Written by