‘বাঁশ-তরঙ্গ’ থেকে ‘বোতল তরঙ্গ’, অভিনব সুরের সন্ধান দিচ্ছেন সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রখ্যাত বাদক নীরদ বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র তিনি

“যেকোনও বাজনাই বাজানো সহজ : তোমাকে শুধু সঠিক সময়ে সঠিক জায়গাটা ছুঁতে হবে, বাজনা আপনি বেজে উঠবে…” মহান জার্মান সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী জোহান সেবাস্তিয়ান বাখ একবার বলেছিলেন এ কথা। বাখের সে কথা যে মিথ্যে নয়, প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তা বুঝিয়েছেন তাঁর বাদ্যযন্ত্রগুলিকে বন্ধুর মতো ভালোবেসে। প্রখ্যাত বাদক নীরদ বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র তিনি। তাঁকে এবং তাঁর দাদাকে খুব অল্প বয়সেই গানবাজনায় দীক্ষা দিয়েছিলেন নীরদ বরণ।

আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময়, তাঁর বাবার কথা মনে করিয়ে দেন সোমনাথবাবু। নীরদ বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন একজন নিপুণ সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন, তেমনই তাঁর নৈপুণ্য ছিল বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষেত্রে। তিনি খুব ভালো সানাই বাজাতে পারতেন এবং প্রায়শই কীর্তনে অংশগ্রহণ করতেন। তবে, তাঁর মন পড়ে থাকত নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র অন্বেষণের দিকেই। তাঁর অনুসন্ধানই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল ‘জাইলোফোন’-এর কাছে। জাইলোফোন একধরণের বাদ্যযন্ত্র—একটি চৌকো ধাতব পাত যা ছড়ির আঘাতে বাজানো হয়। এই জাইলোফোন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই যুবকবেলায় তিনি এটির একটি দেশীয় সংস্করণ তৈরি করে ফেলেছিলেন। নীরদ বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বানানো সেই বাদ্যযন্ত্রটি একটি চৌকো কাঠ যা ছড়ির আঘাতে বাজাতে হত। সেটা ১৯৪৮ সালের কথা এবং সেই বছরই তাঁর সঙ্গে ‘ভারতীয় সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার জনক’-সরোদশিল্পী তিমির বরণ ভট্টাচার্যের দীর্ঘ সম্পর্কের সূচনা হয়। তিমির বরণই সেই প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র-সঙ্গীতকে থিয়েটারের প্রভাব মুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছিলেন। আর নীরদ বরণ ছিলেন তাঁরই প্রধান সহকারী।    

১৯৫২ সালে তিমির বরণের সঙ্গে বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন নীরদ বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইউরোপের কনসার্টে নীরদ বরণের অভিনব বাদ্যযন্ত্রের সুরের মূর্ছনা এবং তাঁর উপস্থাপনা নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয় সে দেশের সংবাদপত্রগুলিতে। ১৯৫৮-তে ‘মেলোডি অফ রিদম’-এ বাজিয়েছিলেন তিনি। পণ্ডিত রবি শংকরেরও সফরসঙ্গী হয়েছিলেন একাধিকবার। সেসময়, গানের জগতে পরিচিত হয়ে উঠেছিল তাঁর নাম। বহু সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করেছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে লক্ষ্মী নারায়ণ নামে একটি বাংলা ছবিতেও সুরারোপ করেন নীরদ বরণ।

খ্যাতির এই হাওয়া তাঁর সঙ্গ দিয়েছিল ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। তারপর ১৯৬৮ সালে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনার জেরে হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে যায় তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীত-সফর। সেই বছরই জন্মগ্রহণ করেছিলেন সোমনাথবাবু। ছোটো থেকেই বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে দেখতেন বাবাকে। দেখতেন, প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র থেকে নিঁখুত সুর বের করে আনার জন্য কত কঠোর পরিশ্রম করছেন তাঁর বাবা। নীরদ বরণ দুই ছেলেকেই তাঁর ছত্রছায়ায় এনেছিলেন, শিখিয়েছিলেন সঙ্গীত এবং হরেকরকম বাদ্যযন্ত্র বানানোর যাবতীয় কৌশল। এদিকে, তাঁদের আর্থিক অনটনও সেসময় চরমে পৌঁছায়। সোমনাথবাবুর বাবার এক বন্ধু তাঁর মায়ের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। চাকরিস্থল শ্রীরামপুরে হওয়ায় দুই ছেলেকে নিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেন তিনি। কলকাতায় রয়ে যান নীরদ বরণ। মায়ের সঙ্গে শ্রীরামপুরে চলে যাওয়ার জন্য সোমনাথবাবু আর তাঁর দাদার সঙ্গীতশিক্ষা হঠাৎ করেই থেমে যায়।ছোটোবেলার একটি ঘটনার কথা বলছিলেন সোমনাথবাবু। “১৯৭৬ সালের কথা, আমার বয়স তখন আট। বাবা আমাদের একটা দোকানে নিয়ে গেছিলেন একটা বড়োসড়ো তলতা বাঁশ (এক জাতীয় সরু নরম ফাঁপা বাঁশ) কেনার জন্য। বাঁশটা কিনে এনে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলেন তিনি এবং সেগুলো সেভাবেই রেখে দেন। ছ’মাস পর সেই টুকরোগুলোই পাতলা পাতলা করে কেটে আমাদের জন্য একটা বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে দেন।” তিনি সেই বাদ্যযন্ত্রের নাম রেখেছিলেন ‘বাঁশ-তরঙ্গ’। যুবকবেলায় জাইলোফোনের যে সংস্করণটি নীরদ বরণ নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়েছিলেন, ‘বাঁশ-তরঙ্গ’ ছিল সেটিই। দুই ছেলের হাতে নতুন বাদ্যযন্ত্র তুলে দিয়ে সেটিতেই সঙ্গীত অনুশীলন অভ্যাস করতে বলেন তিনি কারণ, কাঠের এই জাইলোফোনে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সুর বাঁধতে হত। নীরদ বরণ সরোদের মতো দেখতে একটি দোতারাও বানিয়েছিলেন।স্ত্রী গীতাই সোমনাথবাবুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন। “গীতা স্কুলে পড়ায়। বিয়ের পর আমার বাবার সঙ্গীতজীবন সম্পর্কে জানতে পারে ও এবং বুঝতে পারে যে আমি আমার বাবার পথেই হাঁটতে চাই। তারপর গীতাই আমায় সেই পথের দিশা দেখায়।” বলছিলেন সোমনাথবাবু। স্ত্রীর প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “গীতা না থাকলে কিছুই সম্ভব হত না।” তাঁর স্ত্রীই তাঁকে বলেছিলেন যে, বাবার কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর স্মৃতিতে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করতে। ২০১০ সালে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে বহু বছর বাদে ‘বাঁশ-তরঙ্গ’ বাজিয়ে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন তিনি। সেই অনুষ্ঠানই এখন শ্রীরামপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই সোমনাথবাবু একটি সঙ্গীতসন্ধ্যার আয়োজন করেন এবং আসরে উপস্থিত থাকেন সঙ্গীতজগতের গুণীজনেরা।২০১৫ সালে তাঁর বাড়ির পুনর্গঠনের কাজ চলাকালীন আর একটি ঘটনা ঘটে। বাড়ির সিমেন্টের মেঝেতে সেরামিক টাইলস বসানোর কাজ করাচ্ছিলেন সোমনাথবাবু। সেই দিনের কথা মনে করে তিনি বলছিলেন, “যাঁরা কাজ করছিলেন তাঁদের একজনের হাত থেকে টাইলস পড়ে যাওয়ার শব্দ পাই আমি। টাইলস পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে আওয়াজটা হয়েছিল, তা এমনই ছিল যে আমি সেই লোকটিকে আরও কিছু টাইলস ভাঙতে বলি। সে বেচারা ভেবেছিল টাইলস ভাঙার জন্য আমি বোধহয় তাকে খুব বকাবকি করবো এবং সে আমার কাছে তার জন্য ক্ষমাও চায়। শেষে আমি তাকে আশ্বস্ত করি যে কোনও অসুবিধা নেই। পরে আমি টাইলসের সেই ভাঙা টুকরোগুলো প্রয়োজন মতো আকারে কেটে বাঁশ-তরঙ্গের ফাঁকা বাক্সের মধ্যে রাখি। এরপর সেই বাদ্যযন্ত্র থেকে যে সুর তৈরি হয়, তা আমায় অবাক করেছিল। সেটাই ছিল আমার জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ এবং স্বতন্ত্র বাদ্যযন্ত্র তৈরির মধ্যে দিয়ে আমি আমার জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পাই।”

সোমনাথবাবু ঠিক করেন খালি প্লাস্টিকের বোতল, কাচের বোতল, বড়ো বাটি ইত্যাদি পুনর্ব্যবহার করবেন। এসব জোগাড় করতে ফুটপাত, ময়লা ফেলার জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে থাকেন, কিন্তু কিছুতেই নিজের আবিষ্কৃত সুরের খোঁজ পাচ্ছিলেন না তিনি। অবশেষে, তাঁর স্ত্রী খালি সসের বোতল ব্যবহারের পরামর্শ দেন তাঁকে। এবং তা থেকেই জন্ম নেয় ‘বোতল-তরঙ্গ’! তাঁর ছেলে সপ্তর্ষির জন্মদিনে সেই বাদ্যযন্ত্রটি উপহার দিয়েছিলেন তিনি। সপ্তর্ষিও তাঁর বাবা-ঠাকুরদার দিকেই ঝুঁকেছে। এখন সে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র এবং ইতিমধ্যেই বাদক হিসেবে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে সে। লকডাউন চলাকালীন তার বাবা তাকে সঙ্গীতের বিভিন্ন খুঁটিনাটি শেখাতে থাকে, সপ্তর্ষিও মনের আনন্দে তার বাবার কাছ থেকে রপ্ত করে নেয় কীভাবে বানাতে হয় বাদ্যযন্ত্র। এভাবেই পরম্পরা অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা।

অতিমারি তাঁদের পরিবারিক সঙ্গীতচর্চার ক্ষেত্রে একটা নতুন দিক খুলে দিয়েছে—নারকেলের মালা দিয়ে বীণা, সেতার, সরোদ, ঢোল, ধামসা এবং একতারা সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের অজস্র সূক্ষ ছোটো ছোটো ‘রেপ্লিকা’ বানিয়েছেন তাঁরা। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রতিরূপ হিসেবে সোমনাথবাবু এইধরণের শোপিস বানানো শুরু করেছিলেন পারিবারিক অন্নপূর্না পূজার জন্য। ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর এই পুজো হয়ে আসছে তাঁর বাড়িতে। নিতান্তই শখে বানানো সেই সব সূক্ষ হাতের কাজগুলো খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যে কারণে এইমুহূর্তে সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির প্রস্তাবে ভেসে যাচ্ছেন তিনি। তবে, এই প্রস্তাব নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন সোমনাথবাবু। আপাতত সঙ্গীতচর্চাতেই ডুবে থাকতে চান তিনি, এখনও নতুন পথের সন্ধান করে চলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘এখনও অনেক পথ চলা বাকি রয়েছে।’

 

 

Developed by DXDasia