প্রায় ২২৫টির বেশি ছোট নদী মারা গেছে বাংলার বুক থেকে
নদীর জীবন আছে। নদীর জীবন কেমন ভাবে থাকে? নদীর বুকে প্রবাহিত জলের ধারা যখন অবিরল থাকে, তখন সেই নদী জীবন্ত। এই বিপুল ভারতবর্ষ তথা নদীমাতৃক বাংলা। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বলেছিলেন, বাংলার ছোট বড় নদী বাংলার ইতিহাস রচনা করে। কাজেই জনপদের যাপনকে বাঁচাতে গেলে নদীকে বাঁচানো খুবই প্রয়োজন।
নদীকে বাঁচানোর প্রয়োজন কথাটি বলার অর্থ হলো নদীদের মৃত্যু হয়েছে। কত নদী মারা গেছে বাংলাতে? নিখুঁত হিসেব কষা যে একেবারে অসম্ভব, তা নয়। কারণ উপগ্রহ চিত্রের বিশ্লেষণের মাধ্যেমে খুব সহজেই তা বোঝা যায়। মোটামুটি ভাবে হিসেব করে দেখেছি, প্রায় ২২৫টির বেশি ছোট নদী মারা গেছে বাংলার বুক থেকে। নদী জনজীবনের কথা থেকে নদীর মরে যাওয়ার কথা কী আদৌ খুঁজে পাওয়া যায়? হ্যাঁ যায়। আর সেই কথা খুঁজতে গেলে শহর নগর গ্রাম গ্রামান্তর- সব জায়গায় নিবিড় ভাবে ঘুরতে হয়। প্রতিটি জনপদ থেকে উঠে আসে নদীর মৃত্যুর করুণ কাহিনির কথা। এক সময় জলপাইগুড়ি শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যেত করলা নদী। ওখানকার মানুষেরা করলাকে বলতো জলপাইগুড়ির টেমস। আজ নদীটা নেই। নদী বদলে গেছে। নদী থেকে কালো নোংরা জলের নর্দমাতে কনভার্ট হওয়ার যাত্রাপথ অতিক্রম করেছে নদীগুলো। কাজেই নদী মরে গেছে। এমনভাবেই শিলিগুড়ি শহরের বুক থেকে হারিয়ে গেছে জোড়াপানি, ফুলেশ্বরীর মতো ছোট নদীগুলো।

নদী থেকে হয়েছিল নদিয়া নাম। লোকছড়াতে ধরা ছিল সেই কথাও। “বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদয়ে এলো বান”। নদয়ে অর্থাৎ নদিয়াতে বান আসলো। নদিয়াতে বান আসার অর্থ হলো নদীগুলিতে বন্যা আসা। এক সময় নদিয়াতে নদীর সংখ্যা ছিল ৩৪টি। নদিয়াতে নদী বলতে সর্বজন জানে ভাগীরথী, জলঙ্গী, চূর্ণী, মাথাভাঙা, ইছামতী। বাকি নদীগুলো কোথায় গেল তাহলে? এক কথায় তারা মরে গেছে। কৃষ্ণনগর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অঞ্জনা, রাণাঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাচকো, কল্যাণী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা, করিমপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব ও কাজলা এই রকম সব নদীগুলো হারিয়ে গেল। মানুষের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হলো নদীদের। মানুষের লোভের দাঁত নখ নদীর জমিকে দখল করে গড়ে তুলল একের পর এক ইমারত। ক্ষতি হলো। কিছু মানুষ বুঝলো। তারা প্রতিবাদ করলো। কিন্তু প্রতিবাদ করা মানুষের সংখ্যা এতটাই কম, প্রতিবাদের সুর এতটাই দুর্বল –তা দিয়ে নদীর মৃত্যুকে আটকানো গেল না।

খোদ কলকাতা শহরে আদিগঙ্গা নদীটার অস্তিত্ব নেই। আপনি রোজ দেখেন আদিগঙ্গার বুকের উপর একের পর এক পিলার তুলে মেট্রো রেলের পথ হয়েছে; সেই ছবি। নদী বলে সেটাকে আর মনে হয় না। এখন কলকাতার মানুষের কাছে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন আপনি মেট্রো রেল চান নাকি আদিগঙ্গার পথ? একশো জনের মধ্যে নিরানব্বই জন মানুষ মেট্রো রেলের পক্ষে দাঁড়াবে। কিন্তু নদী বাঁচানোর পক্ষে মানুষের সাপোর্ট থাকবে হাতে গোনা কয়েকজন। উন্নয়নের সামনে পরিবেশের ভালোবাসার কথা-সব বৃথা। উন্নয়নের সঙ্গে জুড়ে থাকে অর্থনীতি। কাজেই তাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের করাল ঘাত নীরব নদীকেই সহ্য করতে হয়। সেটা নদীর বুকে বাঁধ তৈরি থেকে আরম্ভ করে নদীর বুকে ব্রিজ তৈরি করা পর্যন্ত।
নদীর উপর নির্ভর করা জলজ বাস্তুতন্ত্রের প্রাণীদের বেঁচে থাকারও সম পরিমাণ অধিকার রয়েছে। আইনের চোখে ‘পাবলিক ট্রাস্ট ডক্ট্রিন’ সেই অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছে বারবার, বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে। যেমন এম সি মেহেতা বনাম কমল নাথের ১৯৯৭ সালের মামলাতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট নদী ও পরিবেশের রক্ষাতে রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব নির্ধারণ করে।
আমাদের একটা কথা ভাবতে হবে। নদীর উপরে কেবল মানুষের একার অধিকার নেই। নদীর উপর নির্ভর করা জলজ বাস্তুতন্ত্রের প্রাণীদের বেঁচে থাকারও সম পরিমাণ অধিকার রয়েছে। আইনের চোখে ‘পাবলিক ট্রাস্ট ডক্ট্রিন’ সেই অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছে বারবার, বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে। যেমন এম সি মেহেতা বনাম কমল নাথের ১৯৯৭ সালের মামলাতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট নদী ও পরিবেশের রক্ষাতে রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব নির্ধারণ করে। ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা (জীবনের অধিকার)-এর সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ককে দৃঢ় করে। আদালত নদী সংরক্ষণের দৃঢ় আইনি ভিত্তি তৈরি করলেও, আদালতের বাইরে থেকে যায় বহু নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের মৃত্যু।
উন্নয়নের রথ আর নদী-দুটোকেই সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজন। সুস্থায়ী ও পরিবেশ উপযোগী উন্নয়ন তাই জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই কথা কেবল মাত্র থিওরি কপচানোর বেশি কিছু নয়। বাংলার ছোট বড় নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে নদী ও তার জনপদের মানুষগুলোকে বুঝতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন এক অনন্য উপহার হল অসংখ্য ছোট-বড় নদী রয়েছে বাংলা জুড়ে। গঙ্গা, তিস্তা, দামোদর, ময়ূরাক্ষী, অজয়, কংসাবতী, রূপনারায়ণ থেকে শুরু করে অগণিত ছোট নদী কুন্তি, বেহুলা, জুলকি, মণীকর্না, অঞ্জনা, বাচকো, ব্যারাং, ভাঙাডিহিডাংরা এমন সুন্দর নামের ছোট নদীরা ও খাল এই ভূখণ্ডের জীবনধারাকে বহন করে এসেছে; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কৃষি, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং মানুষের যাপন—সবকিছুর সঙ্গে নদীর গভীর সম্পর্ক। কাজেই নদী বাঁচাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু নদী আজ পলি জমে ভরাট। নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমলে নদীর গভীরতা কমে। বর্ষাকালে সহজেই বন্যার সৃষ্টি হয়, নদীর দুকূল ছাপিয়ে। নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজিং বা পলি অপসারণ করা প্রয়োজন। তবে বাংলার নদীকে বাঁচাতে ছোট ছোট বন্যার প্রয়োজন। কারণ বন্যা প্রাকৃতিক পদ্ধতি ড্রেজিং করে নদীর বুক। এতে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা বজায় থাকবে। জলপ্রবাহও স্বাভাবিক হবে।
দ্বিতীয়ত, নদীর তীর দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক জায়গায় নদীর তীর অবৈধভাবে দখল করে বসতি। স্থানীয় মানুষেরা ছোট নদীগুলোকে অবৈধ ভাবে দখল করেছে, রাজ্য জুরে চলছে এমন ঘটনা। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হয়ে যায়। সরকারকে কঠোর আইন প্রয়োগ করে নদীর তীরের এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে এবং নদীর জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষা অঞ্চল (River Buffer Zone) তৈরি করতে হবে। না হলে বাংলার ছোট নদীগুলোকে বাঁচানো খুবই কঠিন হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, নদীদূষণ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। শিল্পকারখানার বর্জ্য, শহরের নিকাশি নালার জল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে নদীর জল দূষিত হয়ে পড়ছে। এতে মাছ-সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জীবন বিপন্ন হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তাই শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটাও ঠিক, রাজ্য জুড়ে একেবারে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো তৈরি হয়নি, এমনটা নয়। কিন্তু প্ল্যান্ট চালাতে যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে, তা হয়ে উঠছে ছোট পৌরসভাগুলোর নির্দিষ্ট খাতে বাজেটের থেকে বেশি। কাজেই বেশির ভাগ সময় প্ল্যান্টগুলো থাকছে বন্ধ। উত্তর ভারতের ক্ষেত্রে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জল আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে কৃষি ক্ষেত্রে বিক্রি হয়। কাজেই খরচটা অনেকটা উঠে আসে। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে এই রকম পরিস্থিতি নেই মূলত সর্বত্র জলের প্রাচুর্যতার কারণে। কাজেই এই রাজ্যে তৈরি করা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে ট্রিটমেন্ট-এর সনাতনী ব্যবস্থাও সমান্তরাল ভাবে রাখতে হবে। যাতে খরচ কমানো যায়। শহর ও গ্রামের নিকাশি ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে; অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে না পড়ে; লক্ষ্য রাখতে হবে সেই দিকেও।
নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল-বিল ও জলাশয়গুলোর পুনরুদ্ধার করতে হবে। ছোট ছোট খাল ও বিল নদীর জলপ্রবাহকে সহায়তা করে এবং বর্ষার জল সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু অনেক খাল আজ ভরাট হয়ে গেছে কিংবা বেশির ভাগই দখল।
চতুর্থত, নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল-বিল ও জলাশয়গুলোর পুনরুদ্ধার করতে হবে। ছোট ছোট খাল ও বিল নদীর জলপ্রবাহকে সহায়তা করে এবং বর্ষার জল সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু অনেক খাল আজ ভরাট হয়ে গেছে কিংবা বেশির ভাগই দখল। এগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে নদীর প্রাণশক্তি অনেকটাই ফিরে আসবে।
পঞ্চমত, নদীর তীরবর্তী এলাকায় বৃক্ষরোপণ করা প্রয়োজন। গাছপালা নদীর তীরকে শক্ত করে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করে। তাছাড়া গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতেও সাহায্য করে। তাই নদীর দুই পাশে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নদী বাঁচাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। নদীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি, শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মানুষ যদি বুঝতে পারে যে নদী বাঁচলে তাদের জীবন ও জীবিকা বাঁচবে, তাহলে তারাও নদী রক্ষায় এগিয়ে আসবে। নদীর বাঁচা ও মরার সঙ্গে মানুষকে জুড়ে দেওয়ার কাজটি আজ খুবই বেশি প্রয়োজন।
নদী শুধু জলধারা নয়; এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। বাংলার সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিবেশ – নদীর সঙ্গে জুড়ে যায়। নদীকে রক্ষা করা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। এই পৃথিবী শুধু আজ শিশুর বাসযোগ্য করে তুললেই হবে না, নিজের বাসযোগ্য করে রাখতে হবে আগে।
____________
মতামত লেখকের নিজস্ব
