দুই বছর ধরে এই পরিষেবা দিচ্ছে রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল সোসাইটি
বছর তিনেক আগে রায়া দেবনাথ অনেক দূরের পথে পাড়ি দিয়েছেন। তাই ইচ্ছে করলেই রায়াকে চর্মচোখ দুটো দিয়ে দেখা যাবে না। ইচ্ছে করলেই রায়ার কণ্ঠ শোনা যাবে না। আবার ইচ্ছে করলেই রায়ার হাসি, স্পর্শ, আবেগ অনুভব করা যাবে না। অথচ আত্মীয় পরিজনদের চেনা চৌহদ্দির বাইরে গার্ডেনরিচ এলাকায় আজও রায়া দেবনাথ ভীষণভাবে বর্তমান। বলা ভালো, প্রাসঙ্গিক। রায়া দেবনাথের নামাঙ্কিত ফ্রি মেডিকেল সেন্টারের হাত ধরে রায়া মূর্ত হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসীর মনে।
রাজনীতিমনস্ক পরিবারের সচেতন মেয়ে ছিলেন রায়া। ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষের জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল সমাজকর্মী রায়ার জীবনে ব্রত। পার্ক সার্কাসে নাগরিকত্ব আইন বিরোধী জমায়েতই হোক বা নেপালের ভূমিকম্প ত্রস্ত এলাকা — সবখানেই রায়ার উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকত।
রায়ার এলাকা বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ পার্ক সার্কাস, মেটিয়াবুরুজ বা গার্ডেনরিচ এলাকার ছবিতে হিন্দু-মুসলিম বা নারী-পুরুষ বিভেদের চেয়েও এখানকার জনজীবনের চরিত্র মুখ্যত দরিদ্র। নিম্ন আয়ের মানুষেরা জীবন ও জীবিকা মেলানোর দুরূহ কাজটা নিয়ম মেনে চালিয়ে যান। মহিলারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অবহেলিত হন। সঙ্গে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হন তাঁরা। ফলে স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে পারেন না। সারাবছরই কিছু না কিছু রোগে ভুগতে বাধ্য হন। তাঁরা অবশেষে ফ্রি চিকিৎসার আশায় এলাকার স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকেন্দ্রে লাইন দেন। চর্মরোগ, সাধারণ পরিচ্ছন্নতার সমস্যা নিয়ে তাঁরা নিয়মিত ভোগেন।
কোভিডের শুরুর দিকে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে রায়া অজানালোকে পাড়ি দিয়েছেন। পিছনে ফেলে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি। যার সঙ্গে জড়িয়ে বাবা মা, আত্মীয় পরিজন, বন্ধুবান্ধব আর সেইসব অগণিত মুখ — যাঁদের কথা ভেবে রায়া নিজেই লড়াইয়ের ময়দানে নামতেন। সেইসব অসহায় সম্বলহীন অগণিত মুখের হাসির জন্যই রায়া ছুটে বেড়াতেন সর্বত্র। আর তাঁদের কথা ভেবেই এখনও রায়ার স্মৃতিতে তাঁর নামাঙ্কিত মেমোরিয়াল ফ্রি সেন্টার কাজ করে চলেছে। দুবছর ধরে তাঁরা লাগাতার মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছেন।

রায়ার কাজ এবং তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগের কথা শুনছিলাম শতাব্দী দাশের কাছে। পেশায় স্কুল শিক্ষিকা শতাব্দী, রায়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যাঁরা রায়াকে আজও সহযোদ্ধা ভেবে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলার কাজ করে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে শতাব্দী দাশও আছেন। তিনি বলছিলেন, “রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল সোসাইটি রায়ার স্মৃতিতেই গড়ে উঠেছে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে। অনেক ধারায় এই সোসাইটি কাজ করে। তার মধ্যে ফ্রি মেডিক্যাল সেন্টার অন্যতম। এখানে বিনামূল্যে গার্ডেনরিচ এলাকার দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হয়।”
রায়ার এলাকা বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ পার্ক সার্কাস, মেটিয়াবুরুজ বা গার্ডেনরিচ এলাকার ছবিতে হিন্দু-মুসলিম বা নারী-পুরুষ বিভেদের চেয়েও এখানকার জনজীবনের চরিত্র মুখ্যত দরিদ্র। নিম্ন আয়ের মানুষেরা জীবন ও জীবিকা মেলানোর দুরূহ কাজটা নিয়ম মেনে চালিয়ে যান। মহিলারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অবহেলিত হন। সঙ্গে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হন তাঁরা। ফলে স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে পারেন না। সারাবছরই কিছু না কিছু রোগে ভুগতে বাধ্য হন। তাঁরা অবশেষে ফ্রি চিকিৎসার আশায় এলাকার স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকেন্দ্রে লাইন দেন। চর্মরোগ, সাধারণ পরিচ্ছন্নতার সমস্যা নিয়ে তাঁরা নিয়মিত ভোগেন। ফ্রি ক্লিনিক চালাতে গিয়ে শতাব্দী খেয়াল করেছেন, নিম্ন আয়ের মানুষ হওয়ার জন্য ওষুধ কেনার পয়সাটুকুও অনেকের থাকে না। শতাব্দী বলেন, “দিনে চার-পাঁচ জন এমন মানুষ আসেন, যাঁদের ওষুধ কেনার সামর্থ্য থাকে না। ওষুধ লিখে দিলেও তাঁরা ওষুধ কিনতে পারেন না। তখন তাঁদের ওষুধ আমরাই দিই।”
গার্ডেনরিচ নাগরিক পরিষদ অবশ্য সচেতনভাবে নিম্নআয়ের মানুষদের চিকিৎসা দেওয়ার কাজ অনেক আগেই শুরু করেছিল। সেখানে সপ্তাহে একদিন করে হাজির হতেন চিকিৎসাপ্রার্থী মানুষের দল। বিনামূল্যে চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধের পাশাপাশি চিকিৎসার পরবর্তী ধাপগুলিও কীভাবে এলাকার মানুষ পার হতে সক্ষম হবেন, তার হদিশ নাগরিক পরিষদের স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব সহকারে দিতেন। ফলে এলাকার সংখ্যাগুরু মুসলিম কমিউনিটির কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই চিকিৎসা পরিষেবা। বাড়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতাও।
এ প্রসঙ্গে এলাকার জনপ্রিয় মুখ এবং গার্ডেনরিচ নাগরিক পরিষদের সদস্য ডাঃ রমেন্দ্র নাথ পাল বলেন, “১৯৮৪ সাল থেকে গার্ডেনরিচ নাগরিক পরিষদ সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার দাবিতে আন্দোলন করেছে। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার লক্ষ্যে পরিষদ ২০০৩ সাল থেকে নিজেরাই মেডিক্যাল সেন্টার চালাতে শুরু করে।”

এরপর ২০২০ সালে রায়ার মৃত্যু ঘটে। এলাকায় রায়ার যে ভাবমূর্তি ছিল, মানে রায়া যেভাবে গরিব মানুষদের পাশে দাঁড়াতেন, তাদের লড়াইয়ে তাঁর অংশগ্রহণ এই সবটাকেই নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল সোসাইটি। তাই গার্ডেনরিচ নাগরিক পরিষদের কাছে রায়া দেবনাথ ফ্রি মেডিক্যাল সেন্টারের প্রস্তাব দেওয়া হল। সপ্তাহে তিনদিন (প্রতি রবি, মঙ্গল ও শুক্রবার ) এবার সাধারণ মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পেতে শুরু করলেন। যেখানে মাসে আগে ১৫০-২০০ জন রোগীর চিকিৎসা হত, সেখানে এখন মাসে ৬০০-৭০০ জনের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে যাচ্ছে।
বাস্তবিকই ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও সবার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। আবার বেসরকারি চিকিৎসায় প্রচুর খরচ। তাই ব্যক্তিগত এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলিকে চিকিৎসার ভার সামলানোর কাজে এগিয়ে আসতে হবে। রায়া দেবনাথ মেমোরিয়াল ফ্রি মেডিকেল সেন্টার সেই গুরুদায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে চলেছে। সঙ্গে রয়েছে জাতিধর্ম নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতার স্বেচ্ছাসেবীদের দল। শুধু চিকিৎসা নয়, রায়া দেবনাথ ফ্রি মেডিক্যাল সেন্টারের সাহায্যে এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাও ছড়িয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের থেকে জানা গেল, এবার রোজার মাসেও ১৯ দিন ক্লিনিকে মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরা এসে কাজ করেছেন। ফলে তাঁদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা থেকেই হিন্দু-মুসলিম একে অপরের হাত ধরেছেন ধর্ম পরিচয়ে না গুরুত্ব দিয়েই। রায়া যে বিভেদহীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বেঁচে থাকুক রায়া দেবনাথ ফ্রি মেডিকেল সেন্টারের মধ্যে দিয়ে।