বন বাঁচে, নারীর হাতে : বিশ্ব বাঘ দিবসে SHER-এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

৯ জুলাই ২০২৫, বিশ্ব বাঘ দিবস-এ সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ-এর প্রান্তবর্তী পাখিরালায়ে অবস্থিত, শের (SHER : Society for Heritage & Ecological Research)-এর কমিউনিটি রিসোর্স ও নলেজ সেন্টার বাঘবনে এক অভিনব উদ্যোগের সূচনা করে। যার মূল বার্তা — “বন বাঁচে, নারীর হাতে”। অর্থাৎ, বন টিকে থাকবে নারীর যত্নে, নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে। একটি গাছ মানে অনেক জীবন, আর নারীর হাতে গাছ মানে বন ও বাঘের ভবিষ্যৎ নিরাপদ।

বাঘ থাকলে বন থাকে, বন থাকলে নদী-জল-জীবিকা সবই টিকে থাকে। সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যের অভিভাবক হল বাঘ — বিশ্বের একমাত্র বাদাবন যেখানে এরা বাস করে। “বন বাঁচে, নারীর হাতে” — এই সচেতনতা উদ্যোগের অংশ হিসেবে, জঙ্গলের পাশে বাস করা প্রান্তিক ৫০ জন নারীকে দুটি করে আমগাছের চারা প্রদান করা হয়। উপহার হিসেবে নয়, বরং একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে। যে প্রতিশ্রুতি বন ও বাঘের ভবিষ্যতের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আরও একটু মজবুত করতে চেষ্টা করে।

সুন্দরবনের মহিলারা শুধুই গৃহস্থালির কাজ করেন না। মাটি, জল, গাছ তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। এদিনের আলোচনায় বোঝানো হয়, গ্রামে থেকে কীভাবে মহিলারা বাদাবন ও বাঘ সংরক্ষণে সাহায্য করতে পারে। আশেপাশে যে গাছপালা ও পশুপাখি আছে তাদের ক্ষতি না করে, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের অংশীদার হন তাঁরা। পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু ও পরিচিত সকলের মধ্যেই বন্যপ্রাণ নিয়ে সচেতনতার বার্তা প্রচার করেন। যেমন- গ্রামে হঠাৎ কোনও বন্যপ্রাণ দেখতে পেলে বিচলিত না হয়ে বন বিভাগকে খবর দেওয়া, সর্বোপরি জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করা।

এই কর্মসূচি মনে করিয়ে দেয়, বাঘ সংরক্ষণ নীতিনির্ধারণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না, বরং তা শুরু হয় সেইসব মহিলাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে, যাঁরা বনবেষ্টিত অঞ্চলে বসবাস করেন — এবং যাঁরা সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় হয়ে উঠতে পারেন সক্রিয় পরিবর্তনের দূত।

“বন বাঁচে, নারীর হাতে” — এই কর্মসূচীতে যে আম গাছ প্রদান করা হয়েছে, তা জাদুবলে রাতারাতি বাঘে মানুষে সংঘাত মিটিয়ে দেবে বা একদিনেই বিশাল অরণ্য গড়ে তুলবে, এরকম কোনও দাবি করছে না ‘শের’। মহিলাদের গাছগুলো তুলে দেওয়ার কারণ, সেই গাছ একদিন বড়ো হবে, সেই গাছের ফল খাবে তার সন্তান, তার পরিবার। আসলে, চারাগাছগুলো রোপণের মাধ্যমে রোপিত হবে এক সম্পর্ক — নারীর সঙ্গে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণের।

অনুষ্ঠানের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল — পরাগবাহী (যেমন মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি ও কীটপতঙ্গ) পাখি-পতঙ্গদের ভূমিকাকে সামনে আনা, যারা বন ও কৃষিজমির স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে। আমগাছে ফুল ধরলে, তা পরাগবাহীদের আকর্ষণ করবে, পরাগমিলনকারী পতঙ্গরা জঙ্গল ও খেতের ফসল দুইয়েরই পুনরূত্পাদনে সাহায্য করবে।

আজকের এই জলবায়ু পরিবর্তনের বিভীষিকার কালে বনসংরক্ষণে পরিবেশ ও পরাগবাহীদের গুরুত্ব, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও তার ক্ষতিকর প্রভাব, পরিবেশ রক্ষায় মহিলাদের নীরব নেতৃত্ব দান – এই সবকিছু নিয়েই আলোচনা সভায় উপস্থিত মহিলাদের বোঝান শের-এর সদস্য সুচন্দ্রা কুণ্ডু।

আলোচনা করা হয় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ নিয়েও — যা পরাগবাহীদের সংখ্যা হ্রাস করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পরাগবাহীদের অনুপস্থিতিতে ভেঙে পড়বে পুরো খাদ্য ও বাস্তুতন্ত্র  — যার প্রভাব পড়বে  ফসল উৎপাদনে, বনের প্রাকৃতিক সম্প্রসারণে এবং সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যে, যা এপেক্স প্রিডেটার বাঘের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং পরোক্ষভাবে তার বেঁচে থাকার উপরেও প্রভাব ফেলে। গল্প বলা, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এবং অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে, অংশগ্রহণকারী মহিলারা বুঝতে পারেন — কীভাবে একটি সাধারণ আমগাছও এক বিস্তৃত প্রাকৃতিক শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত। গাছ→ পরাগমিলনকারী পতঙ্গ → বন → হরিণ → বাঘ — এই জীবনচক্রে ওই মহিলাদের উঠোনে পোঁতা আমগাছও ভূমিকা রাখে।

এই কর্মসূচি মনে করিয়ে দেয়, বাঘ সংরক্ষণ নীতিনির্ধারণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না, বরং তা শুরু হয় সেইসব মহিলাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে, যাঁরা বনবেষ্টিত অঞ্চলে বসবাস করেন — এবং যাঁরা সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় হয়ে উঠতে পারেন সক্রিয় পরিবর্তনের দূত। এছাড়া, প্রত্যেক মহিলাকে একটি করে ‘গাছের খাতা’ (Tree Journal) দেওয়া হয়। যা সহজ বাংলায় লেখা একটি ছোটো ডায়েরি, যেখানে তাঁরা চারার বেড়ে ওঠা, পরাগবাহী পাখী-পতঙ্গের আনাগোনা, ফুল ফোটা এবং চারপাশের পরিবেশের ছোটোখাটো পরিবর্তনগুলো নথিভুক্ত করতে পারবেন।

এক বছর পর, অর্থাৎ ২০২৬-এর বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবস-এর দিন এই গাছের খাতার রিপোর্ট কার্ড দেখে নির্ধারণ করা হবে এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী কোন মহিলা সবথেকে বেশি যত্ন নিয়েছে গাছের আর তাতে বাস করা পশুপাখিদের। সেইমতো তাঁদের দেওয়া হবে স্বীকৃতি ও উপহার। ‘শের’ বিশ্বাস করে, একজন মহিলা যখন গাছ লাগায়, তখন শুধু ফল বা ছায়া নয় — বাঁচে বন, বাঁচে বাঘ, আর বাঁচে ভবিষ্যৎ। তাই, বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবসে শের-এর সঙ্গে গলা মেলালেন সুন্দরবনবাসী মহিলারা — বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচে, সুন্দরবন বাঁচলে আমরা বাঁচি!

________________
ছবি সৌজন্যে: জয়দীপ কুণ্ডু

Written by