
স্কুল-কলেজে লিঙ্গ সাম্যের পাঠ দিচ্ছে এই সংস্থা
একটু মনে করুন তো ‘গুলাব গ্যাং’ সিনেমাটা। যেখানে রাজ্জোর (মাধুরী দীক্ষিত) নেতৃত্বে মেয়েরা একজোট হয়েছিল নিজেদের অধিকারের লড়াই লড়তে। কিন্তু সে তো রূপোলি পর্দার কথা, আর বাস্তবে শহর কলকাতার বুকে নারীদের আপন ভাগ্য জয় করার অধিকারের লড়াইয়ে ২৮ বছর ধরে মেয়েদের বন্ধু হয়ে পাশে আছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা স্বয়ম (Swayam – Women’s rights and ending discrimination and violence against women and girls)। শুধু রক্ষা নয়, একুশ শতকের ২২ বছর কেটে গেলেও সমাজে আজও লিঙ্গ বৈষম্যের বিষবৃক্ষ যখন বিষফল ফলাচ্ছে তখন স্বয়ম আগামীর বীজকে দিচ্ছে লিঙ্গ সাম্য শিক্ষার সুরক্ষা কবচ। কারণ ভবিষ্যৎ পৃথিবীর চাবি যাদের হাতে থাকবে, তাদের মনকে করে তুলতে হবে নির্দ্বিধায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার উপযুক্ত।

আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা : মেয়ে-মহল
পৃথিবীর যা কিছু চির কল্যাণকর তা নারী ও পুরুষ উভয় মিলে সৃষ্টি করলেও এখনও চলছে কন্যাভ্রুণ হত্যা। অনেক পরিবারে শিশুকন্যারা আজও পরিবারের বোঝা, আর কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ার কারণে মায়েরা হয়ে যান অপরাধী। ঘরে-বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেয়েরা যখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, বিয়ের ক্ষেত্রে তাকে ভাবা হচ্ছে ‘টাকার থলি’ তখন এই সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্বয়ম। কবে থেকে পথ চলা শুরু এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার? স্বয়মের কমিউনিটি কোর্ডিনেটর স্বাতী সান্যাল বঙ্গদর্শন.কম-কে জানাচ্ছেন, ১৯৯৫ সালে স্বয়মের তৎকালীন ডিরেক্টর অনুরাধা কাপুরের হাতে এই প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়। তিনি আরও জানান, “সেই সময় উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট নিয়ে কাজ শুরু হলেও ঘরে-বাইরে যারা প্রতি মুহূর্তে নির্যাতিতা হচ্ছেন তাদের জন্য কোনো তেমন আশ্রয়স্থল ছিলো না, যেখানে গিয়ে তারা তাদের মনের কথা খুলে বলতে পারেন, একটু শান্তি ও সাহস পেতে পারেন যাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা আবার লড়ার শক্তি পান। এই চিন্তা ভাবনা থেকেই স্বয়ম সংস্থাটি গঠন করা হয়।”

কীভাবে কাজ করছেন তারা? প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ত্রিপর্ণা নন্দী জানালেন, স্বয়ম মূলত দুটি ধারায় কাজ করে। একদিকে নির্যাতিতা নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে তাদের মানসিক সাহচর্য দান; অপরদিকে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, হোমে গিয়ে সেখানকার পড়ুয়াদের সঙ্গে বিভিন্ন মজাদার খেলার মাধ্যমে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম কাজের ক্ষেত্রে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মধ্যে অহেতুক বৈষম্য না করে। পাশাপাশি, বয়ঃসন্ধিকালের বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনকালীন সময়ে নানারকম কৌতূহলের সঠিক উত্তর দিয়ে পড়ুয়াদের আত্মসচেতন করে তোলেন তারা। কোনো সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে তার লিঙ্গ নির্ধারিত হয় বাবার দ্বারা, এইরকম বৈজ্ঞানিক সত্যকে পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরছেন তারা। কিন্তু এই সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার ব্যাপারে অভিভাবকদের মতামত কী? এই প্রসঙ্গে ত্রিপর্ণা জানালেন, অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। ক্যালকাটা ইন্টারন্যাশানাল স্কুল, নেতাজি নগর ডে কলেজ, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউশন, লরেটো রেনবো হোমস ফাউন্ডেশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অন্যান্য শিক্ষাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করে তুলছে স্বয়ম।
সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবার বা পরিবারের বাইরে যখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন একের পর এক নারী তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে গোপনীয়তা রক্ষা করে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তাদের ট্রমা মুক্ত করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছেন স্বয়মের সদস্যরা। স্বাতী সান্যাল জানালেন অনেক মেয়ে যারা একসময় কোনো না কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এখন তারাই অন্য কারোর পাশে দাঁড়িয়ে লড়ছেন নির্যাতনের বিরুদ্ধে।

সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবার বা পরিবারের বাইরে যখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন একের পর এক নারী তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে গোপনীয়তা রক্ষা করে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তাদের ট্রমা মুক্ত করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনছেন স্বয়মের সদস্যরা। স্বাতী সান্যাল জানালেন অনেক মেয়ে যারা একসময় কোনো না কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এখন তারাই অন্য কারোর পাশে দাঁড়িয়ে লড়ছেন নির্যাতনের বিরুদ্ধে। তিনি আরও জানান, কোভিড লকডাউনে গার্হস্থ্য হিংসার পরিমান বিপজ্জনক ভাবে বৃদ্ধি পায়। শুধু কলকাতা নয়, বৃহত্তর কলকাতা এবং শহরতলির মহিলাদেরও সুরক্ষা দানের চেষ্টা করছেন স্বয়মের সদস্যরা, এমনকি অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, নেটওয়ার্কের সাহায্যেও বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতা বৃদ্ধি, বাল্য বিবাহ রোধ প্রভৃতি কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে স্বয়ম। যেকোনো রকম অন্যায়ের শিকার হলে যে কোনো নারী যোগাযোগ করতে পারেন স্বয়মের সঙ্গে। সংস্থার প্রোগ্রাম অ্যাসিসটেন্ট সৌমি জানা এবং প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ত্রিপর্ণা নন্দী জানালেন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যেতে পারে, এছাড়াও dss@swayam.info, swayam@swayam.info মেইল আইডিতে ইমেইল করতে পারেন। তাছাড়াও হেল্পলাইন নম্বরে ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে স্বয়মের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। স্বয়মের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট https://swayam.info/in-media/

বর্তমান বিশ্বে মেয়েরা যখন দেশ শাসন করছে, যুদ্ধবিমান চালাচ্ছে, নেতৃত্ব দিচ্ছে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সেখানে দাঁড়িয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের লজ্জা কলঙ্কিত করে সমাজকে। সমাজের এই লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করছে স্বয়ম। তাদের স্বপ্ন শুধু নারী-পুরুষ নয়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও একসঙ্গে মিলে ভেদাভেদহীন পৃথিবীতে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের দিকে। যেখানে নারী, পুরুষ বা অন্য কোনো পরিচয়ে নয়, মানুষকে সবাই চিনবে শুধুই মানুষ হিসাবে।
