
এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার নবজাগরণ – নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাস
কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের পূর্বদিকের ফুটপাথ ধরে দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে পূর্ব দিকে হেঁটে গেলে, চোখে পড়ে কলকাতা শহরের সর্বাধিক ঐতিহ্যবাহী ইমারতগুলির কয়েকটি। ঠিক যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছেন ফেলে আসা সময়ের কোনো সম্রাট, যার ঐশ্বর্য ম্লান হলেও গৌরব একফোঁটা কমেনি। এই প্রাচীন ধ্বংসপ্রায় বাড়িগুলির প্রতিটি দেওয়ালে খোদাই করা আছে বাংলার রেনেসাঁস। মেছুয়া বাজার স্ট্রিটের উত্তরদিকে অবস্থিত ইহুদি সাহেবের বাজার কিংবা জিউ মার্কেট’কে পিছনে ফেলে এগিয়ে আসলেই আপনি এসে পড়বেন এক ধূলিধূসরিত বাড়ির সামনে, যার প্রতিটি ইটে লেখা রয়েছে বাংলার গৌরবান্বিত ইতিহাস; এক সময় যার মালিক ছিলেন মহারাজা দুর্গাচরণ লাহা (১৮২২-১৯০৪)। তারকনাথ পালিত মহাশয়ের পিতা, স্বর্গীয় কালীকিঙ্কর পালিতের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল এই ইমারতটি। পালিত পরিবারের কাছ থেকে এই ভবনটি কিনে নিয়েছিলেন লাহারা।

লাহা বাড়ি
যে বাড়িটি (১০ নং বাড়ি) থেকে নারী ক্ষমতায়নের সূচনা হয়েছিল, তা স্থানীয়দের কাছে নবগোপাল মিত্র-র বাড়ি হিসাবে পরিচিত। জীবনের শেষার্ধে পৌছে নিজের সমস্ত সম্পত্তি হারিয়ে বসেছিলেন নবগোপাল। শেষমেশ এই বাড়িটি তাঁকে বন্ধক রাখতে হয়। সেদিন তিনি জানতেন না যে বাড়ি বন্ধক রাখার ফলে তিনি নিজের অজান্তেই বাংলার প্রথম ফটোগ্রাফিক স্টোর খুলবার পথকে প্রশস্ত করেছিলেন। ১৮৯৮ সালের মার্চ মাসে এই বাড়িতেই গড়ে উঠেছিল সরোজিনী ঘোষ পরিচালিত ‘মহিলা আর্ট স্টুডিও’। একজন মহিলাকে স্টুডিও চালাতে দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিল সেসময়ের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের।
উনিশ শতকে বাংলার উচ্চবিত্ত মহিলারা সাধারণত বাড়ির অন্দরমহলে থাকতেন। পুরুষদের সামনে সচরাচর আসতেন না। যাতায়াতের জন্য পালকি ব্যবহার করতেন, যাতে পালকির দরজায় লাগানো মোটা পর্দা পেরিয়ে কোনো পরপুরুষের নজর তাঁদের উপর না পড়ে। সে সময়ের অতি প্রশংসিত বাঙালি লেখিকা রাসসুন্দরী দেবীর লেখায় স্পষ্টভাবে ধরা দেয় তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতি। নিজের আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’-এ রাসসুন্দরী দেবী লেখেন, শাশুড়ি মায়ের নির্দেশে ভোরবেলা থেকে মাঝরাত অবধি মুখ বুজে ঘরের সমস্ত কাজ করে যেতে হত তাঁকে। আর এই সমস্ত সময়, তাঁর মুখের উপর টানা থাকত লম্বা ঘোমটা। এমনকি মহিলাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি নিষেধ জারি ছিল।
মেয়েদের বাইরে বেরিয়ে চাকরি করবার তো প্রশ্নই উঠছে না সে সময়। মেয়েরা যে আপিস-কাছারির কাজে পুরুষদের সমান পারদর্শী কিছুতেই হতে পারে না, এ একপ্রকার জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হত তাদের উপর। মনে করা হত, মেয়েরা বাইরে গিয়ে চাকরি করলে তাতে পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে। তাছাড়া মেয়েরা বেরিয়ে গেলে সংসার, সন্তান দেখভাল করবে কে? অসামাজিক তকমা লেগে যাওয়ার ভয় তাড়িয়ে বেড়াত তাদের।
বাংলার প্রথম মেয়েদের স্কুল ‘গৌরি বাড়ি’ প্রতিষ্ঠিত হয় উল্টোডাঙায়, ১৮১৯ সালে। তবে বাংলার মাটিতে নারীশিক্ষার বীজ তার আগেই বপন করা হয়ে গেছিল। ১৮০৭ থেকে ১৮৪৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে খ্রিস্টান মিশনারীরা বাংলা জুড়ে বেশ কিছু মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৪৭ সালের পর বেশ কিছু বাঙালি, নিজেরাই এই দায়িত্ব তুলে নেয়। ১৮৪৯ সালে ড্রিংকওয়াটার বেথুন মেয়েদের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্কুল চালু করার পর বাংলায় নারীশিক্ষার আধুনিক যুগের সূচনা হয়।

সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ
এর কয়েক বছর পর ১৮৫৭ নাগাদ ফটোগ্রাফিতে হাতেখড়ি হয় বাঙালি মেয়েদের। যদিও এর পিছনে একটা কারণ ছিল। যেহেতু স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকেই মুখ দেখানোর অনুমতি ছিল না মেয়েদের, সেহেতু তাদের ফটো তুলবার জন্য দরকার ছিল একজন মহিলা আলোকচিত্রীর। মেয়েরা এই কাজে যুক্ত হওয়ার আগে মহিলাদের ফটোগ্রাফ তোলা রীতিমত পরিশ্রমসাধ্য ছিল। যার ফটো তোলা হবে, তাকে নিয়ে পালকিবাহক সোজা হাজির হতো স্টুডিও’তে। মেয়েটির সহচরীরা তাকে ভিতরে নিয়ে আসত, বুঝিয়ে দিত কোন চেয়ারে বসতে হবে। ফটোগ্রাফার ক্যামেরা আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখতেন। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর তাঁর নির্দেশনায় তাঁর স্ত্রী কিংবা অল্পবয়সী কন্যা ক্যামেরার লেন্সটি খুলে দিত। ফটো তোলা হয়ে গেলে আবার বন্ধ করে দিত সেটা। মহিলাটির সহচরীরা পুনরায় তাকে পর্দায় ঢেকে, ফটোগ্রাফারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি পালকির ভিতরে নিয়ে যেত। এই গোলমাল সামাল দিতেই ভীষণ ভাবে প্রয়োজন পড়েছিল একজন মহিলা ফটোগ্রাফারের। মেয়েরাই যদি ফটোগ্রাফি শিখে নিতে পারে, তাহলে তো আর পর্দানশিন উচ্চবংশের মহিলাটির কোনো ভয় থাকে না!

বেথুন স্কুল এবং কলেজ
‘ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’-এর সদস্য মিসেস ই মায়ের (Mrs. E. Mayer) ভারতের প্রথম পেশাদার মহিলা ফটোগ্রাফার। অন্যান্য কয়েকটি উল্লেখ্য নাম হল মিসেস টি থম্পসন এবং মিসেস সি বি ইয়াং। ভারতীয় উচ্চবিত্ত নারীদের সুবিধার্থে ৭ নং ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট-এর এক কোণায় মিসেস ই মায়ের খুলে বসেন একটি স্টুডিও। ১৮৬৪ সালে মিসেস মায়ের-এর এই স্টুডিওটি কলকাতার ৫ নং ওয়াটারলু স্ট্রিটে স্থানান্তরিত হয়। সমকালীন তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৭ নাগাদ মিসেস ডি গ্যারিক’ও কেবলমাত্র মহিলাদের জন্য একটি স্টুডিও খোলেন ওয়াটারলু স্ট্রিটে, কিন্তু তা মাত্র এক বছরের মাথাতেই বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৯২ সালে স্থানীয় মহিলাদের ফটো তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হায়দ্রাবাদ শহরের বুকে ‘জেনানা ফটোগ্রাফিক স্টুডিও’ চালু করেন লালা দিনদয়াল। মহিলাদের সম্মান রক্ষার্থে এই স্টুডিও’টি চারিদিক দিয়ে উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। এছাড়াও শোনা যায়, স্থানীয় মহিলাদের সাহচর্যে মিসেস কেনি-লেভিক ফটো তুলে দিতেন উচ্চবংশের মহিলাদের।
এই তালিকা প্রসঙ্গে যে মহিলা ফটোগ্রাফারের কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন মিসেস বিবি উইন্স। সে সময় ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের ফলে তোলপাড় চলছে গোটা বাংলা জুড়ে। এই আন্দোলন মেয়েদের শিক্ষার কথা বলেছিল। এই আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি মেয়েদের ফটোগ্রাফি শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন মিসেস উইন্স। তাঁর শিক্ষায় দক্ষ ফটোগ্রাফার হয়ে ওঠা প্রথম মহিলাটি ছিলেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের স্ত্রী মহারানী মনমোহিনী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ো দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীও ছিলেন এমনই একজন প্রতিভাবান ফটোগ্রাফার। ঠাকুর পরিবারের বহু মহিলার ছবি ধরা পড়েছিল তাঁর লেন্সে।
আর এরপর এলেন সরোজিনী ঘোষ – উনবিংশ শতকের প্রথম পেশাদার মহিলা ফটোগ্রাফার, যিনি কলকাতার ৩২, কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে উদ্বোধন করলেন ‘মহিলা আর্ট স্টুডিও অ্যান্ড ফটোগ্রাফিক স্টোর’-এর। নারী ক্ষমতায়নের প্রাথমিক চিহ্নগুলি চার দেওয়ালের ভিতর আড়াল করে আজও একই ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাড়িটি।
