উলকি, কাজল থেকে কালো দাঁত, ফিরিঙ্গি খোঁপা : শতবর্ষ আগে কলকাতার সাজ

“কুন্তলে সুগন্ধি লইয়া
কুসুম-চামেলি দিয়া গো
আমি হইতাম দাসী ভালবাসি
চিরুনি করিতাম কেশ!
আমার শ্যাম যদি হইতো মাথার কেশ!”

সৈয়দ শাহ নূর রচিত এই গান যেন বিরহিনী রাধারানির এক নিভৃত রূপচর্চার বিবরণ। রূপচর্চা যেমন প্ৰিয় বা প্রিয়ার জন্য নিজেকে সাজানো, তেমনই নিজেকে ভালোবেসে নিজের জন্য নিজেকে সাজানোও বটে। এই ‘সাজোসাজো’ রব এখন, ২০২৫-এ-ও যেমন প্রাসঙ্গিক, আজ থেকে শতবর্ষ আগেও ঠিক ততটাই প্রাসঙ্গিক ছিল। একশো বছর আগে কেমন ছিল কলকাতার রূপচর্চার মানচিত্র?

হাল আমলের সাজ বা ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসাবে ‘ট্যাটু’ বা ‘উলকি’ একটি খুবই সর্বজনীন উপাদান। অনেক বাঙালির হাতে, পায়ে, গলায় বা শরীরের বিভিন্ন অংশে ট্যাটু দেখা যায়। মুঘল আমলে ভারতে তো এর প্রচলন ছিলই, তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে হাজার হাজার বছর ধরে ট্যাটু বা উলকির প্রচলন চলে আসছে। পুরোনো কলকাতাতেও (পূর্ববঙ্গতেও একইভাবে) উলকির প্রচলন ছিল, তবে তা মূলত প্রান্তিক অথবা ‘গ্রাম্য’ মহিলাদের মধ্যে। কিছুক্ষেত্রে তা কলকাতার ভদ্র বাড়িতেও বিস্তারলাভ করে। কপালের ভ্রুযুগলের মাঝে, দাড়িতে, হাতে, এমনকি নাকের উপরেও এই উলকি করা হত। মজার বিষয় হল, এই উলকিশিল্পী হতেন মুসলিম স্ত্রীলোকেরা। সূঁচ ও বিশেষ একধরনের কালির মাধ্যমে করা হত এই উলকি। শিশুদের উলকি করার সময় তারা ভয় পেয়ে গৃহস্থ বাড়ির উপরে উঠে যাওয়ায় এবং উলকিকার মুসলমান হওয়ায় অনেকেই এই উলকির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেত।

ট্যাটু যদি আজকের ফ্যাশন স্টেটমেন্টের একটি দিক হয়, তবে অন্য দিকটি অবশ্যই কাজল। রামায়ণে ‘অসিতাপাঙ্গী’ শব্দ পাওয়া যায়, যার অর্থ চোখের নিচের অংশ কালো দেখতে লাগাটা একটি সৌন্দর্যের লক্ষণ। বোঝাই যাচ্ছে এখানে কাজলের কথাই বলা হচ্ছে। কাজল এখন ট্রেন্ডিং থাকলেও, একটা সময় বাঙালিদের মধ্যে কাজল পরার প্রচলন একদমই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন কেবল শিশুদের চোখেই কাজলের ব্যবহার ছিল। তবে দিল্লিতে স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই কাজল পরার প্রচলন ছিল।

সৌন্দর্যের আরও একটি সূচক অবশ্যই মুখের হাসি। আর আপনার হাসি কেমন হবে, সেটি নির্ভর করে আপনার দাঁতের গঠন ও রঙের উপর। ঝকঝকে মুক্তোহাসি পাওয়ার জন্য মানুষ এখন হাজার চেষ্টা করে, টুথপেস্টের মধ্যে নুন, লেবু, গোলমরিচ যা পারে মিশিয়ে দেয়, কিন্তু আপনারা কি ভাবতে পারেন, একসময় মানুষেরা সাদা দাঁত পছন্দ করতো না! অনেক মানুষ দাঁত মাজতেন তুঁতে এবং বিভিন্ন উপাদান দ্বারা নির্মিত মিশি দিয়ে। মিশি দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত কালো রঙের হয়ে যেত। সেই কালো দাঁতই ছিল মানুষের পছন্দ। তারপর বাজারে আসে তুঁতে দিয়েই তৈরি একপ্রকার মাজন, তাতে দাঁত কালো না হলেও তা থেকে তুঁতের গন্ধ বের হত। এরও পরবর্তীকালে বাজারে আসে বিদেশি দাঁতের গুঁড়ো মাজন।

ট্যাটু যদি আজকের ফ্যাশন স্টেটমেন্টের একটি দিক হয়, তবে অন্য দিকটি অবশ্যই কাজল। রামায়ণে ‘অসিতাপাঙ্কী’ শব্দ পাওয়া যায়, যার অর্থ চোখের নিচের অংশ কালো দেখতে লাগাটা একটি সৌন্দর্যের লক্ষণ।

পাশাপাশি, বিভিন্ন বিচিত্র উপায়ে কেশবিন্যাসের কথা জানা যায় পুরোনো কলকাতায়। সধবা স্ত্রীলোক মাথার মাঝখানে সিঁথি কেটে চুল বাঁধতো আর বিধবারা সিঁথি না কেটে মাথার পিছনে চুলে একটা গাঁট দিয়ে চুল বাঁধতো। আলগা চুল ফাঁস দিয়ে বেঁধে ‘বেনে খোঁপা’র প্রচলনও ছিল তখন। আর এক ধরনের খোঁপার কথা জানা যায়, যা বিনুনির সঙ্গে নানা রঙের ফিতে জড়িয়ে গোল করে ঘুরিয়ে চাকার আকৃতির মতো করে কাঁটা দিয়ে আটকে তৈরি করা হত। একে বলা হত ‘ফিরিঙ্গি খোঁপা’। এছাড়া বিদেশি প্রভাবে top knot এবং back knot-এর প্রচলনও ছিল তখন। এবার যদি পুরুষদের প্রসঙ্গে আসা যায়, বৃদ্ধরা প্রায় সকলেই মাথা মুড়িয়ে মাথার পিছনদিকে একটি শিখা বা টিকি রাখতেন। আবার কিছুজন চুল ছোটো করে কেটে রাখতেন। চুলে ‘টেরি’ কাটার প্রথা তখন ছিল না। এ তো গেল চুল কাটা, কিন্তু চুল তো আঁচড়াতে হবে, সেটা হবে কি দিয়ে? একসময় চিরুনি নির্মাণ করা হত সজারুর কাঁটা দিয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে তা পরিবর্তিতে হয়ে আসে কাঠের (মূলত চন্দনকাঠের) চিরুনি। কিছু বিত্তবানেরা হাতির দাঁতের চিরুনিও ব্যবহার করতেন।

তখনকার দিনে সাবানের ব্যবহার প্রায় ছিল না। কিন্তু গায়ে মাখার জন্য অনেকরকমের চূর্ণ ছিল। দুধ ময়দা দিয়ে, বেসন দিয়ে গা মলা হত আর তারপর অনেক রকম সুগন্ধি গুঁড়ো ব্যবহার করা হত, তাতে চামড়া পরিষ্কার হত, শরীর স্নিগ্ধ হত আর চামড়া চকচকে থাকতো। তখন মনে করা হত সাবানে চুন সোডা আছে, ফলে তা চামড়াটা খসখসে করে দেয়, কিন্তু চূর্ণ ব্যবহার করলে সেই ভয় থাকে না।

ঝকঝকে মুক্তোহাসি পাওয়ার জন্য মানুষ এখন হাজার চেষ্টা করে, টুথপেস্টের মধ্যে নুন, লেবু, গোলমরিচ যা পারে মিশিয়ে দেয়, কিন্তু আপনারা কি ভাবতে পারেন, একসময় মানুষেরা সাদা দাঁত পছন্দ করতো না?

এখন বিবাহ অনুষ্ঠানে মেহেন্দি একটি পৃথক অনুষ্ঠানের রূপ পেয়েছে। হাতে বা এখন শরীরের বিভিন্ন অংশে মেহেন্দি করার ‘ট্রেন্ড’ খুবই প্রচলিত। মেহেন্দি যে মূলত হিন্দি গানের ও হিন্দি সিনেমা-সিরিয়ালের হাত ধরে বাংলায় অনুপ্রবেশ করেছে, তা আমাদের মোটামোটি জানা। তবে এটা হয়তো অনেকেরই অজানা যে মেহেন্দির সঙ্গে বাঙালি তথা ভারতীয় সংস্কৃতিরও সরাসরি কোনো যোগ নেই। একসময় বাঙালিদের মধ্যে (কিছুক্ষেত্রে এখনও) যেমন শুভ কাজে তেল-হলুদ মাখার একটি রেওয়াজ ছিল, সেই রকম আরব ও পারস্যে মুসলমানরা দাড়িতে, হাতে ও পায়ে মেহেন্দি মাখতো, সেখান থেকেই মেহেন্দির প্রচলন ও ভারতে আগমন। ইসলামপন্থীদের দাড়িতে মেহেন্দি মাখার প্রবণতা এখনও দেখতে পাওয়া যায়। একটা সময় মেহেন্দি হিন্দুদের ক্ষেত্রে অগ্রহনীয় ছিল। কোনো নারী হাতে পায়ে মেহেন্দি করলে তাকে মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হত না, এই ঘটনার কথাও জানা যায়।

নিজেকে কেমনভাবে সাজাবো, সাজালে লোকে কী বলবে, এই ব্যক্তিজীবনে সমাজের হস্তক্ষেপ আগেও ছিল, এখনও আছে, ভারতবর্ষের মতো দেশে আগামীতেও থাকবে। তবে আমাদের সমাজ অনেককিছুই জেনে বা না জেনে চাপিয়ে দেয় আমাদের উপর। সাজ যেন মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের সূচক। কে কানের দুল পরলো, কে কাজল পরলো, কে হাতে মেহেন্দি পরলো বা নখে নেলপালিশ পরলো, সমাজ তা দিয়ে তার ‘সেক্স্যুয়াল ওরিয়েন্টেশন’ নির্ধারণ করে। আমাদের ইতিহাস যদি তারা পড়তেন, তাহলে বুঝতেন, ব্যাপারগুলোকে যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, ব্যাপারগুলো ঠিক ততটা সহজ নয় কিন্তু…
_____
তথ্যসূত্র : কলিকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা/ মহেন্দ্রনাথ দত্ত/ রচনাকাল ১৯২৯

Written by