
এক্সক্লুসিভ নীলাঞ্জন সাহা এবং তাঁর মিউজিক্যাল স্যান্ডউইচ
“আমার এক দাদা বাড়ির পাশেই চায়ের দোকান খুলেছিল। আমার তখন পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা চলাকালীনই একটা আইডিয়া মাথায় আসে। যদি একটা স্যান্ডউইচের দোকান করা যায়, তাহলে কেমন হবে! দাদাকে এই আইডিয়ার কথা বলায় সে রাজি ছিল না। তাছাড়া আরও একটা কারণ হল, এক বন্ধুর সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু কথা কাটাকাটি হয়। তারপর আমি ভেবেছিলাম নতুন কিছু একটা করে দেখাব। ডিসেম্বরের তিন তারিখ দাদাকে বললাম, দাদা রাজি হল না। তখন থেকেই ভেবে নিয়েছিলাম একাই করব।”- কথাগুলি বলছিলেন তরুণ শিল্পী নীলাঞ্জন সাহা। এই রাজ্যে গান-বাজনা নিয়ে চর্চার মানুষ কম নেই, কিন্তু গান গেয়ে রোজগার করার স্বপ্ন ক’জনই বা দেখতে পারেন! নীলাঞ্জন পেরেছেন। স্বপ্ন দেখে তাকে বাস্তবায়িত করেছেন। দক্ষিণ কলকাতার ছেলে নীলাঞ্জন। গিটার হাতে গান গাইতে গাইতে গোলপার্কের ফুটপাথে স্যান্ডউইচ বিক্রি করেন। স্টলের নাম দিয়েছেন ‘মিউজিক্যাল স্যান্ডউইচ’।

নিয়মিত সন্ধেবেলা সেখানে বসেন তিনি। বাংলা অল্টারনেটিভ সঙ্গীতচর্চাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নীলাঞ্জন বেছে নিয়েছেন ফুটপাথের স্পেসটাকেই। শুধুমাত্র পুরোনো বাংলা গান শোনান তিনি। সঙ্গে থাকে গিটার। গান এবং স্যান্ডউইচকে পাশাপাশি বসিয়ে তিনি বলেন, “গান শুনতে গেলে খেতে হবে, খেতে গেলে গান শুনতে হবে”। ২০১৮-র ডিসেম্বর থেকে নিজের এই নেশাকেই পেশা হিসাবে বেছে নেন। এখানে এলে আপনি পেয়ে যাবেন মাত্র ১৫ টাকার স্যান্ডউইচের সঙ্গে এক প্রতিভাবান ছেলের অপূর্ব কণ্ঠস্বর। প্রতিদিন দশ-বারোটা করে স্যান্ডউইচ বানিয়ে আনেন নিজেই। বিক্রিও হয়ে যায়। নীলাঞ্জন আমাদের জানান, “গান নিয়ে কিছু করার তাগিদ তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। অথচ শো দেখার টিকিট কেনা, গানবাজনার সরঞ্জাম কেনার কোনও সামর্থ নেই। আয়ের সমস্ত পথও বন্ধ। ঘরে বসে থেকে আদতে কিছুই হয়ে উঠছিল না। এমন একটা উপায় খুঁজছিলাম, যেখানে নিয়মিত গানের অনুশীলন করতে পারব এবং কিছু টাকাও হাতে আসবে।”
এই কাজ করতে করতেই নীলাঞ্জন খুঁজে পেয়েছেন ভিন্নধর্মী একটি চওড়া রাস্তা। স্ট্রিট মিউজিক সবসময় তরুণদের জন্য একটা শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু কলকাতায় এই সুযোগ খুব একটা নেই। রাস্তায় রাস্তায় বা ট্রেনে বাসে গান গেয়ে বেড়ান এরকম অনেক শিল্পীই আছেন। তাঁরা যোগ্য সুযোগ পান না। নীলাঞ্জনের মিউজিক্যাল স্যান্ডউইচ সেরকমই একটা প্ল্যাটফর্ম। নীলাঞ্জন চান এরকম অসংখ্য শিল্পীর সঙ্গে কাজ করতে। তাঁর শখ পুরোনো বাংলা ছবির গান গাওয়া, তাছাড়া মহীনের ঘোড়াগুলি, ক্যাকটাস, ফসিলস, ফকিরা, চন্দ্রবিন্দু তো আছেই। অনেক পথচারী শুধু স্যান্ডউইচ কিনে চলে যান, গান শুনতে চান না। কিন্তু তাতে হার মানতে নারাজ এই তরুণ।
ওঁর কথায়, ‘স্ট্রিট মিউজিকও একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। রাস্তায় রাস্তায় গান গেয়ে বেড়ান, শহরের এমন শিল্পীদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই’। স্ট্রিট মিউজিক নিয়ে চর্চা বিদেশে যথেষ্ট পরিমাণে হলেও পশ্চিমবঙ্গে এধরনের গানবাজনার প্রচলন নেই। এদিক থেকে নীলাঞ্জনের এই উদ্যোগ যুব সমাজ তথা বাংলা অলটারনেটিভ গানের ক্ষেত্রেও সাফল্য আনবে বলে মনে করছেন বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীরা। বর্তমানে নীলাঞ্জন ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পড়ছেন।

