কথা বলছেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও জেল জননী অলকানন্দা রায়
পুরাণ মতে, সরস্বতী বিদ্যার দেবী। অজ্ঞানতা, অবিদ্যার আলো দূর করে জ্ঞান ও বিদ্যার সৌন্দর্য লাভের জন্য পূজিতা হন সরস্বতী। তাই বসন্ত পঞ্চমী তিথি বিদ্যা ও সৌন্দর্য প্রিয় সকলের কাছেই পবিত্র। সারস্বত চর্চা দূর করে মনের কলুষতা। কিন্তু কোনো কারণে যাদের চলার পথে ঘটেছে ছন্দপতন, কোনো অবিদ্যার গ্রাসে যাদের ঠিকানা এখন সংশোধনাগার, তারাও আবার সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসতে হাত ধরেছেন বিদ্যার দেবীর।
বিদ্যার আশীর্বাদে দস্যু রত্নাকর রূপান্তরিত হয়েছিলেন মহাকবি বাল্মীকিতে, মহাকাব্যের যুগ থেকে আজও বিদ্যা শত শত রত্নাকরকে করে তুলছে বাল্মীকি। যারা দিশাহীন অন্ধকার থেকে এগিয়ে আসছে আলোর পথে।

সংশোধনাগারে সারস্বত চর্চার ইতিহাস নতুন নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে যাদের ঠিকানা হয়েছে চওড়া লোহার গরাদের অপর প্রান্তে, তাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে থেকেই সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী সাহিত্য। অনেকেই উচ্চশিক্ষা লাভ করে এগিয়ে গেছেন জীবনের পথে। ঘটেছে মানসিক উত্তরণ। শুধু প্রথাগত পড়াশোনা নয়, অন্তরে লুকিয়ে থাকা সৃষ্টিশীল সত্ত্বার চর্চার মাধ্যমেও তারা খুঁজে পাচ্ছে জীবনের পথ। নাচ, গান, রচনা, ছবি আঁকা, হস্তশিল্প প্রভৃতি বিভিন্ন চারুশিল্প তাদের প্রতিদিন করায় শুচিস্নান, ফলে একটু একটু করে রোজ তাদের মন থেকে ধুয়ে মুছে যায় পঙ্কিল অপরাধ মনস্কতা।

সমাজের চোখে যারা অপরাধী, ঘৃণ্য মানসিকতার জীব, তারাই আজ খুঁজে নিয়েছে নতুন ভাবে বেঁচে থাকার উপায়। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী তথা জেল জননী অলকানন্দা রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে এ বিষয়ে জানাচ্ছেন, “সকলের মধ্যেই সৃষ্টিশীল প্রতিভা আছে, হয়তো পরিস্থিতির চাপে কিছু মানুষ সেটা ভুলে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। তার জন্য শাস্তিও তারা পায়, কিন্তু তারা সবাই ভালোবাসার কাঙাল। আমি ওদের ভালোবেসেছি, ওদের বুঝিয়েছি সরস্বতীর রূপ আসলে জ্ঞানের রূপ। এইভাবে একটু একটু করে ওদের মনের পরিবর্তন হয়। ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র মহড়ার সময় ওদের বলেছি দেবী লক্ষ্মী রত্নাকরকে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে ধন দৌলত দিতে চান, তখন রত্নাকর তা নিতে অস্বীকার করেন। কারণ যে প্রকৃত জ্ঞানের আলো দেখেছে, সে কখনোই লোভের বশবর্তী হয় না। এইভাবেই তাদের উত্তরণ ঘটেছে। আসলে মানুষের যখন জ্ঞানের বোধটা হয়, তখন সে সব ধরনের নেগেটিভিটি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তাই ধূপধুনো দিয়ে পুজো নয়, মনের শুভবোধ ও সৃজনশীল সত্ত্বার প্রতিদিনের অনুশীলনই প্রকৃত সরস্বতী পুজো।”
সংশোধনাগারে সারস্বত চর্চার ইতিহাস নতুন নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে যাদের ঠিকানা হয়েছে চওড়া লোহার গরাদের অপর প্রান্তে, তাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে থেকেই সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী সাহিত্য। অনেকেই উচ্চশিক্ষা লাভ করে এগিয়ে গেছেন জীবনের পথে।
জেলের উঁচু প্রাচীরের বাইরে মুক্ত জেলে যারা আছে, তারাও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি শিল্পী হিসাবে আমন্ত্রিত হয়ে সুচারু ভাবে পরিবেশন করছে তাদের উপস্থাপনা। শুধু কলকাতা নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েও জেলের আবাসিকরা অনুষ্ঠান পরিবেশন করে, সেখানে তারা শিল্পীর সম্মান লাভ করে। এটাই তাদের কাছে সরস্বতী্র প্রসাদ। অলকানন্দা রায় আরও বলেন, “আমার বন্ধুরা এগিয়ে এসে মহিলাদের কাছে গিয়ে বড়োদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে, এছাড়াও যেসব শিশুরা ছয় বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকে তাদের জন্য প্রথমে জেলের মধ্যেই একটা স্কুল তৈরি করি, যার নাম হার্ট প্রিন্ট। সেখানে তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য সৃজনশীল কাজ শেখানো হয়েছে। এরপরে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী শিশুদের জেলের বাইরে স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি, ফিউচার হোপ এবং হোপ ফাউন্ডেশন স্কুলে তারা পড়াশোনা করে, খেলাধুলা করে। পুলিশের সহায়তায় তাদের স্কুলে যাতায়াতের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।” তাঁর মতে সকলের একরকম সদর্থক চিন্তার মাধ্যমেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে জ্ঞানের মন্দির।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, অন্যান্য রাজ্যেও সংশোধনাগারের আবাসিকদের সারস্বত সাধনা অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে শাস্তির মেয়াদও। অন্ধকারের আড়ালেই গ্রহণ করছে উচ্চশিক্ষা, মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করছে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি।
জীবনের রাস্তায় যারা পথ হারিয়েছে, বিদ্যা তাদের আলো দেখিয়ে চিত্তশুদ্ধি করে ফেরাচ্ছে জীবনের পথে। সেখানে নেই কোনো জাত ধর্মের বিভেদ। শুধু ভালোবাসা আর বিশ্বাসের জোরে তারা প্রতিদিনই পুজো করছে শ্বেত পদ্মাসনা দেবীর, সৃষ্টির মাধ্যমে অঞ্জলি দিচ্ছে দেবী সরস্বতীর পাদমূলে। আর, সেই আন্তরিক পুজোই তাদের মনকে করছে শ্বেতশুভ্র-কলুষহীন।