
মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
“আমি কোন সময়েই একটা সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না- যে একটি ছেলে একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে, প্রথমে মিলতে পারছে না, তাই দুঃখ পাচ্ছে, পরে মিলে গেল বা একজন পটল তুলল- এমন বস্তাপচা সাজানো গল্প লিখে বা ছবি করে নির্বোধ দর্শকদের খুব হাসিয়ে বা কাঁদিয়ে ঐ গল্পের মধ্যে ইনভলভ করিয়ে দিলাম, দু-মিনিটেই তারা ছবির কথা ভুলে গেল, খুব খুশি হয়ে বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল- এর মধ্যে আমি নেই।
…যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বেরিয়ে এসে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলানোর কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টকে যদি আপনার মধ্যে চারিয়ে দিতে পারি, তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।”
মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
দেশভাগের সময় ঋত্বিক ঘটকের পরিবার কলকাতায় চলে আসে। কিন্তু মানসিকভাবে তিনি সেই পূর্ববঙ্গকেই নিজের শিকড় মনে করতেন। এই পারিবারিক উৎখাত তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে, আর এই অভিজ্ঞতাই তাঁর চলচ্চিত্র-ভাষায় পরিণত হয় কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুতে। দেশভাগকে তিনি দেখেছিলেন একটি জাতির চেতনার চিরস্থায়ী ভাঙন হিসেবে—শুধু ভৌগোলিক নয়, সাংস্কৃতিক, আত্মিক এবং রাজনৈতিকও।
ট্রিলজি হিসেবে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২) ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী কাজ। এই তিনটি চলচ্চিত্র দেশভাগ-পরবর্তী উদ্বাস্তু জীবনের বিভিন্ন দিককে তুলে ধরে। মেঘে ঢাকা তারা-য় দেখা যায় নীতাকে, যে উদ্বাস্তুর পরিবারে এককভাবে সংসারের ভার কাঁধে নেয়। দেশভাগ তার জন্য শুধু ভৌগোলিক বিভাজন নয়, এক বিস্মৃতিপথ, যেখানে পরিচয়, আত্মত্যাগ, ভালোবাসা—সবকিছু ঝরে পড়ে ধীরে ধীরে। নীতার ‘আমি বাঁচতে চাই!’ আর্তনাদ আসলে এক পুরো জাতির অস্তিত্ব সংকটের প্রতিধ্বনি।
কোমল গান্ধার-এ আশ্রয় নেয় বাম রাজনীতি ও নাটকের মাধ্যমে চেতনার পুনর্গঠন। এখানে দেশভাগের বেদনাকে ঘটনা হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক বিভাজনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নাট্যদলের দ্বন্দ্বের মধ্যেও সেই ছিন্নমূল বাস্তবতা অনুরণিত হয়।
ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় দেশভাগের অভিঘাত শুধু গল্পে নয়, প্রকাশ পায় চলচ্চিত্রভাষার ভেতরেও। তাঁর ছেঁড়া কাট, মোটা গ্রেইন, বিকৃত শব্দ, নাটকের ভাষায় সংলাপ, বেমানান সংগীত— সব কিছুই যেন সেই মানসিক বিভাজনের রূপক।
কোমল গান্ধার (১৯৬১)
সুবর্ণরেখা-য় উদ্বাস্তু জীবনের পরিণতি আরও মর্মান্তিক। এখানে আশ্রয় নেওয়া, খণ্ডিত আত্মপরিচয়, শ্রমজীবী শ্রেণির দারিদ্র্য এবং এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত একসঙ্গে জটিল হয়ে ওঠে। সিনেমার শেষে বিভ্রান্ত, বিপর্যস্ত নায়ক যখন সুবর্ণরেখা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, তখন সেই নদী যেন দেশভাগের এক সীমারেখা, যা জীবনের সঙ্গে মৃত্যু, স্মৃতির সঙ্গে বেদনার সীমানা তৈরি করে।
ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় দেশভাগ কখনও মুখ্য চরিত্র, কখনও অন্তঃসলিলা অস্তিত্ব। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “Partition is the root of all my works. I lost my country. I lost my roots. And that pain, that irreparable loss, became my cinematic idiom.”
ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় দেশভাগের অভিঘাত শুধু গল্পে নয়, প্রকাশ পায় চলচ্চিত্রভাষার ভেতরেও। তাঁর ছেঁড়া কাট, মোটা গ্রেইন, বিকৃত শব্দ, নাটকের ভাষায় সংলাপ, বেমানান সংগীত— সব কিছুই যেন সেই মানসিক বিভাজনের রূপক।
যুদ্ধ, দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা—এই বিপর্যস্ত বাস্তবতাকে ধারণ করতে ক্যামেরাও যেন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত, ভগ্ন, অস্থির। তাঁর হ্যান্ডহেল্ড শটগুলো সেই ‘অসমান ভারসাম্য’-এর দার্শনিক প্রতিফলন।
সুবর্ণরেখা (১৯৬২)
ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলে, তাঁর ক্যামেরার ব্যবহার একটি স্বতন্ত্র ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে। ভারতীয় তথা বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে ক্যামেরাকে তিনি শুধু একটি রেকর্ডিং যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং সেটিকে বানিয়েছেন এক ধরনের অভ্যন্তরীণ চেতনাপ্রবাহ, সময়-জাগতিক অভিঘাতের দ্যোতক এবং চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনের বাহক হিসেবে। ঋত্বিকের ক্যামেরা অনেক সময় বাইরের জগৎকে পর্যবেক্ষণ করে না, বরং অভ্যন্তরীন জগতের ভেতর ঢুকে পড়ে। মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) ছবিতে ক্যামেরা যে ভাবে নীতা চরিত্রের মানসিক ভাঙনকে অনুসরণ করে, তা নজিরবিহীন। কখনও চোয়ালবন্ধ ক্লোজ-আপ, কখনও হঠাৎ এক্সট্রিম ওয়াইড শট—এই কন্ট্রাস্ট তাঁর ক্যামেরার ভাষাকে এক বিশেষ মানসিকতা দেয়। নীতার আর্তনাদের সময় পিছন থেকে আসা ক্যামেরা মুভমেন্ট ও বিস্ফোরণ ধ্বনি, একসঙ্গে বাস্তব ও অলৌকিককে এক করেছিল। তাঁর শট কম্পোজিশন বারবার দর্শককে মনে করিয়ে দেয় যে এটি নিছক দৃশ্য নয়।
আবার যখন সুবর্ণরেখা বা কোমল গান্ধার বানাচ্ছেন, তখন তাঁর ক্যামেরা বারবার দুলে ওঠে, কাঁপে, যেন বাস্তবতা নিজের ভারেই স্থির থাকতে পারছে না। যুদ্ধ, দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা—এই বিপর্যস্ত বাস্তবতাকে ধারণ করতে ক্যামেরাও যেন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত, ভগ্ন, অস্থির। তাঁর হ্যান্ডহেল্ড শটগুলো সেই ‘অসমান ভারসাম্য’-এর দার্শনিক প্রতিফলন।
ঋত্বিক বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন বাংলা থিয়েটারের থেকে, বিশেষ করে গ্রুপ থিয়েটার ধারায়। তাঁর সিনেমার ক্যামেরা অনেক সময় মঞ্চনাটকের মতো করে চরিত্রের গতিপথ অনুসরণ করে। কোমল গান্ধার ছবিতে এই নাট্য-সচেতনতা বিশেষভাবে স্পষ্ট, যেখানে ক্যামেরা প্যান, ট্র্যাক ও জুমের জটিল বিন্যাসে নাট্যচেতনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। অনেক সময় একটি দৃশ্য যেন আরেকটি দৃশ্যপটের নাট্যাংশ হয়ে ওঠে।
তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)
একটি ছবিতে সংগীতের ভূমিকা ততখানি গুরুত্বপূর্ণ, যতখানি ক্যামেরার। সংগীত সিনেমার এক অপরিহার্য অঙ্গ। ঋত্বিকের সিনেমায় লোকগীতি ও বাউল গান বারবার ফিরে আসে। তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতে ব্রাহ্মণবেড়িয়ার লোকসংগীত, পালাগান এবং নদী-সংশ্লিষ্ট গানগুলোর মধ্যে দিয়ে একটি হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির শেষ শ্বাস ধরে রাখা হয়েছে। গানগুলো যেন চরিত্রদের মুখে নয়, মাটির ভেতর থেকে উঠে আসছে—একপ্রকার সাংস্কৃতিক আর্তনাদ। তাঁর ছবির গান সম্বন্ধে ঋত্বিক বলেন, “সুবর্ণরেখায় যে-অবাঙালি গানগুলি আমি ব্যবহার করেছি, তার মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে প্রাচীন ধ্রুপদ। এগুলি সাধারণত আজকাল আর ব্যবহৃত হয় না। কলাবতী রাগে গাওয়া ‘আজু কি আনন্দ’ গানটি অবনীন্দ্রনাথের ‘রাজকাহিনী’ থেকে নেওয়া। এগুলি সম্পর্কে আমার কিছু ব্যক্তিগত দুর্বলতা ছিল। তা-ই ব্যবহার করেছি। এ ছাড়া, রবীন্দ্র-সঙ্গীতেরও ব্যবহার এখানে আমি করেছি। সঙ্গীত সম্পর্কে আমার কতগুলি বিশেষ ঝোঁক আছে, এ ছবিতে সেই ঝোঁকগুলি প্রকাশ পেয়েছে।”
সুবর্ণরেখাতে রাগ কলাবতী ব্যবহার করা হচ্ছে, এটা একজনের ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার। ধরুন, বুনুয়েল-এর বিখ্যাত ‘Nazarene’ ছবিটা কঠিন রকমের বাস্তব। সমস্ত ছবির শেষ এক মিনিট ছাড়া কোথাও কোনো মিউজিক নেই। এবং সেই শেষ এক মিনিটও কেবল ড্রাম বিটিং। অসাধারণ এফেক্ট। শুধু সুবর্ণরেখায় কলাবতীর কথা কেন? পৃথিবীর বহু অসাধারণ ছবি, যেমন ফেলিনি-র ‘La Dolce Vita’-তে পেট্রিসিয়া নামক এক বিশেষ মেজাজের মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে। সার্থক হয়েছে কি না, সে তো বিচার করবেন দর্শক ও সমালোচক।
শিল্পী হিরণ মিত্রের ছবিতে কোমল গান্ধার
পাগল শুধু হেঁটে বেড়ায়, চরকির মতো ঘোরে। তার বাড়ি নেই। গাড়ি নেই। ভবারও ছিল না। সে-ও তার সব ছবিতেই একটা দিশি ঘরোয়া লং মার্চ বা ‘লা স্ত্রাদা’ ছড়িয়ে রেখেছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে তার আর থামা নেই। এমনকী রামকিঙ্করকেও সে ধানক্ষেতে হাঁটিয়েছে দর্শককে রং চেনাবার জন্য। হাঁটতে-হাঁটতেই স্বপ্ন দেখা আরেক বাড়ির। সঙ্গী সে এক শিশু। ভেতরে এবং বাইরে। মূলত সে নিজেকে উৎসর্গ করে এক ক্রমান্বিত উত্তরণের পথে, যে-পথে তার দেখা হয় আরও অনেক স্বাধিকার প্রমত্তের সঙ্গে, মানব-সংসারের নিয়ত পরিবর্তমান প্রবাহটির সঙ্গে। স্বভাবতই তার দুই প্রকৃতি।
ভারতীয় চিত্রকথকদের মধ্যে ঋত্বিক ঘটক এখনও একমাত্র যিনি সর্বতো ভাবে এই দেশজ শিকড়-লালিত রাগানুরাগী কথকতার ঐকতানমূলক রীতি-প্রকরণগুলি ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন আন্তর্জাতিক মুক্তনৈতিক উপলব্ধি থেকে। এই অনাবিল চিন্তাশীলতাই ঋত্বিকের শ্রেষ্ঠত্বের নিকষপাথর।
নবারুণ ভট্টাচার্য একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমি এক সময় যুক্তি তক্কো গপ্পো নিয়ে ঋত্বিকের সঙ্গে একটা ঝগড়া করেছিলাম, আমি সেদিন বুঝতে পারিনি যে আমি একজন বুদ্ধের সাথে কথা বলছি। আমি সকাল দিবস রাত একজন বুদ্ধকে দেখেছি।”

