নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ, উদ্যোগে SHER
কবি ভারভারা রাও লিখেছিলেন, ‘পারলে তুমি বণিক ডেকে গোধূলিও দাও বেচে/ গোদাবরীও শুকিয়ে যাবে, থাকবে না কেউ বেঁচে’ (অনুবাদ: গৌতম ঘোষ দস্তিদার)। প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মানুষ ও সভ্যতার বন্ধুত্ব সৃষ্টির আদি-অনন্তকাল থেকেই গড়ে উঠেছিল। পরিবেশ থেকেই মানুষ যাবতীয় বাঁচার রসদ পেয়ে এসেছে এবং আজও পেয়ে চলেছে। কিন্তু বিনিময়ে ফিরিয়ে দিয়েছে দূষণ। যার জেরে বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। প্রতিনিয়ত সংকট বাড়ছে। রীতিমতো খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে জীবজগৎ। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অভিনব কর্মশালা (ওয়ার্ক শপ) আয়োজিত হল কলকাতার বুকে। জলবায়ু সংকট রুখতে পারে আগামী প্রজন্ম, তাঁদের মধ্যে সেই সংকল্পের বীজ বপন করা হল ‘নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে। শুরু হল ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বাসেডর’ কর্মসূচি। জলবায়ু পরিবর্তন ও তার জেরে সৃষ্টি হওয়া সংকট পরিস্থিতি নিয়ে এবার পড়ুয়ারাই বার্তা পৌঁছে দেবেন, গড়ে উঠবে সচেতনতা।

৩০ মার্চ হয়ে গেল এই অভিনব কর্মশালা। শের (SHER), দিল্লির টেরি স্কুল অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এবং স্কটিশ চার্চ কলেজের যৌথ উদ্যোগে দিনভর চলল আলোচনা। ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কটিশ চার্চ কলেজের স্মার্ট ক্লাস রুমে আয়োজিত এই কর্মশালায় সব মিলিয়ে ২৮টি স্কুলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও সচেতনতা সম্পর্কে নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে সম্যক ও বাস্তব ধারণা দেওয়ার লক্ষ্যে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল।
কেবল একদিনের ওয়ার্কশপেই থেমে থাকবে না জয়দীপ কুণ্ডুদের এ উদ্যোগ। পরবর্তী ধাপ হিসাবে তাঁরা আয়োজন করেছেন ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’। পড়ুয়ারা বার্তাবাহকের কাজ করবেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বেগ নিয়ে গড়ে তুলবেন সচেতনতা।
‘নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক কর্মশালার অন্যতম আয়োজক, শের-এর সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “আমরা মূলত তিনটে সংগঠন মিলে এটা আয়োজন করেছি। শের, টেরি স্কুল অফ অ্যাডভান্স স্টাডিজ (নিউ দিল্লি), স্কটিশ চার্চ কলেজ; তিনটে ‘বডি’ মিলে আয়োজন করা হয়েছিল। সোমবার সারাদিন চলেছে আলোচনা। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ‘নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষকের মতো ওয়ার্ক শপ স্কুল পড়ুয়াদের জন্য এই প্রথম আয়োজিত হল। ২৮টি স্কুল অংশগ্রহণ করেছিল। প্রতিটি স্কুল থেকে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে একজন পড়ুয়া এবং একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা এসেছিলেন। সব মিলিয়ে পাঁচটি সেশন (আলোচনা পর্ব) আয়োজিত হয়। বিশেষজ্ঞেরা আলোচনা করেন।”

কেবল একদিনের ওয়ার্কশপেই থেমে থাকবে না জয়দীপ কুণ্ডুদের এ উদ্যোগ। পরবর্তী ধাপ হিসাবে তাঁরা আয়োজন করেছেন ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’। পড়ুয়ারা বার্তাবাহকের কাজ করবেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বেগ নিয়ে গড়ে তুলবেন সচেতনতা। এ কাজে যারা সেরা হবেন, তাদের জন্য থাকবে পুরস্কারও। এই উদ্যোগ সম্পর্কে জয়দীপ জানাচ্ছেন, “নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ শীর্ষক কর্মশালায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও পড়ুয়ারা, যা শুনে গেলেন বা বুঝে গেলেন তা নিয়ে এক মাসের মধ্যে নিজেদের স্কুলে কোনও উদ্যোগ নিতে হবে বা কর্মসূচি করতে হবে তাদের। যাতে তারা স্কুলের বাকি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নিজেদের বুঝে যাওয়াটাকে প্রতিফলিত করতে পারে। এর একটা রিপোর্ট এক মাস পর আমাদের কাছে পেশ করবেন ওনারা। এই রিপোর্টের নিরিখে সেরা তিনটি উদ্যোগকে আমরা আলাদা করে স্বীকৃতি দেব। এটাকে ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’ বলছি। জলবায়ু পরিবর্তন একটা সাঙ্ঘাতিক জিনিস, চারিদিক থেকে আমাদের ঘিরে ধরেছে। যে ভাবে তা বাড়ছে, সেই সমস্যা সমাধানের জন্যেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এমন আয়োজন করা হচ্ছে। এটা আমরা ধাপে ধাপে আয়োজন করবো, এরপর কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আয়োজন করবো। সমাজের অন্যান্য নানা স্তরের মানুষদের নিয়েও আমরা আয়োজন করবো আগামীতে। আস্তে আস্তে বাড়ানোর ইচ্ছে আছে।”
তাঁর সংযোজন, “আমাদের বক্তব্য, আমরা যেটা বলতে চাইছি, বা যেটা বলা দরকার, সেটাকে এরা কতটা আত্মস্থ করতে পারলো এবং স্কুলে গিয়ে কতটা জানাতে পারলো বন্ধুদের… এটাই ‘ক্লাইমেট অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’। এটাই উদ্দেশ্য। একটা ওয়ার্ক শপ আয়োজন করেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে না। আমরা লক্ষ্যে পৌঁছনোর যাত্রা শুরু করে দিলাম।”
সাংবাদিক জয়ন্ত বসু আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংক্রান্ত কূটনৈতিক নীতি নিয়ে আলোচনা করেন। আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিকে স্থানীয় প্রেক্ষিতে পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যাপক অমিতাভ রায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখান।

কর্মশালার উদ্বোধন পর্বে উপস্থিত ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ, অধ্যাপক মধুমঞ্জরী মণ্ডল, টেরি-র বিভাগীয় প্রধান রঞ্জনা রায়চৌধুরী এবং শের-র (SHER) সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু। প্রথম অধিবেশনে অবসরপ্রাপ্ত আইএসএফ দেবল রায় পড়ুয়াদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরেন। পরবর্তী অধিবেশনে অধ্যাপক রঞ্জনা রায়চৌধুরী জলবায়ু-সচেতন নগরায়ণ বিষয়ে আলোচনা করেন।
সাংবাদিক জয়ন্ত বসু আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংক্রান্ত কূটনৈতিক নীতি নিয়ে আলোচনা করেন। আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিকে স্থানীয় প্রেক্ষিতে পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যাপক অমিতাভ রায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখান। ছাত্রছাত্রীদের হাতে-কলমে তিনি দেখান, কীভাবে আরটি-পিসিআর (RT-PCR), স্পেক্ট্রোফোটোমিটার এবং হাই-পারফরম্যান্স লিক্যুইড ক্রোমাটোগ্রাফির (HPLC) মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী দূষকদের বিশ্লেষণ ও গবেষণা করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং কীভাবে জলবায়ু বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনা করেন টেরি-র সহকারী গবেষক রাতুল ঘোষ। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অমিতা প্রসাদ। অংশগ্রহণকারীদের শংসাপত্রও বিতরণ করা হয়। ওয়ার্কশপ সম্পর্কে জয়দীপ বলেন, “প্রতিটা সেশন খুবই ইন্টারঅ্যাক্টিভ হয়েছে। ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষকেরা, সকলেই প্রচুর প্রশ্ন করেছেন। ছাত্রছাত্রীরা খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছে। এখন তো খুব একটা ডিপ লার্নিং হয় না! এতক্ষণের ওয়ার্ক শপ! ওরা (অংশগ্রহণকারীরা) মজা করে আলোচনা শুনেছে।”

এমন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণের কারণ সম্পর্কে তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “প্রত্যেক দিনের জীবনযাত্রার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন জড়িয়ে গিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর অভিঘাতের কথা খুব সহজ, সরল ভাষায় মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে না-পারলে, বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্মকে না-জানাতে পারলে বিপদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর আমরা যত জোর দেব, তত আমাদের কাজটা সহজ হবে। সমাজের পক্ষে সুবিধা হবে। দিন দিন কার্বন ফুট প্রিন্ট বাড়ছে। আমাদের বিনোদনের জন্য পরিবেশ, প্রকৃতির ক্ষতি হচ্ছে। প্লাস্টিকের ক্ষয় নেই। হাজার হাজার বছর প্লাস্টিক টিকে থাকে। সারা পৃথিবী জুড়ে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে, মানুষের চাহিদা মেটাতেই তা হচ্ছে। জনবিস্ফোরণের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাহিদা তৈরি হচ্ছে। সব কিছুর উৎস পরিবেশ। সেই পরিবেশই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের কাছে শুধু মানুষ, মানুষ আর মানুষ, মানুষের অগ্রাধিকার এমন জায়গায় চলে গেছে, মানুষ আর অন্য কিছুর কথা চিন্তা করছে না। বাকি সব কিছুর সঙ্গে আপোস করা হচ্ছে। গাছে আলো লাগানো হচ্ছে, তাতে গাছ থাকা জীবেদের জীবনচক্র বদলে যাচ্ছে। এসব আদতে জীববৈচিত্র, পরিবেশ বা জলবায়ুর উপর বোঝা, অভিশাপ। আমাদের মনে হয়েছে, আগামী প্রজন্মের কাছে এখন থেকেই এই জিনিসগুলোকে তুলে ধরা উচিত। পারলে ওরাই পারবে। বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়েই একটা সচেতনতামূলক ওয়ার্ক শপ আমরা আয়োজন করলাম।”
পরিবেশন দূষণ ও জলবায়ু বদল, দুটোর একটিকেও শূন্য নামিয়ে আনা বা জলবায়ুকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে দূষণে লাগাম টানা যেতে পারে, যে দ্রুত গতিতে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এনে সেই গতিকে মন্থর করা যেতে পারে। এই কাজ করতে দরকার সচেতনা, যা ছড়িয়ে দিতে পারে একমাত্র আগামী প্রজন্ম। তাঁদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লেই দৃষ্টিভঙ্গির বদল সম্ভব। সচেতনতা বাড়ানোর পদক্ষেপের সোপান হয়ে রইলো ‘নোয়িং ক্লাইমেট চেঞ্জ’-র মতো উদ্যোগ।
