আদিম অরণ্য বনাম আধুনিক কংক্রিট : অস্তিত্বের লড়াই

২১ মার্চ, বিশ্ব অরণ্য দিবস

বাঙালিকে অরণ্য চিনিয়েছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। পড়ন্ত যৌবন আর অরণ্যকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। বাঙালিকে অরণ্যের নগ্ন নির্জনতা দেওয়া বাংলা সাহিত্য পড়ে অরণ্যে দৌড়েছিলেন কত কেউ। সেই অরণ্যের আদিম উন্মাদনা, যেখানে বিকেল হলেই নেমে আসে হু হু করে ওঠা অন্ধকার। জোনাকি জ্বলে ঐ দূরে। ঝিঁঝিঁর আওয়াজ শোনা যায়। সন্ধে হলেই ঘরে ফেরে পাখির দল। ভেসে আসে অজানা জীবজন্তর গর্জন। সেই অরণ্য মন খারাপের দোসর হয়েছে। অরণ্যের মধ্যে অদ্ভুত গভীরতা আছে, যে গভীরতা মনের ভিতরে জানলাগুলো নিমেষে খুলে দিতে পারে। জীবনের সব জটিল হিসেবের মুহূর্তে সমাধান করে দিতে পারে। অরণ্য সব পারে। প্রথম রোদের মতো অরণ্যের এক মায়া আছে। তার নিজস্ব এক ভাষা আছে। শোনা যায়, একবার বুদ্ধদেব গুহ বাংলার এক সমানধন্য সাহিত্যিককে জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে তিরস্কার করেছিলেন, কারণ তিনি নাকি জঙ্গলে গিয়ে চিৎকার করছিলেন। গুহ মশাই তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন, জঙ্গলে এলে নিশ্চুপ হতে। সেই উপদেশ মাঝেমধ্যেই মনের ভিতরে ঝড় তোলে, এই কংক্রিটের জঙ্গলে মনে হয় শব্দহীন হয়ে যায়। এই কংক্রিট ভরা শহরে, অরণ্যের খোঁজে কেটে যায় কত বিকেল।

১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবী প্রায় ১৭৮ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ৩১% বনভূমি হলেও এই হার ক্রমশ কমছে। বনভূমি হারানোর প্রধান কারণগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কৃষি সম্প্রসারণ।

আমরা ক্রমশ মুখ ফেরাচ্ছি অরণ্য থেকে। ঘরের এক কোণায় সাজিয়ে তুলছি কৃত্রিম অরণ্য, ওইটুকুতেই আমরা খুঁজে ফিরছি সুখের হদিশ। ২১ মার্চ বিশ্ব অরণ্য দিবস হিসেবে পরিচিত। যে অরণ্যে এককালে জীবনের দোসর ছিল সেই অরণ্যই আজ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO-র Global Forest Resources Assessment, 2020)-র গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবী প্রায় ১৭৮ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ৩১% বনভূমি হলেও এই হার ক্রমশ কমছে। বনভূমি হারানোর প্রধান কারণগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কৃষি সম্প্রসারণ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে বন কেটে চাষের জমি তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া শিল্পের প্রয়োজনে কাঠ সংগ্রহ, খনি প্রকল্প, রাস্তা ও নগরায়নের বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দাবানলও বন ধ্বংসের বড়ো কারণ হয়ে উঠেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

Global Forest Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত প্রায় ৩.৪৮ লক্ষ হেক্টর প্রাথমিক বনভূমি হারিয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ১৮,২০০ হেক্টর প্রাচীন বনভূমি নষ্ট হয়েছে। যদিও Forest Survey of India-র রিপোর্ট বলছে, সামগ্রিক বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের পরিমাণ কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধি মূলত নতুন করে লাগানো গাছের ফলে, প্রাকৃতিক অরণ্যের বিকল্প হিসেবে তা সম্পূর্ণ কার্যকর নয়। কারণ একটি প্রাচীন অরণ্য যে জীববৈচিত্র্য ধারণ করে, নতুন বন তা করতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। Global Forest Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ প্রায় ৮,৭০০ হেক্টর গাছের আচ্ছাদন হারিয়েছে। ২০২০ সালে রাজ্যের মোট প্রায় ৬.২ লক্ষ হেক্টর প্রাকৃতিক বন ছিল, যা রাজ্যের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ৭ %। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অত্যাধিক জনবসতির ফলে বনভূমি ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

United Nations-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ শহরে বাস করে, ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অরণ্যের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে না। একইসঙ্গে প্রযুক্তির বিস্তার মানুষকে ভার্চুয়াল জগতে আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে। যে শিশু একসময় গাছ, পাখি এবং জঙ্গলের সঙ্গে বড়ো হত, সে এখন মোবাইলের পর্দায় প্রকৃতিকে দেখে, ফলে প্রকৃতির সঙ্গে তার মানসিক বন্ধন তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে আধুনিক অর্থনীতি অরণ্যকে জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে। বন এখন কাঠ, জমি বা শিল্পের কাঁচামালের উৎস ফলে অরণ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আর সহাবস্থানের নয়, বরং ব্যবহার এবং ভোগের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের মানসিক পরিবর্তনও। অরণ্যের ধীর, নীরব এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বদলে আধুনিক মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে দ্রুত, নিয়ন্ত্রিত এবং কৃত্রিম পরিবেশে। ফলে অরণ্য তার কাছে আর পরিচিত আশ্রয় নয়, বরং অপরিচিত এবং অপ্রয়োজনীয় এক পরিসর। ভারতের আদিবাসী সমাজের সঙ্গে অরণ্যের সম্পর্ক শুধু নির্ভরতার নয়, অস্তিত্বের। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০.৪ কোটি আদিবাসী মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৬ % প্রত্যক্ষভাবে বনভূমির উপর নির্ভরশীল।

Forest Survey of India-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতের প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি মানুষ জীবিকা, খাদ্য, জ্বালানি কাঠ ও ভেষজ ওষুধের জন্য অরণ্যের উপর নির্ভর করে, যার বড়ো অংশই আদিবাসী সম্প্রদায়। সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁওদের মতো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, উৎসব এবং সামাজিক জীবন অরণ্যকেন্দ্রিক। এই গভীর সম্পর্কের স্বীকৃতি দিয়েই ২০০৬ সালের Forest Rights Act আদিবাসীদের বনভূমির উপর ঐতিহ্যগত অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়। তাই অরণ্য ধ্বংস হওয়া তাদের কাছে শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং হাজার বছরের জীবনদর্শনের অস্তিত্বসংকট। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও আদিবাসী জীবন ও অরণ্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও বাস্তব। রাজ্যের ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার জঙ্গলমহল অঞ্চলে বসবাসকারী সাঁওতাল, মুন্ডা, শবর ও লোধা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবিকা আজও অনেকাংশে অরণ্যনির্ভর। Forest Survey of India–এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৭ লক্ষের বেশি আদিবাসী পরিবার বনজ সম্পদ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত, যেমন শালপাতা, মহুয়া, কেন্দু পাতা ও জ্বালানি কাঠ, যা তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁওদের মতো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, উৎসব এবং সামাজিক জীবন অরণ্যকেন্দ্রিক। এই গভীর সম্পর্কের স্বীকৃতি দিয়েই ২০০৬ সালের Forest Rights Act আদিবাসীদের বনভূমির উপর ঐতিহ্যগত অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানও আজ স্বীকার করছে, অরণ্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। জাপানে শিনরিন-ইয়োকু বা ফরেস্ট বাথিং নামে পরিচিত এই ধারণা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা হয়েছে, যেখানে দেখা গিয়েছে অরণ্যের মধ্যে কিছু সময় কাটালে মানুষের স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার প্রবণতা হ্রাস পায়। World Health Organization–ও জানিয়েছে, প্রকৃতির সংস্পর্শ মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় এবং নগর জীবনের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। অরণ্যের নীরবতা, সবুজের বিস্তার এবং প্রাকৃতিক শব্দ মানুষের মস্তিষ্ককে এক ধরনের ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়, যা তাকে নিজের ভিতরের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে। তাই অরণ্য শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, মানুষের মানসিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এক অনিবার্য আশ্রয়।

অরণ্য ধ্বংসের এই প্রবণতাকে পুরোপুরি থামানো হয়তো বাস্তবসম্মত নয়, কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাপ ক্রমশ বাড়ছে এবং বাড়বে। তবে এই ধ্বংসের গতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যদি অরণ্যকে শুধু সম্পদ নয়, অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে দেখা যায়। অরণ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, কারণ নতুন করে গাছ লাগিয়ে সেই জটিল জীববৈচিত্র্য কখনও পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায় না। এই বিষয়টি Forest Survey of India–এর বিভিন্ন রিপোর্টেও উঠে এসেছে। যে আদিবাসী সম্প্রদায় হাজার বছর ধরে অরণ্যের সঙ্গে সহাবস্থান করে এসেছে, তাদের হাতে বনরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে তুলে দেওয়া জরুরি, কারণ তাদের জীবনদর্শনই অরণ্য সংরক্ষণের উপর ভিত্তি করে। পাশাপাশি শহুরে মানুষের মধ্যেও অরণ্যের প্রতি মানসিক সংযোগ পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, কারণ মানুষ যতদিন অরণ্যের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক অনুভব করবে না, ততদিন তাকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও গভীরভাবে উপলব্ধি করবে না। তাই অরণ্যকে বাঁচানোর লড়াই শুধু পরিবেশ রক্ষার লড়াই নয়, এটি মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ, মানসিক সুস্থতা এবং সভ্যতার ভারসাম্য রক্ষার লড়াই।

_____________ 
মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia