কলকাতা বইমেলার চিলড্রেনস প্যাভেলিয়নে ইংরেজি ভাষার ‘দাপট’

অন্যদিকে, শিশু-বইমেলা আয়োজন করার কথা ভাবছে গিল্ড

নকনে শীতে এবারের বইমেলায় ভিড় মন্দ হয়নি। বই বিকোচ্ছে দেদার কিন্তু নবীন প্রজন্ম, একেবারে খুদেরা কি বই কিনছে? কী ধরনের বই হাতে তুলে নিচ্ছে তারা? তার সুলুক সন্ধান করতে পৌঁছে গিয়েছিলাম ৪৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার চিলড্রেনস প্যাভেলিয়নে। এ বছর চিলড্রেনস প্যাভেলিয়ন (children’s pavilion) সেজে উঠেছে প্রয়াত সাহিত্যিক ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি পাণ্ডব গোয়েন্দার মাধ্যমে। কিন্তু, দেখা গেল শিশুদের বই বাছাইয়ে ইংরেজি ভাষার দাপট বেশি। আপাত দৃষ্টিতে গোটা প্যাভেলিয়ন ঘুরে যা চোখে পড়ল, তাতে দেখলাম সত্তর ভাগ-ই ইংরেজি ভাষার বইয়ের চাহিদা। বাংলা সেখানে বেশ প্রান্তিক। খুদে ক্রেতারা চাইছে ইংরেজি ভাষার বই। অভিভাবকরাও বাড়ির ছোটো সদস্যদের জন্য ইংরেজি বই কিনতেই বেশি পছন্দ করছেন।

ঠাকুমার ঝুলির বদলে ইংরেজি ‘হরর’ প্রিয় হয়ে উঠছে বাংলার খুদে-কিশোররা, গুপী গাইন বাঘা বাইন পড়ছে ইংরেজি ভাষায়। নতুন পাঠকদের কাছে বাংলা সাহিত্য না পৌঁছলে; তা ভাষার জন্য অত্যন্ত ভয়ানক দিন ডেকে আনতে পারে।

প্যাভেলিয়নে ঢুকেই দেখা হল ক্লাস ফোরের পড়ুয়া শ্রী খাঁ-র সঙ্গে। বাড়ি বেলঘরিয়ায়, মায়ের সঙ্গে বইমেলায় এসেছে। পড়ে   ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলে। বললো, ‘হরর বই খুঁজছি। হরর বই পড়তে ভালো লাগে।’ জিজ্ঞাসা করলাম বাংলা পড়ো না? মায়ের উত্তর এল ‘পড়ে অল্প’। শ্রী; টিনটিন, নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদার নাম অবধি শোনেনি। 

পাশেই বই দেখছিলেন আরেক ভদ্রলোক, নাম স্বরূপ দাস। তিনি ভাগ্নের জন্য বই নিয়ে যাচ্ছেন। ভাগ্নে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। তিনি জানালেন, “আমার ভাগ্নে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনী পড়তে ভালোবাসে। ওর জন্য নেতাজির জীবনী বিষয়ক একটি বই নিয়ে যাচ্ছি। আরও দেখছি। ও গল্পের চেয়েও বিপ্লবীদের জীবনকে জানতে ভালোবাসে।” 

বাবা-মাকে নিয়ে বইমেলায় এসেছে রাই মুখার্জী। কলকাতার একটি নামি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ক্লাস সিক্সের ছাত্রী, সে কমিক্স পড়তে ভালোবাসে। তবে হ্যাঁ, ইংরেজি কমিক। দেখলাম ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বই কিনেছে, আরও কিছু কিনবে বলে খুঁজছে। 

কথা হলো, চিলড্রেনস প্যাভেলিয়নের ইন-চার্জ রবীণ বসু রায়ের সঙ্গে। বই বিক্রি নিয়ে তিনি জানালেন, হরর আর কমিক, এই দুই ধরনের বইয়ের বিক্রি এবার বেশি। পাণ্ডব গোয়েন্দার বইও ভালো বিক্রি হচ্ছে কিন্তু অনেকেই ইংরেজিতে চাইছেন।  কী রকম বয়সী বাচ্চাদের ভিড় বেশি প্যাভেলিয়নে? সে প্রশ্নের উত্তরে রবীণবাবু বললেন, “একেবারে ছোটরাও আসে বাবা-মায়ের হাত ধরে। তবে ফাইভ, সিক্স, সেভেন-র বাচ্চাদের ভিড় বেশি।” বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “মেলা এবার এগিয়ে এসেছে। শেষে গিয়ে বলতে পারব এতে ভালো হয়েছে না খারাপ। বিক্রি ঠিকই আছে। প্রতিবারের মতোই হচ্ছে এখনও পর্যন্ত।”

কাউন্টারে বিল মেটাচ্ছিলেন অভিষেক চ্যাটার্জী। জানতে চাইলাম, কী কী বই কিনলেন? আর কার জন্য কিনলেন? অভিষেক বললেন, “ছেলে ওয়ানে পড়ে, ওর জন্য কিনলাম দুটো বই, দেবী চৌধুরানী আর গুপী গাইন। তবে এখন নয়, আরও দেড়-দু’বছর পর হাতে পাবে। তবে ও বাংলা পড়তে পারে না। আমরাই পড়ে শোনাবো। কিংবা ইংরেজি ট্রান্সলেশন কিনবো।”  অভিষেক নিজের জন্যও একটি বই কিনেছেন চিলড্রেনস প্যাভিলিয়ন থেকে। দেখালেন বইটি। নাম চাইল্ড কাউন্সিলিং। বললেন, “দিন বদলে গেছে। নিজের জন্য কিনলাম। পড়বো।”

যা দেখা যাচ্ছে, এখন আর বাচ্চারা বই কেনে না। বাবা-মা যা কিনে দেবেন বা পড়তে বাধ্য করবেন, তাই পড়বে সন্তানরা। প্যাভেলিয়নের বাইরেই দেখা হল স্মিতা সরকারের জন্য। তিনি তাঁর এলকেজি পড়ুয়া ছেলের জন্য গোটা স্টল খুঁজেও যুৎসই বই পাননি। তাঁর বক্তব্য, ‘একটু বড়ো অক্ষরে ছাপা হলে কিনতাম’। শুনলাম, ছেলেটি পড়ার বইয়ের বাইরে এই প্রথম অন্য কোনও বই পড়বে। বাচ্চাটি পাণ্ডব গোয়েন্দার ছবির দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল বটে, কিন্তু সে আবেদন মঞ্জুর হল না। 

কলকাতা বইমেলা মানে মাতৃভাষার উদযাপন। বাংলা ভাষার বইয়ের আয়ু টিকিয়ে রাখতে পারে একমাত্র পাঠকরা। তার জন্য প্রয়োজন নতুন পাঠক তৈরি করা। খুদেরা যদি বই হাতে তুলে নেয়, তবেই বাঁচবে বই বাণিজ্য। সেই কারণে, একেবারে ছোটোবেলা থেকে পাঠাভ্যাস গড়ে দেওয়া দরকার। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে। বইমেলার প্রথম রবিবার শিশু দিবস পালন করা হয়। এবারেও পালিত হয়েছে, শিশুদের পাণ্ডব গোয়েন্দার প্রথম অভিযান বইটি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বছরের অন্য কোনও সময় আলাদা করে শিশু বইমেলা আয়োজন করার। আজকের খুদেরা বই কম পড়ে, তবে বই বিমুখ নয় তারা। তবে অধিকাংশই ইংরেজি বই হাতে তুলে নিচ্ছে। বাবা-মায়েরাও তাঁদের সন্তানদের জন্য ইংরেজি ভাষার বইকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ঠাকুমার ঝুলির বদলে ইংরেজি ‘হরর’ প্রিয় হয়ে উঠছে বাংলার খুদে-কিশোররা, গুপী গাইন বাঘা বাইন পড়ছে ইংরেজি ভাষায়। চিলড্রেনস প্যাভেলিয়নে গিয়ে সে অভিজ্ঞতাই হল। নতুন পাঠকদের কাছে বাংলা সাহিত্য না পৌঁছলে; তা ভাষার জন্য অত্যন্ত ভয়ানক দিন ডেকে আনতে পারে।

ছবি: হিমাংশু দাস

Developed by DXDasia