
সমকালীন বাঙালি বিজ্ঞানীদের সফল তালিকায় বাংলা মিডিয়ামের ভিড়
বিক্রমপুরের জগদীশচন্দ্র বোস, যশোরের প্রফুল্লচন্দ্র রায়, গাজিপুরের মেঘনাদ সাহা, হুগলির উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী-রা কলকাতামুখী হয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষার সাধনা। গ্রামকেন্দ্রিক সে বাংলার বড়োবাজার ও রাজধানী কলকাতাই ছিল। আজও তাই। অবশ্য এই তালিকায় উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকা উচিত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর। তিনি খাঁটি কলকাতার লোক।
ইসরোর চন্দ্রযান (ISRO Chandrayan) প্রকল্পে বাঙালি বিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য নানান আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। নয়ের দশক বা তার পরে স্কুলজীবন শেষ করা দূরদূরান্তের বাঙালি মেধার এই মহাকাশ জয়ে আপ্লুত বাংলাভাষী। শুধু তাই নয়, মূখ্যত এঁরা প্রায় সকলেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, মানে বাংলা মিডিয়াম। কেউ উচ্চমাধ্যমিক, কেউ বা স্নাতকের পর শিয়ালদা বা হাওড়ামুখী হয়েছেন। হাতে কাচা জামা, মাথায় জবজবে তেল, কাদামাঠের হুটোপুটি, শ্মশান বা হাসপাতালে যাওয়া, সঙ্গে এর-ওর বাগানের ফলমূল চুরিরও স্মৃতি থাকতে পারে কারো! স্বাধীনতার আগে বাসে বা ট্রেনে এভাবেই কলকাতায় আসতেন অবিভক্ত বাংলার ‘জেলা’। আজও তাই হয়। অধিকাংশই উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনাকে আঁকড়ে জীবনে প্রথম পা রাখেন ট্রাম, ট্যাক্সির গিজগিজে শহরে।

বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং মেঘনাদ সাহা
তালিকায় অনেক নাম। হুগলির জয়ন্ত লাহা, ইসলামপুরের অনুজ নন্দী, মসলন্দপুরের নীলাদ্রি মৈত্র, পানিহাটির রাজীব সাহা, বীরভূমের মোসাররফ হোসেন, নরেন্দ্রপুরের মানস সরকার, বহরমপুরের তইকুল ওয়ারা। ৫০ জনেরও বেশি নামের তালিকায় আছেন কলকাতার বুলবুল মুখার্জী, মোমিতা দত্ত ও সৌরভ বসুরা। বাগবাজারের বুলবুল নিবেদিতা স্কুলের ছাত্রী, মৌমিতার শিক্ষা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অধীনস্থ হোলি চাইল্ড স্কুলে, অন্যজন ডন বস্কো, মানে ইংলিশ মিডিয়াম। না, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের মধ্যে লড়াইয়ের বিষয় নয় এই লেখা। বরং, মাতৃভাষায় বা চারপাশের মানুষের ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ কি তুলনায় উৎকৃষ্ট! সে বিষয়ে আলোকপাত করার ইঙ্গিত দিতে পারে এই চর্চা।
শুধু শহর কলকাতাই নয়। নতুন বাজাররীতিতে দূর জেলাশহর বা গঞ্জেও বাড়ছে ইংরেজি মাধ্যম। কোথাও কোথাও হিন্দি বাড়লেও কমছে বাংলায় পড়ার রীতি। মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করলে বিষয়ের গভীরে সহজে ঢোকা যায়। সারা বিশ্বে শিক্ষার ভাষা নিয়ে নানান আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যে – স্রেফ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার তালিকাই নয়, ইসরোর বাঙালি বিজ্ঞানীদের তালিকাও যেন বলছে ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ’। বাংলা মাধ্যমের মাধ্যমিক বা উচ্চ-মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় কলকাতা খুঁজে পেতে বহুকালই বড়ো সমস্যা হয়। আবার এটাও ঠিক, মেধা-পরিশ্রম-সংকল্প-অধ্যাবসায়ের কোনও ভৌগলিক সীমারেখা নেই।

চন্দ্রযান ৩-এর সঙ্গে জড়িত বাঙালি কৃতিদের একাংশ
একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়, গত ২০০ বছরে বাংলার আধুনিকতার যাত্রায় ওই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িটি ছাড়া সিংহভাগই মফস্বল বা গ্রামের শিকড়। কোথা থেকে এলেন বা কোথায় গেলেন শেষমেশ, তার আগে পরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কমবেশি দ্বিভাষিক। ইংরেজি জানেন ও বলেন। তাঁদের লেখা ইংরেজি পাঠ্য আজও চিন্তা ও শিক্ষার জগতে স্বীকৃত। এখন ইংরেজি বলিয়ে কইয়ে বেড়েছে। শিশুকে পথ চলতি মা হ্যালো, ডগ, ক্যাট, আন্টি… শেখাচ্ছেন। তাহলে ঠিক শিক্ষার ভাষা হিসেবে কতটা পিছিয়ে গেল বাংলা? নাকি জোর করেই বাতাবরণটা বানানো হচ্ছে? শোনা যায়, কলকাতার কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বাংলা ভাষাটা স্রেফ বাতিল হয়ে গেছে। সমস্যায় পড়ছেন গ্রাম-মফস্বলের পড়ুয়ারা। আরও আরও বৃহত্তর কলকাতা দূর গ্রামেও নিয়ে যাচ্ছে আধুনিক শিক্ষার প্যাকেজ! ভাষা ও নিজেকে প্রকাশের গণ্ডগোলে পিছিয়ে পড়ছেন কেউ কেউ। হারিয়ে যাচ্ছে অবৈতনিক স্কুল।
পিছনে হাঁটা হয়তো আর সম্ভব নয়। মোবাইলে, ডিজিটাল সাউন্ডে আর সবুজ প্রকৃতির বাইরে বড়ো হচ্ছে আজকের শৈশব-কৈশোর। সমকালীন বাঙালি বিজ্ঞানীদের সফল তালিকায় বাংলা মিডিয়ামের ভিড়। এক্কেবারে সংখ্যাগুরু। দিনাজপুরের দৌলত আলি, বীরভূমের বিজয় দাই, পাত্রসায়রের কৃশানু নন্দী, মানে একদা দূর মফস্বলের কৃতিত্বে জাতীয় পতাকা ওড়ানো ডিজিটাল- নাগরিক প্রাত্যহিক জীবনে রোজ কমিয়ে আনছেন মাতৃভাষার প্রয়োগ। শিক্ষার ভাষা মাতৃভাষা না থাকলে – বদলে যায় জীবনাদর্শ, বদলায় আপন সবকিছু। এক সময় ‘আপন ছিল বিস্তীর্ণ’। আর সেই অতীতের টানে নয়ের দশকের ছেলেমেয়েরা ইসরোর বিজ্ঞানী খুঁজছেন বন্ধুমহলে, ফেসবুকে। চেনা বের হচ্ছে। গ্রাম, মফস্বল, জেলা, কলকাতার পাড়া নিয়ে এমন গর্ব খুব দেখেছি বলে মনে হয় না! এরা কেউ সেলিব্রিটি নন, ক্রিকেটার বা অভিনেতা নন। নতুন এই একঝাঁক নামের সঙ্গে স্রেফ পৌঁছে যাওয়া যায় কবেকার ক্লাসরুমে! ছিল অবৈতনিক স্কুল, ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, মানে জনতার স্কুল। ট্যাক্সের টাকায় চলা সামাজিক সরকারি পরিকাঠামো।
শুধু শহর কলকাতাই নয়। নতুন বাজাররীতিতে দূর জেলাশহর বা গঞ্জেও বাড়ছে ইংরেজি মাধ্যম। কোথাও কোথাও হিন্দি বাড়লেও কমছে বাংলায় পড়ার রীতি। মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করলে বিষয়ের গভীরে সহজে ঢোকা যায়। সারা বিশ্বে শিক্ষার ভাষা নিয়ে নানান আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যে – স্রেফ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার তালিকাই নয়, ইসরোর বাঙালি বিজ্ঞানীদের তালিকাও যেন বলছে ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ’।
এই তো মাত্র তিনদশকের পার! নয়া অর্থনীতি বদলে দিল কত কিছু! বিশ্বায়নের ফ্ল্যাটবাড়ির আকারে আর খাদ্যতালিকা বা জীবনরীতিতে সবাই এখন বিশ্ববাসী। রোজ যখন সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়ার খবর আসে, স্কুলছুট বাড়তেই থাকে, তখন চন্দ্রজয়ী বাঙালি বিজ্ঞানীদের সাফল্য যেন হতাশার সঙ্গে বলছে, ‘আমাদের মাতৃভাষা বাংলা ছিল। শিক্ষাভাষা বাংলা ছিল। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ ছিল! আমাদের ১-এ চন্দ্র ছিল, চাঁদে ছিল সুতো কাটা বুড়ি, চাঁদমামা টিপ দিত, চাঁদপানা মুখ ছিল, নিশিরাতে ছিল বাঁকা চাঁদ, আনন্দে-বিরহে মনের কথা বলার সঙ্গী হতো আস্ত চাঁদখানা।’
