হামলা হতে পারে, জানত কেন্দ্রীয় সরকার
অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের সময় কোথাও জঙ্গিহানা হলেই কারা দায়ী তৎক্ষণাৎ তা প্রায় জ্যোতিষীর মতো বলে দিতেন তখনকার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি। একটা সময়ে তিনি বারবার বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদীরা সংসদে হামলা চালানোর ছক কষছে। কিন্তু সব জানা থাকা সত্ত্বেও সংসদে সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছিল। আদবানি তা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন।
এবারও একই ঘটনা ঘটল অমরনাথ যাত্রায়। হামলা হতে পারে, জানত কেন্দ্রীয় সরকার। সেই জুনের শেষেই এসেছিল গোয়েন্দাদের সতর্কবার্তা। সেজন্যই হয়তো রাজ্য পুলিশকে সরিয়ে যাত্রা শুরুর আগেই যাত্রাপথ ও যাত্রীদের নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কর্তারা। তাঁরাই নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাত্রাপথের নিরাপত্তায় ছিলেন প্রায় ৪২ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান। সোমবার যখন হামলা হল, তখনও অমরনাথে পৌঁছনো পুণ্যার্থীর সংখ্যা দেড় লাখ পেরোয়নি। এই সংখ্যা থেকেই সহজবোধ্য, কী বিপুল বাহিনী নামানো হয়েছে। যাত্রাপথের প্রতিটি ইঞ্চিতে নজর রাখার জন্য খোলা হয়েছিল কন্ট্রোল রুম। কিন্তু হামলা হল। সব জানা থাকা সত্ত্বেও আটকানো গেল না কিছু জঙ্গির অভিসন্ধি। কেন?
অনেক সময় এমন হয়, নিরাপত্তার ঘেরাটোপ গলে গোপনে কয়েকজন সশস্ত্র মানুষ পৌঁছে যায় অকুস্থলে। ছত্তিশগড়ের বস্তারের ঘন জঙ্গলে যেমন মাওবাদীদের আটকানো যায় না, ঠিক তেমনই কাশ্মীর উপত্যকার পাহাড়–জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গোপন অভিযানে চলা জঙ্গিদের আটকানোও খুব, খুব কঠিন। এসব আটকানোর পথ শুধু একটাই। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া খবর। কিন্তু তারও একটা সীমা থাকে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় কাশ্মীরের ৯৯ শতাংশ মানুষ জঙ্গিদের সমর্থন করেন না। তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েই সেখানকার সমস্যার সমাধান সম্ভব, যদিও সৎভাবে সেই চেষ্টা কোনও রাজনৈতিক দল আজ পর্যন্ত করেনি। কাজেই তাঁরা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে সরকারকে সব খবর পৌঁছে দেবেন, এতটা আশা করা যায় না।
তাহলে যে পথটা বাকি থাকে তা হল যাত্রীদের বাস বা গাড়িগুলিকে একসঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসা। ঠিক সেটাই করা হচ্ছিল। অথচ তার মধ্যে একটি বাস নিজের নথিভূক্তিকরণের নিয়ম ভেঙে দু দিন পরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার দিকে রওনা দিল। তার টায়ার বার্স্ট করল। চাকা সারিয়ে অন্ধকারের মধ্যে বাসটি চলল বিপজ্জনক রাস্তা গিয়ে, যেখানে সন্ধ্যা ছটার পর অমরনাথ যাত্রীদের কোনও বাসের যাতায়াত করার কথা নয়। তারা কোনও কনভয়ের অংশ ছিল না। ফলে তাদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কর্তারা বুঝে উঠতে পারছেন না কী করে এমন ঘটনা ঘটল। পুরো ঘটনার পিছনে কোনও চক্রান্ত আছে কিনা খতিয়ে দেখছেন তাঁরা। দেখতে তো হবেই।
অনেক প্রশ্ন আছে। রাজ্য পুলিসকে কাজে না–লাগানো ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। প্রায় সব আধাসামরিক জওয়ানকে যাত্রীদের নিরাপত্তার কাজে লাগিয়ে দিলে আশপাশের অঞ্চলে নজর রাখবে কে? পুলিসের ওপর সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়াটা একটা উপদ্রুত রাজ্যে কোনও কাজের কথা নয়। কারণ দিনের শেষে তাঁদের বাড়ি ফিরতে হয়। তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারকে খুন করা হবে বলে আই এস জঙ্গিরা হুমকি দিয়ে রেখেছে। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, বাসটা সকলের নজর এড়িয়ে বিপথগামী হল কী করে।
আর এই একটা বাস অনেক সমস্যা তৈরি করল। শুধু যে ৭ জনের প্রাণ গেল, তাই নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ওই ঘটনা প্রসঙ্গে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘কাশ্মীরবাসীকে ধন্যবাদ জানাই। হামলার নিন্দা করছেন সমগ্র কাশ্মীরবাসী। প্রমাণ হয়ে গেছে, কাশ্মীরবাসীর মধ্যে এখনও কাশ্মীরিয়ত বেঁচে আছে।’ তিনি বলেছেন, সমগ্র কাশ্মীরবাসীকে স্যালুট করছেন তিনি। তাতে ক্ষিপ্ত হয়েছেন উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ প্রশ্ন তুলেছেন কিসের কাশ্মীরিয়ত? ‘হিন্দু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মেরে তাড়ানোর কথা এত সহজে ভুলে গেছেন!’ কেউ বলেছেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামীকে দায়িত্ব দিতে। কেউ হিন্দুদের আত্মরক্ষার প্রশ্ন নিয়ে এসেছেন। জবাবে রাজনাথ তাঁদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, সব কাশ্মীরি সন্ত্রাসবাদী নয়।
ঠিক কথা, কিন্তু মৌলবাদীরা যে দুই দিকেই আছেন। তাঁদের সংযত করা সহজ কথা নয়। নিরাপত্তারক্ষীরা যদি আর একটু সতর্ক হতেন, যদি অমরনাথ যাত্রা নিরাপদে সম্পন্ন হোত, তাহলে এই অহেতুক বিতর্ক এড়ানো যেত। কেন এমন ঘটল, কেন এমন ঘটে, কে বলবে?