বেটার লাইফ : প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছেন ডাঃ সায়ন্তনী ভট্টাচার্য

০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ‘দ্য ল্যান্সেট’ ভারতের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় যথাযথ চিকিৎসার অভাবে প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। মৃতদের অধিকাংশই প্রান্তিক এলাকার বাসিন্দা। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে এ পরিসংখ্যান দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। আজও দেশের তৃণমূল স্তরে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। প্রান্তিক মানুষ রোগাক্রান্ত হলে নূন্যতম চিকিৎসা পেতে মাইলের পর মাইল পথ সফর করেন। চিকিৎসা না-পেয়ে পথেই অনেকের মৃত্যু হয়। এ সমস্যা সমাধানে এক অভিনব পন্থা নিয়েছেন চিকিৎসক ডাঃ সায়ন্তনী ভট্টাচার্য (Dr. Sayantani Bhattacharjee)। তৈরি করেছেন ‘বেটার লাইফ’ (Better Life)। সায়ন্তনী অভিজ্ঞ গাইনোকোলজিস্ট এবং একজন স্বাস্থ্য উদ্যোগপতি (হেলথকেয়ার অনথ্রোপ্রেনিওর)।

 

‘বেটার লাইফ’ গড়ে তোলার আগে গুয়াহাটির একটা নামকরা হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে কাজ করছিলেন সায়ন্তনী। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় চলে যান।

প্রত্যন্ত এলাকায় তিনি গড়ে তুলছেন চিকিৎসা কেন্দ্র। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তথাকথিত নীচের দিকে থাকা সাধারণ মানুষ সেখানে চিকিৎসা পাচ্ছেন। আমজনতার সাধ্যের মধ্যে, সামর্থ্যের মধ্যে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে তিনি বদ্ধ পরিকর। ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে তাঁর সফর শুরু হয়েছিল। অসম রাজ্যের গুয়াহাটি থেকে ১০২ কিলোমিটার দূরে ইন্দো-ভুটান সীমান্ত লাগোয়া উদালগুড়ি জেলায় প্রথম ‘বেটার লাইফ’ কেন্দ্র গড়ে তোলেন সায়ন্তনী। উদালগুড়ি চা বাগান অধ্যুষিত এলাকা।

বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘বেটার লাইফ’ গড়ে তোলার কাহিনি জানালেন সায়ন্তনী। তাঁর কথায়, “উদালগুড়ি অঞ্চলে একটি চা কোম্পানির সঙ্গে এক সময় যুক্ত ছিলাম। তাই অসম যাওয়া। কাজ করতে গিয়ে দেখি, এলাকাগুলি অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া। স্বাস্থ্য পরিষেবা নেই-ই প্রায়। চা বাগানের মধ্যে হাসপাতাল থাকে, কিন্তু তাতে সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। সরকারও এতো প্রত্যন্ত জায়গায় কিছু করে উঠতে পারে না। স্বাস্থ্য পরিষেবার এহেন অবস্থা, আমার প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল, তাই ‘বেটার লাইফ’ শুরু করা। করোনার সময় মানুষ মারা যাচ্ছিলেন। কারণ মানুষের কোনও উপায় ছিল না। গুয়াহাটি পৌঁছতে পারলে তবে চিকিৎসা। অসমের প্রত্যন্ত এলাকায় পরিবহণ ব্যবস্থা ভালো নয়। কোভিডের সময় পরিবহণ ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়েছিল। মানুষ মারা যাচ্ছিলেন, তখন একটা ঘটনা ঘটে। ২১ বছরের একটি মেয়ে, তাঁর সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। একটা প্রয়োজনীয় ইঞ্জেকশনের অভাবে সে মারা গেল। ওই ইঞ্জেকশন হয়তো সব সরকারি হাসপাতালেই থাকে, কিন্তু এখানে ছিল না। আমরা একুশ শতকে আছি, ইন্টারনেট, এআই-এর মধ্যে আছি, আর সেখানে এখনও একটি মেয়ে বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাচ্ছে। এই ঘটনাই আমার ‘বেটার লাইফ’ শুরু করার অনুপ্রেরণা।”

বেটার লাইফে নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় পনেরো হাজারের বেশি। ২০২৩ সালে চাহিদা বাড়ায়, বেটার লাইফের আরও চারটে সেন্টার তৈরি হয়েছে। গুয়াহাটিতে মেডিসিনের ওয়ার হাউস গড়ে উঠেছে। এখন ৪৫ জন কর্মী কাজ করেন।

‘বেটার লাইফ’ গড়ে তোলার আগে গুয়াহাটির একটা নামকরা হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে কাজ করছিলেন সায়ন্তনী। তিনি একজন গাইনোকোলজিস্ট। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় চলে যান। তাঁর আরও সংযোজন, “আজকাল যাঁরা প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করেন, সাধারণত টেলিমেডিসিন-এর মাধ্যমে কাজ করেন। কেউই ফিল্ডে নেমে খুব একটা কাজ করেন না। কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের সাহায্যে কাজ করেন। কিন্তু ফিল্ডে নেমে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করাটা একেবারে আলাদা। আমরা জীবন-মৃত্যু নিয়ে কাজ করি। ফিল্ডে না-নামলে মানুষকে কীভাবে পরিষেবা দেওয়া যাবে?”

কী কাজ করে ‘বেটার লাইফ’, এর মডেলটা ঠিক কী রকম? তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় সায়ন্তনী জানালেন, উদালগুড়ি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা, সেখানে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া দরকার কিন্তু স্থানীয়দের মধ্যে অনেক কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা আছে। সেখানে কষ্ট করে একটা ছোটো জায়গা খুঁজে বের করে শুরু করা। অসম-ঘরানার একটা একতলা বাড়িকে সংস্কার করে নয় জনকে নিয়ে বেটার লাইফের সূত্রপাত হয়। তাঁরা একেবারে সাধারণ মানুষ। “একজন আছেন নার্স, পড়াশোনা করেছেন কিন্তু কোনও কর্মসংস্থান পাননি। বাড়িতেই বসেছিলেন। ফার্মাসিস্টও তাই। স্থানীয় লোকেদের নিয়ে আরম্ভ করা। স্থানীয় লোকদের নেওয়া হয়, তাতে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এই সংস্থার দ্বারা যাতে অনেকের জীবন ‘বেটার’ হয়, তাই ‘বেটার লাইফ’ নাম দিয়েছি। কেবল রোগী নয়, যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের জীবনও বেটার হোক। এখানে দারিদ্র্য ভীষণ। ২০২১-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা শুরু করি, উদালগুড়ি জেলার পানেরি-তে। এটা জেলা সদর মতো।” বলছিলেন সায়ন্তনী।

গ্রামাঞ্চলে মানুষ এক জায়গায় সব পরিষেবা পান না। এক জায়গায় ডাক্তার দেখাচ্ছেন, আর এক জায়গায় ওষুধ কিনতে যাচ্ছেন। অসমে এই ব্যাপারটা আরও ভয়ঙ্কর। শহরে দেখি, এক ছাতার তলায় সব পরিষেবা। সেটাই ডাঃ সায়ন্তনী ভট্টাচার্যের প্রথম লক্ষ্য ছিল। ‘বেটার লাইফ’-এ সব রকমের ওপিডি-নির্ভর পরিষেবা একই ছাদের তলায় মানুষকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। ডাক্তার, বিভিন্ন পরীক্ষা, ফার্মেসি, ডে-কেয়ার, নর্মাল ডেলিভারি করার একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন জায়গা, অক্সিজেনের সুবিধা, ছোটোখাটো অপারেশনের ব্যবস্থা, সব ধরনের এমার্জেন্সি চিকিৎসা, সাপের দংশন, কেউ বিষ খেল, চা বাগানে মৌমাছির কামড়, দুর্ঘটনার মতো ঘটনা প্রায়শই দেখা যায়। স্ট্রোক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে চিকিৎসা করা। এটাই তো মানুষ পায় না। সায়ন্তনীর বক্তব্য, “গুয়াহাটিতে একশো কিলোমিটার দূরে কেউ যাবে, সে তো রাস্তাতেই মরে যাবে। এছাড়াও টিকাকরণ। করোনা থেকে টিটেনাস, এই ভাবে প্রায় পঁচিশটার মতো পরিষেবা একই ছাদের তলায় আমরা দিই। এটাই আমাদের প্রাথমিক মডেল। কাচের বিল্ডিং, চকচকে মেঝে আমাদের মিশন নয়, আমরা সাধারণ রাখব এবং ভালোমানের চিকিৎসা পরিষেবা দেব, মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী। এটা কিন্তু কোনও এনজিও নয়। সেবা নয়। সেবা দীর্ঘকালীন হয় না। এটা লাভজনক সংস্থা। তবে মানুষের সাধ্যের মধ্যে।”

এছাড়াও মার্কেটিং আছে। এখানে ডিজিটাল মার্কেটিং চলবে না। স্থানীয়দের দিয়ে গ্রামে গ্রামে স্থানীয় ভাষায় মাইকিং করা হয়েছে। আশা, অঙ্গনওয়ারি কর্মীদের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। তাঁদের একটি কর্মসূচি ছিল আরোগ্য স্পর্শ। তাতে বেটার লাইফের টিম বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেক-আপ করত। বেটার লাইফের কথা বলত। সায়ন্তনী বলছেন, “রোগী কখন আসবে, সেই অপেক্ষায় নয়, আমরা রোগীর কাছে পৌঁছে যেতাম। আমরা স্মার্ট পয়েন্টস করেছিলাম, বেটার লাইফ স্মার্ট পয়েন্টস। প্রত্যেক গ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে স্মার্ট পয়েন্ট গড়া হয়েছিল। সেখানে এসেও মানুষ নানান পরিষেবা পেত। এর সঙ্গে ডিজিটাল মার্কেটিং চলে ফেসবুকে। কারণ ওখানে সোশ্যাল মিডিয়া বলতে কেবল ফেসবুক। এছাড়াও স্থানীয় সাংবাদিক, পঞ্চায়েতের প্রধান, রাজনৈতিক নেতা, যাঁদের কথা লোকে শোনে, বিশ্বাস করে তাঁদেরকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। আমরা মাসে অফার, ডিসকাউন্ট শুরু করি। এই ধরনের প্রচুর কিছু প্রকল্প শুরু করি।”

‘বেটার লাইফ’ গড়ে তোলার কাহিনি, সফর নিয়ে একটি বই লিখে ফেলেছেন সায়ন্তনী। ‘ইন সার্চ অফ আ বেটার লাইফ’ শীর্ষক বইটি তরুণ, উদীয়মান উদ্যোগপতিদের জন্য শূন্য থেকে ব্যবসা শুরু করার ব্যাকরণ হতে চলেছে।

হাজারও প্রতিকূলতা এসেছে, বেটার লাইফ-এর প্রতিষ্ঠাতা সায়ন্তনী সে সব জয় করেছেন। তাঁর কথায়, “প্রচুর প্রতিবন্ধকতা এসেছে। ইন্টারনেট, পানীয় জল, ইলেকট্রিসিটির সমস্যা আছে। উদালগুড়ি বন্যাপীড়িত জেলা। আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন। সাধারণ জিনিসেরও খুব অভাব। কর্মীদের অপ্রতুলতাও একটা সমস্যা। কারণ, ওখানে আমি কোনও প্রশিক্ষিত কর্মী পাবো না। তাই স্থানীয়দের শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হয়। তাঁদের যোগ্য করতে তুলতে হয়, যাতে তাঁরা পরিষেবা দিতে পারে। কারণ, গুণগত মানকে আমরা অগ্রাধিকার দিই।”

তিনি আরও জানালেন, বেটার লাইফে নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় পনেরো হাজারের বেশি। ২০২৩ সালে চাহিদা বাড়ায়, বেটার লাইফের আরও চারটে সেন্টার তৈরি হয়েছে। গুয়াহাটিতে মেডিসিনের ওয়ার হাউস গড়ে উঠেছে। এখন ৪৫ জন কর্মী কাজ করেন। প্রতিটি ক্লিনিকে একজন করে মেডিক্যাল অফিসার আছেন। কনসাল্টেন্ট আছেন বিভিন্ন বিষয়ে। সপ্তাহে একদিন করে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আসেন।

‘বেটার লাইফ’ গড়ে তোলার কাহিনি, সফর নিয়ে একটি বই লিখে ফেলেছেন সায়ন্তনী। ‘ইন সার্চ অফ আ বেটার লাইফ’ (In Search of a Better Life) শীর্ষক বইটি তরুণ, উদীয়মান উদ্যোগপতিদের জন্য শূন্য থেকে ব্যবসা শুরু করার ব্যাকরণ হতে চলেছে। সায়ন্তনীর কথায়, “যাঁরা হেলথ কেয়ারের ব্যবসা করতে চান, ব্যবসা শুরুর আগে কী কী করা হবে, কীভাবে সবটা পরিচালনা হবে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা মিলবে এই বইতে। হেলথ কেয়ারের ব্যবসা অন্য ব্যবসার থেকে আলাদা, কারণ আমাদের কাজ মানুষের জীবন নিয়ে। এমবিবিএস-এ আমাদের চিকিৎসা কীভাবে করতে হবে তা শেখানো হয়, ব্যবসা তো করতে শেখানো হয় না। এখানে আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা, যেহেতু আমি একা হাতে নিজে সবটা করেছি। প্রান্তিক এলাকায় কাজ করতে চাইলে বাইবেল হবে এই বইটি। কারণ প্রান্তিক এলাকায় কাজ করা অন্য জিনিস। কেবল সাহস, উৎসাহে সবটা হয় না।” তাঁর আশা, আগামীতে যাঁরা এই পেশায় আসবেন তাঁদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে বইটি। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে বইটি সম্পাদনা করেছে টেলস টকস অ্যান্ড ওয়াকস (TTW)। প্রকাশক Exceller Books।

অসমের মতো অন্য রাজ্যেও ‘বেটার লাইফ’ কেন্দ্র গড়তে চান সায়ন্তনী। তিনি পশ্চিমবাংলার মেয়ে। আগামীদিনে অসমের বাইরে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বেটার লাইফ-এর সেন্টার তৈরি করতে চান। একুশ শতকে হয়তো মৃতজনে প্রাণ আর অন্ধজনে আলো দিতে ঈশ্বর অবতীর্ণ হন না। সায়ন্তনীর মতো কেউ কেউ নিজেদের ভাবনা নিয়ে, উদ্যোগ নিয়ে মানুষের ভরসা হয়ে হাজির হন প্রত্যন্ত এলাকায়। রোগপীড়িত মানুষ চিকিৎসা পাক। এইভাবেই ‘বেটার লাইফ’ আরও বেশি বেশি করে প্রান্তিক মানুষের জীবনকে ‘বেটার’ করে তুলুক।

____________________
‘ইন সার্চ অফ আ বেটার লাইফ’ বইটির অনলাইন লিংক:
https://amzn.in/d/d3IuMqY 

Written by