‘হ্যালো’ লিখে পাঠালেই আপনা বৈদ্য স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চাইবে
ড. স্বরূপ দে, সহ-প্রতিষ্ঠাতা-আপনা বৈদ্য; হার্ভার্ড, আইআইটি মুম্বাই, বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের প্রাক্তন ছাত্র
মেদিনীপুরের এক অজ গ্রামের বাসিন্দা সুমনা মণ্ডল কয়েকদিন কোমরের ব্যথায় ভুগছেন। হাতের কাছে কোনো ডাক্তারখানাও নেই। এই অবস্থায় তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না যে কী করবেন বা কী ওষুধ খাবেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, হাতের কাছে একটা গাইড বুক অন্তত থাকলে ভালো হতো!
এই সমস্যা শুধু সুমনা মণ্ডল বা ওরকম কয়েকজনের নয়। ভারতের মতো দেশে যেখানে জনসংখ্যা অত্যধিক বেশি তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা কম, সেখানে এই সমস্যা আখছার দেখা যায়। এই সমস্যার সমাধানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রাক্তনী তরুণ গবেষক স্বরূপ দে (Swarup Dey) ও তাঁর টিম পথ দেখিয়েছেন ‘আপনা বৈদ্য’ (Apna Vaidya) নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটবট উদ্ভাবন করে। তিনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি (এআই) ব্যবহার করে এই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটবট তৈরি করেছেন।
আপনা বৈদ্য অর্থাৎ আপনার বৈদ্য বা চিকিৎসক আপনার জন্য কী করতে পারেন? সংশ্লিষ্ট নাম্বারে (চ্যাটবট নম্বর 82072 93123) হ্যালো লিখে পাঠালেই আপনা বৈদ্য আপনাকে আপনার স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্কে জানতে চাইবে।
এর আগে চ্যাটজিপিটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আমরা অনেকেই সে কথা জানি। সেরকম ভাবেই এবার মানুষের নানা রোগ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দেবে এআই। আপনা বৈদ্য অর্থাৎ আপনার বৈদ্য বা চিকিৎসক আপনার জন্য কী করতে পারেন? খুব সহজ কথায় বলি, সংশ্লিষ্ট নাম্বারে (চ্যাটবট নম্বর 82072 93123) হ্যালো লিখে পাঠালেই আপনা বৈদ্য আপনাকে আপনার স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্কে জানতে চাইবে। ইংরেজি সহ বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগুর মতো যেকোনো ভারতীয় ভাষায় লিখে এমনকি ভয়েস মেসেজ করে জানতে চাইলেও আপনা বৈদ্য আপনাকে দিশা দেখাবে। চাইলে আপনি ভিডিও আপলোড করেও সমস্যা জানাতে পারেন। যে কোনও রোগের প্রাথমিক বিশ্লেষণ, অর্থাৎ রোগ কতটা মারাত্মক এবং প্রাথমিকভাবে কী করতে হবে এবং কী ধরনের ডাক্তার দেখাতে হবে তা জানিয়ে দেবে আপনা বৈদ্য। ধরুন আপনার অনেক দিন ধরে কোমরে ব্যথা, তার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্রাবে মাঝে মাঝে জ্বালা হচ্ছে – আপনা বৈদ্য সেখানে বলে দিতে সক্ষম যে আপনার হয়তো কিডনির সমস্যা থাকতে পারে, কাজেই আপনার একজন ইউরোলজিস্ট বা নেফ্রোলজিস্টকে দেখানো উচিৎ। তার কাছে পরামর্শ চাইলে আপনার এলাকার ওই ধরনের ভালো ডাক্তারের নামও বলে দেবে।
বুঝতে না পারলেও বোঝানোর চেষ্টা করবে সে। পাশাপাশি আপনি যদি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনটিতে ঠিক কী বলা হয়েছে, বুঝতে না পারেন, তাহলে সেটা ছবি তুলে আপলোড করে দিন। তাহলে এই ডিজিটাল বৈদ্য আপনাকে ডাক্তার কী ওষুধ বা ব্লাড টেস্ট লিখেছেন, বর্ণনা দিয়ে দেবে।
কোচবিহার জেলার দিনহাটার সাহেবগঞ্জে বড়ো হয়ে ওঠা বাঙালি পরিবারের মেধাবী ছেলে স্বরূপ দে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, আইআইটি মুম্বাই, হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল পার করে এখন আমেরিকা নিবাসী গবেষক। সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসার সহযোগিতায় তিনি আপনা বৈদ্য উদ্ভাবন করেছেন।
কোচবিহার জেলার দিনহাটার সাহেবগঞ্জে বড়ো হয়ে ওঠা বাঙালি পরিবারের মেধাবী ছেলে স্বরূপ দে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, আইআইটি মুম্বাই, হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল পার করে এখন আমেরিকা নিবাসী গবেষক। সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসার সহযোগিতায় তিনি আপনা বৈদ্য উদ্ভাবন করেছেন। পুরো স্বদেশি ভাবনায় এবং সহায়তায় তৈরি হয়েছে অ্যাপটি। এই প্রজেক্টে তিনি পাশে পেয়েছেন চিকিৎসক স্ত্রী পৌষালীকে। হুগলির হরিপালের বাসিন্দা পৌষালী এখন উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মেডিকেল কলেজে কর্মরত। স্বরূপ সাহায্য পেয়েছেন ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (Massachusetts Institute of Technology)-র প্রবাসী ভারতীয় অধ্যাপক আশ্বিন গোপীনাথ ও কলকাতার নিউ আলিপুরের ছেলে সম্বর্ত রায় বর্মনের থেকে।
কাদের কথা ভেবে এই অ্যাপ তৈরি করেছেন? স্বরূপ দে আমেরিকা থেকে বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “প্রান্তিক এলাকার মানুষদের হাতের কাছে ডাক্তার নেই। তারা ওষুধের দোকান বা হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসেন। যার ফল কখনও কখনও মারাত্মক হয়ে যায়। তাদের সঠিক পরামর্শ দেবে এই অ্যাপ। আট থেকে আশি যে কারো কাছে একটা ইন্টারনেট কানেকশন আর হোয়াটসঅ্যাপ থাকলেই যেকোনো শারীরিক সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।”
ইন্টারনেটের যুগে সার্চ ইঞ্জিন গুগলের রমরমা চারিদিকে। মানুষ যাবতীয় জিনিস গুগল থেকেই জেনে নেয়। সে ক্ষেত্রে আপনা বৈদ্য কী বিশেষত্ব দাবি করে? স্বরূপ বলেন, গুগলের চেয়ে অনেক সহজতর উপায়ে রোগী এখানে সমাধান পাবেন। তাঁর বক্তব্য, “গুগল কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না। কোনো বিষয় নিয়ে গুগলে সার্চ করলে গুগল তার পক্ষে বা বিপক্ষে কথাগুলোর লিংক দিয়ে দেয়। সেই লিংকের ভেতরে গিয়ে আপনাকে নিজেকে বিচার করে নিতে হবে যে কোনটা আপনার জন্য ভালো হবে। কিন্তু আপনা বৈদ্য আপনার সমস্যা বুঝে আপনাকে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবে। আপনার জন্য কোনটা ঠিক সেটা আপনাকে নিজেকে বিচার করতে হবে না। রোগের একটা প্রাথমিক নিরূপণ আপনার হয়ে যাবে।”
স্বরূপ আপনা বৈদ্য-এর কার্যকরী দিকগুলোর কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আপনার কাছে কোনো প্রেসক্রিপশন বা মেডিকেল রিপোর্ট থাকলে আপনা বৈদ্য থেকে সেটা সম্পর্কে জানতে পারবেন। এটা গুগল থেকে আপনি পারবেন না। অথবা আপনার কোনো অংশে কেটে ছড়ে পুড়ে গেলে তার ছবি তুলে আপলোড করে দিলে, সে আপনাকে দেখে বলে দেবে আপনার কী করা উচিত। খুব সহজে ২৪ ঘণ্টাই ডাক্তারি পরামর্শ পাবেন এখানে।”
ইতিমধ্যে প্রচুর মানুষ এই অ্যাপ ব্যবহার করে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এই অ্যাপের উপযোগিতা নিয়ে কী বলছেন বাস্তবের মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনাররা? বীরভূম জেলার বোলপুর সাব ডিভিশন হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাঃ শুভজিৎ রায় বলেন, “নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। অনেক মানুষের উপকার হবে আশা করি। এই অ্যাপটির সাহায্যে যদিও রোগ নির্ণয় সম্ভব হবে না, তথাপি স্মার্ট ফোন আছে, এমন রোগীদের জন্য সাধারণ ব্যথা, জ্বর, সর্দি, মাথাধরার মতো উপসর্গের উপশম চিকিৎসকের সাহায্য ছাড়াই সম্ভব হবে। যদিও এআই-এর মতো অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে এই অ্যাপটি তৈরি, তবুও রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে ক্লিনিকাল পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি অথবা চিকিৎসকের বিকল্প হিসাবে এটিকে ভাবা একেবারেই উচিত হবে না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী বলেন, “এই অ্যাপে রোগীর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষানিরীক্ষা সম্ভব নয়। তাই রোগীর লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় বা ওষুধে সমস্যা হলে সেটা পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে অ্যাপ কিছু করতে পারবে না হয়তো।”
তাহলে কি ভবিষ্যতে এই অ্যাপ ডাক্তারদের জায়গা নিতে চলেছে? স্বরূপ বলেন, “কখনোই আমরা প্রশিক্ষিত ডাক্তারদের বিকল্প হয়ে উঠতে চাইনি। তাদের সহায়ক হয়ে উঠতে চেয়েছি। তাই আমরা এর নাম দিয়েছি, ভারতের মেডিকেল সহায়ক। বরং প্রান্তিক এলাকার হাতুড়ে ডাক্তারদের বিকল্প হয়েছে এই অ্যাপ। যখন ছোটোখাটো সমস্যায় মানুষ ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না, তখন আপনা বৈদ্য খুব সহায়ক হবে। তাছাড়া যখন কোন ডাক্তারের কাছে মানুষ যাবে, এই বিশেষ অ্যাপ রোগের একটা প্রাথমিক ডায়াগনোসিস করে সময় বাঁচাবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী বলেন, “এই অ্যাপে রোগীর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষানিরীক্ষা সম্ভব নয়। তাই রোগীর লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় বা ওষুধে সমস্যা হলে সেটা পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে অ্যাপ কিছু করতে পারবে না হয়তো।”
তবে আশাবাদী স্বরূপ। তিনি দাবি করেন, “আমরা বহু প্রখ্যাত ডাক্তারদের এই অ্যাপ ব্যবহার করতে বলেছি। তাঁরা ব্যবহার করে সন্তুষ্ট হয়েছেন। সবাইকে বলব, অবশ্যই একবার ব্যবহার করে দেখুন।”
ভারতের মতো দেশে সবার কাছে এখনও পৌঁছায়নি স্বাস্থ্য পরিষেবা। হতদরিদ্র মানুষকে নির্ভর করতে হয় সরকারি ব্যবস্থাপনার উপর। রোগীপিছু চিকিৎসকের সংখ্যাও খুব কম। এই পরিস্থিতিতে বড়োসড়ো পরিবর্তন না হোক, ছোটখাটো প্রয়োজনে যদি আপনা বৈদ্যর মতো উদ্যোগ কাজে আসে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবেন উদ্ভাবকরা। আপাতত নিজেদের খরচেই চালানো হচ্ছে এই উদ্যোগ। স্বরূপের আশা, শিগগিরই সরকারি বা হিতাকাঙ্খী মানুষের থেকে সাহায্য পাওয়া যেতে পারে।