বিষণ্ণতা আর মায়ায় ঘেরা কবিতাজীবন দেবারতি মিত্রের, মঞ্চের আলো থেকে বহুদূর

ছবি সৌজন্যে-সন্দীপ কুমার

বি দেবারতি মিত্র-র কাছে গিয়েছিলাম অরণিদার (কবি অরণি বসু) সঙ্গে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত চলচ্চিত্র ও কবিতা উৎসবে কবিতার জন্য জীবনকৃতি সম্মান (Lifetime Achievement Honour for Poetry)-এর ফলক এবং আরও কিছু সামান্য উপহার তার হাতে তুলে দিতে। দেখলাম এক ঘর বইয়ের ভিতর তিনি ঘোলাটে ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছেন। ঘরে টিমটিম করছে আলো। আয়া বলতে শুরু করলেন, “উনি খান না… উনি কথা বলেন না… উনি উঠে বসেন না… উনি কথা শোনেন না…”

দেবারতি মিত্র এবং মণীন্দ্র গুপ্ত

যে খাটটিতে শুয়ে আছেন দেবারতি মিত্র (Poet Debarati Mitra), তার তিন ভাগের দুই ভাগ বইয়ে ভরা, খাটের তলায় পাঁজা পাঁজা বই, ওপরে একটি বিশাল খোলা আলমারি ঠাসা বই। এই সেই মনীন্দ্র গুপ্ত-র সাধের যোগিয়া বাড়ি, তাঁর ছোট্ট বউটি যেখানে সেইদিন অপেক্ষারত – কত তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যায় স্বামীটির কাছে। বস্তুত মৃত্যুর জন্য এমন অপরিসীম কাতরতা আমি আগে দেখিনি; ঠিক যেমন বইয়ের প্রতি এমন বিরক্তি আগে হয়নি। তাকালেনও না উপহারগুলির দিকে। অরণিদা নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁর প্রিয় বিস্কুট, হরলিক্স আর যা যা খেতে উনি হয়তো ভালবাসতেন, মনে নেই। অরণিদা বললেন, “জিঞ্জার বিস্কুট দুধে ডুবিয়ে খাবেন একটা, আপনি তো ভালোবাসেন!” উনি শুনলেনই না।

অরণিদা তো অরণিদা-ই! আর একমাত্র অরণিদার পক্ষেই এমনটি হয় সম্ভব। জখম পা নিয়ে সেই হাওড়া থেকে গড়িয়ার সুদূর প্রান্তে আসতেন যেতেন ফি হপ্তা, এই বয়সেও। ওষুধ, বাজারের ব্যবস্থা করা, আয়াদিদিদের সব সমস্যা মেটানো, হিসেব নিকেশ এবং সর্বোপরি প্রতিনিয়ত এই অবুঝ মেয়েকে বুঝিয়ে চলা – “আপনি আবার লিখুন, যা ইচ্ছে লিখুন, এক লাইন লিখুন, আমি রোজ আসব আপনি শুধু একটা লাইন বলবেন, আমি লিখে রাখব।”

এক ঘর বইয়ের ভিতর তিনি ঘোলাটে ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছেন। ঘরে টিমটিম করছে আলো। আয়া বলতে শুরু করলেন, “উনি খান না… উনি কথা বলেন না… উনি উঠে বসেন না… উনি কথা শোনেন না…”

কবিতা উৎসবের ঝাঁকের আড়ালে আমার শহরে বুনে ওঠে এইসব নিভৃত কবিতাও। কবি অরণি বসু আর কবি দেবারতি মিত্র-র এই রোজকার বিষণ্ণতা আর মায়ায় ঘেরা কবিতাজীবন। মঞ্চের আলো এতদূর পৌঁছয় না। ভাগ্যিস!

নাঃ দেবরতি মিত্র আর লেখেননি। সৌরভ দে, দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় প্রকাশ করেছিলেন তাঁর শেষ অনবদ্য কবিতাগুলি ‘ও ও ও ও’। অদ্ভুত আশ্চর্য সেই কবিতারা ভূতের মতো তাড়া করে আমাকে; ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছি আমিও। এই কবিতাগাথা মনীন্দ্রকে নিয়ে দেবারতির লেখা, মনীন্দ্র-র মৃত্যুর পর। সৌরভ, দেবজ্যোতিও প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছেন ওঁকে জীবনের কাছে ফিরিয়ে আনার – ফোন করে, বাড়ি গিয়ে, সস্নেহে, ধমকিয়ে; কিন্তু বাংলা সাহিত্যের এই পাগল কবি, যার কব্জির জোর সঠিক মূল্যায়নে হারিয়ে দিতে পারে বিশ্বকবিতার দরবারের তাবড় কবিদের, এমন প্রেমে পড়লেন মৃত্যুর। উনি বিশ্বাস করেছিলেন যে মৃত্যু-দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর ‘ও’, যেমন বিশ্বাস করেছিলেন, “ও তো বলেছিল আমার আগে ও মরবে না, দুশো বছর বাঁচবেন।” নাঃ, আজ কোনো কষ্ট নেই দেবারতিদির চলে যাওয়ায়। এ ওঁর ইচ্ছামৃত্যু। আমি তাঁর জেদ, পাগলামি আর প্রেমকে কুর্নিশ জানাই।

তাঁর শেষ কবিতার বই ‘ও ও ও ও’

আমার কষ্ট অন্য জায়গায়। শক্তি-সুনীল এবং অন্য পপ্যুলার পুরুষ কবিদের ভিতর এই মেয়েটিও বেঁচে ছিলেন, লিখেছিলেন অবিরত এমন কবিতা যা এক কথায় দশ গোল দিতে পারে অনেককে। আমরা তাঁর কথা জানতে পারি না সহজে, আমরা তাঁকে নিয়ে চর্চা করিনি কোনোদিন – না অল্টারনেটিভ, না মেইনস্ট্রিম – কোথাও পাইনি তাঁর কবিতা নিয়ে যথাযথ কথাবার্তা। কোনো বাংলা একাডেমির সভায় মঞ্চ আলো করে বসে থাকা সেলিব্রিটি কবিদের মধ্যে বসে থাকতে দেখিনি তাঁকে কোনোদিন। আমরা শুনিনি এই কবিমনের অভ্যন্তরের কথাগুলি। অথচ তিনি কোনো মামুলি কবি ছিলেন না, তাঁর কবিতার দাপট ছিল বিশ্বমানের। আমরা যোগ্য নই দেবারতি মিত্র-র স্থান হিসেবে। ওঁর জন্মানো উচিত ছিল এমন কোনো জায়গায় যেখানে নারীর যোগ্য সম্মান আদায় করে নিতে হয় না, স্বাভাবিক স্বচ্ছতায় তা এমনিই আসে, জানি না সে কোন জায়গা যদিও।

আমার কষ্ট হচ্ছে অরণিদার জন্যও। দেবারতিদির চলে যাওয়া তাঁর কাছে বোধহয়, ছোট্ট অবুঝ জিদ্দিবাজ মেয়েটার চলে যাওয়ার মতোই। এ শোকের সান্ত্বনা হয় না।

__________________
কবি-গদ্যকার দেবারতি মিত্র। জন্ম ১২ এপ্রিল, ১৯৪৬ সালে কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। দেবারতি মিত্রের প্রথম কবিতার বই ‘অন্ধস্কুলে ঘণ্টা বাজে’। অন্যান্য গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘যুবকের স্নান’, ‘ভূতেরা ও খুকি’, ‘খোঁপা ভরে আছে তারার ধুলোয়’, ‘মুজবত পাহাড়ে হাওয়া দিয়েছে’ ইত্যাদি। কবিতা ছাড়াও তিনি লিখেছেন কবিতা-বিষয়ক প্রবন্ধ ও আত্মজৈবনিক গদ্য। ১৯৬৯ সালে কৃত্তিবাস পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে আনন্দ পুরস্কার এবং ২০১৪ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন দেবারতি মিত্র। ২০০২ সালে নির্বাচিত হন জাতীয় কবি হিসাবে।

Written by