নিজেকে প্রমাণ করে আজ সে প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী
ঝলসানো দুটো হাত। গলাটা ঝলসে গিয়েছে। ঠোঁট দুটো ফুলে ঝুলছে। চোখের পল্লব, ভ্রু বলে কিচ্ছু নেই। মাথার চুল কুঁকড়ে জট পাকানো। গোটা শরীর জাল দিয়ে ঘেরা। ঘরের আয়না সহ সবকটা কাচ লিউকোপ্লাস্টার দিয়ে শক্ত করে আটকানো। কোথাও ছায়া পড়ার ফাঁকটুকুও রাখা নেই…
এক বেসকরকারি হাসপাতালের ঘরে নিজেকে এভাবেই আবিষ্কার করেছিল বছর চোদ্দর ডালিয়া। ডালিয়া সাহা।
পেটে তার অসহ্য খিদে। অসম্ভব তেষ্টা। তবু একফোঁটা খাবার মেলে না। এভাবে চারদিন টানা শুকিয়ে। চারদিন পর মিলেছিল খাবারের অনুমতি।
পর পর ১১ বার সার্জারি। স্কিন ক্রাফটিং। শরীরের একস্থান থেকে চামড়া নিয়ে অন্যত্র প্রতিস্থাপন। সংক্রমন হত। রক্ত বন্ধ হত না।
ড্রেসিং চলত একদিন অন্তর। এমনই অসহ্য তার যন্ত্রণা, প্রতিবার মনে হত ‘এর চেয়ে মৃত্যু ভাল’। চিৎকার আপনি আসত। থামত না। কড়া কড়া ঘুমের ওষুধ, ইঞ্জেকশন ঘুম আনতে ব্যর্থ হত। দিন-রাতের বোধ নেই। তার কাছে তখন শুধু শরীর জুড়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে যন্ত্রণাটাই সত্যি। চারপাশ ঝাপসা…

শেষ সার্জারির আগে
এভাবে দু’মাস…তারপর আরও অনেকগুলো লম্বা লম্বা বছর। নাকের মাঝখান থেকে কিছু ছিল না। চিবুক আর গলা একটাই পোড়া মাংসের ঢাল। ক্লাস নাইনে এভাবেই ওকে প্রথম দেখেছিলাম। সবটা তৈরি করতে হয়েছে। পর পর ১১ বার সার্জারি। স্কিন ক্রাফটিং। শরীরের একস্থান থেকে চামড়া নিয়ে অন্যত্র প্রতিস্থাপন। সংক্রমন হত। রক্ত বন্ধ হত না। শরীরের যন্ত্রণা নিঃশেষ করে দিত, সঙ্গে মন… প্রতিবারই মনে হত, বারবারের থেকে একেবারে শেষ হয়ে যাওয়াই ভাল, কিন্তু কী এক টান, নাছোড় জেদ জাগিয়ে রাখত তাকে।
আচ্ছন্নতার মধ্যে জেগে উঠত ঘরের টান। হাওড়ার বেলগাছিয়ার বাড়িটা। তার ফেরার পথে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকা মুখগুলো। বাবা-মা…
সালটা ২০০০। মার্চ মাস। বসন্তের বাতাস বইতে শুরু করেছে। রাজলক্ষ্মী বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস এইটের পরীক্ষা শুরু হতে খুব বেশিদিন বাকি নেই। সন্ধেবেলা তাই পড়া ঝালিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা তুঙ্গে। তখনও সন্ধে মানে মশাদের উৎসব। কামান না দাগতে হলেও কয়েল যুদ্ধ চলে। সুইচ বোর্ডে ‘মশা কন্ট্রোল’ করার উপায় সহজলভ্য হয়নি সাধারণে। আগুন জ্বালতে অনভ্যস্ত হাত দেশলাইয়ে থরথরায়।
ডালিয়ার গায়ে সিল্কের জামা। দেশলাইয়ের কাঠিটা উল্টোদিকে ছিটকে এসেছিল। দপ করে জ্বলে উঠেছিল আগুন। ঘরে কেউ নেই। ক্লাস এইটের মেয়েটা বুঝতেও পারেনি। নাকে কেবল পোড়া পোড়া একটা গন্ধ। আয়নায় ভেসে উঠেছিল হাত জ্বলছে…
ডালিয়া ভয়ে কাঠ। গলায় স্বর নেই। মা যে বকবে…
হাসপাতালে যখন আনা হয় তখন ডালিয়ার শরীরের ৩৫ শতাংশ প্রায় ঝলসে গলে গিয়েছে। হাসপাতাল কর্তপক্ষ তার বাবাকে বলেছিল, “বাড়িতে ভরি দশেক গয়না আছে তো?”…কারণ এই রোগীর বেঁচে ফেরায় খরচ প্রচুর।
প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল ডালিয়া। ঘরেও ফিরেছিল। তবে সে ফেরার পথ কাঁটায় কঠিন। সমাজের মূলস্রোত যে তখন তাকে গ্রহণ করতে নারাজ। রাস্তায় বেরনো যায় না। বারান্দায় দাঁড়াতে নেই। স্কুল যেতে হয় মুখ ঢেকে। তাকে নাকি দেখলেই ভয় করে। সারি সারি চোখের দৃষ্টি যেন বলে ‘কেন সে রাস্তায়!’।
ডালিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিল পরিবার। বাবা-মা বলেছিলেন, “কিচ্ছু হয়নি তোমার, যেমন ছিলে, তেমনি আছ…এগিয়ে যাও।” বাবা-মায়ের কাছে আসত নানা পরামর্শ। ‘বিয়ে দিয়ে দিন এমন খুঁতওয়ালা মেয়েকে, পড়িয়ে কী হবে!’
‘কালো মেয়ে, ছেলের বউ পছন্দ নয়’, ‘গায়ের রঙের জন্য শ্বশুর বাড়ির নির্যাতন’, কিংবা কখনও শুধুই ‘মেয়েকে দেখতে ভাল নয়’– তার জেরে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এমন কত কত ঘটনার কোলাজ-সারাক্ষণ বলে দেয় আজও মেধা মেয়েদের সংস্থান নয়, পরিবার হোক বা সমাজ ভাবনা আটকে সেই বিয়েতেই।
একবার আধবার নয়, এমন আঘাত বারবার এসেছে। প্রতিবারই লক্ষ্য শরীর, মুখ, রূপ। আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে জীবনে ফেরার তুমুল লড়াইটুকু। ডালিয়ার বাবা-মা ভেঙে পড়েননি, বরং দেওয়াল হয়ে আগল দিয়েছেন মেয়েকে। একের পর এক অপারেশন আর পরীক্ষার পড়া চলেছে একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। যতবার ঘা এসেছে তত সয়ে নেওয়ার ধার বেড়েছে মনের। রাগগুলো উগরে দিয়েছে বইয়ের পাতায় আর পরীক্ষার হলের উত্তরপত্রে। সেভাবেই আইন পরীক্ষায় পাস। ক্রিমিনাল ল’ইয়ার হিসেবে কেরিয়ার বেছে নেওয়া। তার পড়তে চাওয়ার ইচ্ছে খুব ভালো চোখে দেখেনি পারিপার্শ্বিক। তাবৎ গুরুমশাই স্থানীয়দেরও ভূমিকা খুব অন্যরকম নয়। তার পড়ার জেদ, খিদে অন্যপক্ষের কাছে ‘বাড়াবাড়ি’ অথবা ‘কী দরকার’। পথে যতবার বাধা এসেছে ততবার দগ্ধ দিনের স্মৃতি সাহস হয়ে হাত ধরেছে ডালিয়ার।
‘আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী’ ডালিয়া এই প্রবাদের মুখে সজোর থাপ্পড় কষাতে চেয়েছে বারেবারে। তার এজলাস আর কোর্টরুমে এমন ঘটনা কম আসে না। ‘কালো মেয়ে ছেলের বউ পছন্দ নয়’, ‘গায়ের রঙের জন্য শ্বশুর বাড়ির নির্যাতন’, কিংবা কখনও শুধুই ‘মেয়েকে দেখতে ভাল নয়’- তার জেরে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এমন কত কত ঘটনার কোলাজ-সারাক্ষণ বলে দেয় আজও মেধা মেয়েদের সংস্থান নয়, পরিবার হোক বা সমাজ ভাবনা আটকে সেই বিয়েতেই।

ডালিয়ার আফসোস হয়, তবে হাল ছাড়তে নারাজ। নিজেও আজ সে মেয়ের মা। চায় তার মেয়ে মুক্ত মনের মানবিক এক মানুষ হয়ে উঠুক। স্বাধীন ডানায় ভয়ডরহীন উড়তে শিখুক।
দহন দিনের স্মৃতির পথে হাঁটতে গিয়ে যতই কান্নার দলা গলায় আটকাক, ঘুরে দাঁড়ানোতেই জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে সে। ব্যাঙ্কশাল কোর্ট চত্বরে তার চেম্বারটাও সেই দর্শনেরই আঁতুড়ঘর। যার বীজটা বোনা হয়েছিল বাইশ বছর আগে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আয়নাঢাকা কেবিন ঘরটাতে…
*সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা