কোহলিনামা: তব বিরাট-গাথা

দেশ পৌঁছে গিয়েছে আরও এক আইসিসি ট্রফি জয়ের দোরগোড়ায়। অজিদের বিরুদ্ধে বিরাট কোহলির ৮৪ রান-এর অতিমানবীয় ইনিংসই ভারতকে পৌঁছে দিয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে। বিরাট কোহলি (Virat Kohli) বলছেন, যত দিন তাঁর মধ্যে ব্যাট করার, ক্রিকেট খেলার ইচ্ছেটা জীবিত থাকবে, তত দিন অন্য কিছু নিয়ে ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই। তাঁর কথায়, “কেরিয়ারের এই পর্যায়ে এসে আমি শুধু ক্রিকেটকে, ক্রিকেটের সমস্ত কিছুকে উপভোগ করতে চাই। তা সে দৌড়নো, পরিশ্রম করা, টিমকে জেতানো, যা-ই হোক না কেন।” ক্রিকেটের সবটুকু তিনি উপভোগ করতে চান…। প্রায় দেড়খানা দশক সর্বোচ্চস্তরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পরেও কতটা খিদে রয়েছে বিরাটের! এই খিদে, এই তাগিদ, ক্রিকেটের প্রতি এই ভালোবাসাই বিরাটের আসল শক্তি।

সচিন, দ্রাবিড়, ধোনিদের দলে একটা এঁচোড়ে পাকা ছেলে এসে পড়েছিল বছর পনেরো আগে। তরুণ, ছটফটে। আজ সে পরিবারের জেষ্ঠ্যপুত্র। মাঝে যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। একের পর এক জয় এসেছে। লেখা হয়েছে রূপকথা, মহাকাব্য। সেখানে নায়ক বিরাট। দেশবাসী বিরাটকে জয়ের মুকুট পরিয়েছেন, আবার সে শিরোভূষণ বদলে গিয়েছে কাঁটার মুকুটে। বহু ময়না তদন্ত সহ্য করেছেন বিরাট। রান না-পাওয়ার ক্ষোভে এই ভারতবর্ষ বিরাটজায়াকে অবধি দাঁড় করিয়েছিলেন কাঠগড়ায়। রূপকথা আর মহাকাব্যের পাতা তখন যেন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ফুঁসতে থাকা জনতার খবর ছাপা নিউজ প্রিন্ট। কয়েক মাস আগে নিউজিল্যান্ড দেশে এসে ‘হোয়াট ওয়াশ’ করে গেল, বর্ডার-গাভাস্কর ট্রফিতে হার; ক্ষোভে ফেটে পড়ল জনতা। বিরাট এবারেও রেহাই পাননি। চায়ের দোকানের হারুদা থেকে মাংসওয়ালা ইসমাইল, পরকিয়ায় পিএইচডি ছোটন থেকে সরকারি চাকুরে ব্যানার্জীকাকু, সব্বাই বিরাটকে নিয়ে কাটাছেড়া করেছেন। দেশের মিডিয়া তাঁকে ধ্বস্ত করেছে।

আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যে ৮৪ রান করেছেন বিরাট, তাতে ৬৪ রান দৌড়ে নেন। পাকিস্তান ম্যাচে শুধু দৌড়েই করেছিলেন ৭২ রান। ইনিংসের সিংহভাগ রানই আসছে দৌড়ে। পরিশ্রম করে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিরাটের থেকে বেশি ‘সিঙ্গলস’ কেউ নেননি!‌

দরবার সেজে না-উঠলে কি রাজা আসেন? ঝাড়বাতি জ্বলবে, তবলিয়া দাদরার বোল তুলবেন, সাদা ফিনফিনে পর্দা গোটানো হবে, মখমলের গদি, ঝলমলে যামিনী হলেই তো রাজা নামবেন আসরে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এল, সামনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান, রান তাড়া করতে হবে। মোক্ষম সময়। মঞ্চ তৈরি। এ মহাকাব্যে বিরাটই কৃষ্ণ, তিনিই অর্জুন। এলেন মরুদেশের কুরুক্ষেত্রে। একদিনের ক্রিকেটে ৫১ নম্বর সেঞ্চুরি এল বিরাটের ব্যাট থেকে। দেশকে এনে দিলেন কাঙ্ক্ষিত জয়। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেও রান তাড়া করে জয় ছিনিয়ে আনলে। আবার নায়ক তিনি।

দুই ইনিংসেই দেখা গিয়েছে এক রণকৌশল। সেই রণকৌশলই আধুনিক ক্রিকেটে বিরাটকে শ্রেষ্ঠর সিংহাসনে এনে বসিয়েছে। হয়ে উঠেছেন ‘চেজমাস্টার’। মন্ত্র একটাই স্ট্রাইক রোটেশন। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যে ৮৪ রান করেছেন বিরাট, তাতে ৬৪ রান দৌড়ে নেন। পাকিস্তান ম্যাচে শুধু দৌড়েই করেছিলেন ৭২ রান। ইনিংসের সিংহভাগ রানই আসছে দৌড়ে। পরিশ্রম করে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিরাটের থেকে বেশি ‘সিঙ্গলস’ কেউ নেননি! কোহলির সিঙ্গলসের সংখ্যা প্রায় ৫,৯০০। এটাই পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। রান তাড়া করতে নামা ভারতের উপর চাপ তৈরি করতে পারছে না প্রতিপক্ষ। খুচরো রানের বিন্দু বিন্দুতেই সিন্ধু গড়ে ফেলছেন কিং কোহলি।

সীমিত ওভারের সাদা বদলের ক্রিকেট মানেই চার, ছয়ের বন্যা, এহেন যুগে আধুনিক ক্রিকেটের সংজ্ঞা পাল্টে দিচ্ছেন বিরাট। দ্রুততম ক্রিকেটার হিসাবে চলতি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেই আন্তর্জাতিক এক দিবসীয় ক্রিকেটে ১৪ হাজার রানের গণ্ডি পেরিয়েছেন বিরাট। কোহলির করা ১৪,১৮০ রানের মধ্যে ৫,৭৮০ রানই এসেছে দৌড়ে। অর্থাৎ মোট রানের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর জন্য দায়ী, বছর ৩৬-র বিরাট কোহলির ফিটনেস, অনুশীলন। অধ্যাবসায় তো অসাধ্য সাধন হয়। এভাবেই তো ‘গ্রেটের’ জন্ম হয়। ভিভ, সোবার্স, ব্র্যাডম্যানদের সঙ্গে একই বন্ধনীতে উচ্চারিত হয় তাঁর নাম।

কোহলির করা ১৪,১৮০ রানের মধ্যে ৫,৭৮০ রানই এসেছে দৌড়ে। অর্থাৎ মোট রানের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর জন্য দায়ী, বছর ৩৬-র বিরাট কোহলির ফিটনেস, অনুশীলন। অধ্যাবসায় তো অসাধ্য সাধন হয়। এভাবেই তো ‘গ্রেটের’ জন্ম হয়।

একদিনের ক্রিকেটের মাস্টার ব্লাস্টার সচিনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় তথা দ্রুততম ক্রিকেটার হিসাবে রান তাড়া করতে নেমে ৮০০০ রান পূর্ণ করেন কোহলি। ১৭০টি ম্যাচে সাফল্যের এই মাইলফলক ছুঁলেন তিনি। এ জন্যেই তো বিরাট চেজ মাস্টার জেনারেল!

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনালে ব্যাট হাতে আরও একটি নজির গড়ার হাতছানি রয়েছে বিরাটের সামনে। এখনও পর্যন্ত তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ১৭টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। তাঁর সংগ্রহ ৭৪৬ রান। ফাইনালের দিন আর ৫৪ রান করলে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটার হিসাবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ৮০০ রানের মালিক হতে পারেন বিরাট। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড রয়েছে ক্রিস গেইলের দখলে। ৭৯১ রান করেছেন ক্যারাবিয়ান তারকা ব্যাটার।

একদিন কপিল দেবের বিশ্বজয় দেখে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন সচিন, সচিনকে দেখে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন লালন করেছেন বিরাট। হয়তো বিরাটকে দেখেও কোনও সচিন, কোনও সৌরভ, কোনও মহেন্দ্র সিং ধোনি কোথাও না কোথাও ঘাম ঝরাচ্ছেন, স্বপ্ন বুনছেন। মহাকাব্যের যবনিকাপাত ঘটে, রূপকথা শেষ হয়ে যায় কিন্তু মুকুট আর মিথ অনন্ত। তাদের ধারণ করার লোকটার অবয়ব বদলে যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে… তারপরেও এক-দুজন থেকে যান মনে, ধ্রুবক হয়ে। বাইশ গজে অল্প রানে এক-দুটো উইকেট পড়ে যাওয়ার পর সেই ক্রিকেট দেবতা খোঁজে আমাদের চোখ। এভাবেই ভরসার কাঁধ পাল্টে যায়। কখনও সেটা সুনীল মনোহর গাভাস্কর, কখনও সচিন রমেশ তেন্ডুলকর আজ কাঁধটা বিরাটের… কোহলিই পারেন আসমুদ্রহিমাচলকে এক সূত্রে বাঁধতে।

রবিবার মরুদেশে ফাইনাল। ক্রিকেট ভারতের সবচেয়ে বড়ো ধর্ম, তার উপাসক ১৪০ কোটি। ভারতের এগারোজন ক্রিকেট-রাজার হাতে উঠুক কাপ। রূপকথার রাজ মুকুট উঠুক বিরাটের মাথায়।

Written by