অপ্রতিরোধ্য মারাদোনা থেকে কপিলদেবের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয় : সুকান্ত সেনশর্মার সংগ্রহশালা

হেন্দ্র সিং ধোনি বলেছিলেন, “Sports is a great leveler”। ‘আজ যে রাজা, কাল সে ফকির’ বা উল্টোটা। কিন্তু শুধুই কি ক্রীড়াবিদদের জন্য? দর্শকদের জন্যও বোধহয় সে কথা সত্যি। খেলার মাঠে একদল লোক, একসঙ্গে হাসে, একসঙ্গে কাঁদে, একসঙ্গে স্লোগান দেয়, আর খেলার শেষে কেউ হাসিমুখে, কেউ কান্নাভেজা চোখে, আবার আলাদা হয়ে যায়। খেলা আসলে যূথবদ্ধতার উৎসব, জীবনের উৎসব। কিন্তু খেলা বা খেলার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সামগ্রী, নথিপত্র সংগ্রহ করে ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা বাংলা তথা এই দেশে তেমন চোখে পড়ে না। ইদানীংকালে কিছু স্পোর্টস মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালা তৈরি হলেও তা যথেষ্ট নয়। তবে কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোক্তা আছেন, যাঁরা নিজেদের উদ্যোগে সেই ইতিহাসকে ধরে রেখেছেন, বাঁচিয়ে রেখেছেন ফুরিয়ে যাওয়া ক্রীড়াযুগকে। তেমনই একজন খেলাধূলার নথিপত্র সংগ্রাহক হলেন সুকান্ত সেনশর্মা (Sukanta Sensharma)। কলকাতার গণেশচন্দ্র এভিনিউতে হিন্দ সিনেমার কাছে মলঙ্গা লেন, সেখানেই রয়েছে ক্রীড়া সংক্রান্ত নথিপত্রের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা।

সুকান্ত সেনশর্মা

সুকান্ত, পেশায় সল্টলেকের হরিয়ানা বিদ্যামন্দিরের রসায়নের শিক্ষক। আর খেলাপাগল। ইস্টবেঙ্গলের অন্ধভক্ত এই শিক্ষকের রক্তে খেলা। খেলাই অবসর, তাঁর মানসভ্রমণ। চোখের সামনে উঠে আসে- আজটেকা স্টেডিয়ামে মারাদোনা হাতে বিশ্বকাপ নিয়ে শিশুর মতন হাসছেন, ১৯৮৩-র লর্ডসের ব্যালকনি, বিশ্বকাপ আর কপিলদেব, বা ময়দান জুড়ে বল নিয়ে ছুটে আসছেন ফুটবল সম্রাট পেলে, তাঁর সামনে তখন বাবলু আর গৌতম সরকার। শহরের গলিঘুঁজি হাতড়ে, পুরোনো দোকানপাট থেকে খুঁজে আনা রত্নভাণ্ডার। সুকান্ত বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমাদের দেশে খেলা নিয়ে যা উন্মাদনা, তার সিকিভাগও নেই আর্কাইভ করার ক্ষেত্রে। বিদেশে কিন্তু সমস্তকিছু আর্কাইভ করা থাকে। সংরক্ষণ করা না থাকলে পরবর্তী সময়ে সেই ক্রীড়াবিদের যথার্থ মূল্যায়ন হবে কীভাবে? আর পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের সম্বন্ধে জানবেই বা কী করে?

আমাদের দেশে, বিশেষ করে ফুটবলে, এই অভ্যেস একেবারেই নেই। পুরোনো খেলার ক্লিপিংস, রেকর্ড কিছুই প্রায় পাওয়া যায় না। অনেক সংগ্রাহক নিজের চেষ্টায় কিছুটা সংগ্রহ করেন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ তেমন নেই। তবে হাল আমলে বেশ কিছু স্পোর্টস সংগ্রহশালা হচ্ছে। কিন্তু একেবারে পুরোনো আমল, যেমন ৫০ বা ৬০-এর দশকের তেমন কোনও নথি পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। আমি চেষ্টা করি সেই আমলের নথি সংগ্রহ করার।”

১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর খেলার আসর পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা

পুরোনো-নতুন মিলিয়ে তাঁর কাছে রয়েছে অসংখ্য ম্যাগাজিন, ট্রেডিং কার্ড, ট্যাবলয়েড, পোস্টার, পেপার কাটিং। অজস্র হার্ডকপি, সফটকপি। প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময়কার (১৯৭৫) স্পোর্টস উইক ম্যাগাজিনের সংখ্যা, ক্রিকেটে ভারতের প্রথম বিশ্বজয়ের পর খেলার আসর পত্রিকার সংখ্যা, খেলা পত্রিকার ১৯৮৬ ফুটবল বিশ্বকাপ বিশেষ সংখ্যা, যার কভার জুড়ে ফুটবল পায়ে ছুটে আসছেন অপ্রতিরোধ্য মারাদোনা, কপিলদেবের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ের পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকা-র কভারেজ, ‘স্পোর্ট অ্যান্ড পাসটাইম’ পত্রিকার ১৯৬২ সালের সংখ্যা (জাকার্তা এশিয়ান গেমস বিশেষ সংখ্যা), ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি সংখ্যা, ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার ম্যাগাজিনের ১৯৮৩ বিশ্বকাপ সংখ্যা, যাতে রয়েছে কপিলদেব আর ভিভ রিচার্ডসের সাক্ষাৎকার… এই তালিকা শেষ হওয়ার নয়।

 

ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার পত্রিকা

সুকান্ত সেনশর্মা জানান, “আমি মূলত ক্রিকেট আর ফুটবলের ভক্ত। অন্যান্য খেলার প্রতি তেমন টান নেই। তাই আমার সংগ্রহে গুরুত্ব পেয়েছে ক্রিকেট আর ফুটবলই। তবে একটা ম্যাগাজিনে তো অন্যান্য খেলার খবরও থাকে।” তিনি আরও জানান, “আমি নিজেকে পাঠক বলতেই ভালোবাসি। নিজে পড়ি, অন্যকে পড়াতে চাই। অনেক ক্রীড়ামোদী, ক্রীড়া গবেষক আমার কাছে আসেন, তাঁদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করি। আর আমার কাজে সাহায্য করেন, উৎসাহ দেন পাশে থাকেন আমার স্ত্রী পিউ অধিকারী আর আমার বিদ্যালয়ের সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীরা। ২০১১ সাল থেকে এই কাজ শুরু করেছি। ওঁদের সাহায্য ছাড়া এতদিন ধরে কাজটা চালাতেই পারতাম না।”

১৯৭০ সালে পেলের বিশ্বজয়

কীভাবে সংগ্রহ করেন এত পত্র-পত্রিকা? সুকান্তর উত্তর, “বিভিন্ন দোকানপাট ঘুরে। ছুটির দিনে এর জন্য সারা শহরে ঘুরে বেড়াই। বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব-পরিচিতরা অনেকসময় জোগাড় করে দেন। কিছু জিনিস বাইরে থেকে আনাই। নিজের সংগ্রহ থেকে তাঁদের কিছু দিই, তাঁরা আমাকে ওঁদের সংগ্রহ থেকে কিছু জিনিস দেন। আমি মূলত দেশের পত্র-পত্রিকাই সংগ্রহ করি। কারণ হল বিদেশি পত্রিকার দাম এবং বিদেশ থেকে আনানোর খরচ। তবুও বিদেশি পত্রিকাও কিছু আছে।” ১৯৭৮ সালের স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন-এর প্রথম সংখ্যা, বাংলায় অন্যতম পুরোনো খেলার পত্রিকা খেলার আসরের প্রথম সংখ্যা (১৯৭৭), অলিম্পিক, গড়ের মাঠের ট্যাবলয়েড, এই দেশে প্রথম বেরোনো মারাদোনার কার্ড, স্পোর্ট অ্যান্ড পাসটাইম ম্যাগাজিনে বেরোনো পিকে ব্যানার্জির উপর কিছু ফিচার- এইগুলি তাঁর কাছে অতি প্রিয় বলে জানালেন সুকান্ত। তালিকায় রয়েছে ইতালি থেকে বেরোনো পেলের ছবি দেওয়া এডিরাফ কার্ড (১৯৭৪), কসমস ক্লাবের জার্সিতে পেলের ছবি দেওয়া হাঙ্গেরির ক্যালেন্ডার কার্ড ইত্যাদি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে প্রায় ১২,০০০টি সফটকপি আর ৪০০০-৪৫০০টি হার্ডকপি। ৫০ দশকের ট্যাবলয়েড থেকে ৯০ দশকের বাইচুং, ওমোলো, সাইডলাইনে পিকে-অমলের দ্বৈরথ, আর হাল আমলের ম্যাগাজিন, রয়েছে সবই। বিদেশি পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিন (ইংল্যান্ড), কিকার ম্যাগাজিন (জার্মানি), ফ্রান্স ফুটবল (ফ্রান্স), গুয়েরিন স্পোর্টিভো (ইতালি), এল গ্রাফিকো (আর্জেন্টিনা) ইত্যাদি। সুকান্ত এই পত্রিকাগুলি জোগাড় করেছেন মূলত বিদেশি পোর্টাল মাধ্যমে অনলাইনে পড়ানোর সময়। মরক্কো, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, জার্মানি আর ব্রাজিলের বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে এগুলি জোগাড় করেছেন তিনি। খেলা নিয়ে তাঁদের চর্চা মুগ্ধ করেছিল সুকান্তকে।

আর্জেন্টিনার এল গ্র্যাফিকো ম্যাগাজিন

কোভিডের সময় সুকান্তরা ‘ময়দান’ নামে একটি খেলার পত্রিকাও প্রকাশ করতেন ডিজিটাল মাধ্যমে, যা ছড়িয়ে দেওয়া হত বিনামূল্যে। ময়দান পত্রিকা-র সঙ্গে সুকান্ত সেনশর্মা ছাড়াও যুক্ত ছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী এবং বিশাল দাস। সময়ের অভাবে এক-দেড় বছর পর সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

মারাদোনার কার্ড

এখনকার ডিজিটাল যুগে সবকিছুই ইন্টারনেটে সংরক্ষিত হয়ে থাকছে। এতে কী বদলে যাচ্ছে বা পরবর্তীতে বদলে যাবে আপনাদের মতো সংগ্রাহকদের ভূমিকা? প্রশ্ন করায় সুকান্ত সেনশর্মা বলেন, “এখন সবকিছু ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়ে থাকছে ঠিকই। কিন্তু ৫০, ৬০ বা ৭০ দশকের খেলার খবর তো আমাদের মতো সংগ্রাহকরাই দিতে পারবেন। বিশেষ করে দেশীয় ফুটবলের ক্ষেত্রে। আর আপনি ইন্টারনেটে স্কোরকার্ড বা ম্যাচের ফলাফল পেয়ে যাবেন, কিন্তু আমার কাছে থাকা ম্যাচ রিপোর্ট পড়লে মনে হবে ম্যাচের হাইলাইটস দেখছেন। এটা আমি সব সংগ্রাহকের পক্ষ থেকেই বলছি। তবে ক্রিকেটে যেহেতু পুরোনো ম্যাচের ক্লিপিংসও পাওয়া যায়, তাই ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই যুক্তিটা অতোটা খাটে না হয়তো।” তিনি আরও যোগ করলেন, “অনলাইনে তো কেউ না কেউ বিভিন্ন তথ্য বা নথি আপলোড করছেন। কাজেই সংগ্রহ যত বাড়বে, অনলাইনের তথ্যভাণ্ডার ততটাই বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস।” এই সংগ্রহের অর্থ ইতিহাসকে ছুঁয়ে থাকা আর পৌঁছে যাওয়া সেই মাঠের পাশে, যেখানে এখনও শোনা যাচ্ছে কচিকাঁচাদের হল্লা- প্রথম ম্যাচটা বোধহয় জিতে গেছে একদল। এখন দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য মাটিতে দাগ দিয়ে তার উপর হাত চাপা দিয়ে দেখা হচ্ছে, কে আগে ব্যাটিং পাবে। এই মাঠ ভরাট করে দালান তোলা যাবে না কিছুতেই।

Written by