
স্বচ্ছ জলের উপর আলপনার মত পদ্মপাতার ভাসমান ছবি, ডিঙি নৌকো করে গ্রামবাসীদের মাছ ধরা, আবার কোনো কোনো ঘাটে দল বেঁধে স্নানের দৃশ্য। কখনও শাপলাফুলের উপর বসে থাকা মাছরাঙা। আসন্ন শীতে বায়স্কোপের মতো এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে আপনাকে খুব দূরে যেতে হবে না। এই সময়ই শীতপ্রধান দেশ থেকে এদেশে আসে পরিয়ায়ী বিভিন্ন পাখি। তাদের দেখতেও বিভিন্ন জায়গায় ভিড় জমান পক্ষীপ্রেমীরা ও পর্যটকরা। এরই মধ্যে অন্যতম পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর চুপি পাখিরালয়।

প্রতিবছর শীতকালে হাজার হাজার পাখি দূর-দূরান্ত থেকে আসে এই নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে। কলকাতা থেকে ১২১ কিমি দূরত্বে অবস্থিত পূর্বস্থলী। মূল ভাগীরথী থেকে বিচ্ছিন্ন পূর্বস্থলীয় চুপির চর ছাড়ি গঙ্গা নামেও পরিচিত। গঙ্গা প্রবাহপথ পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছিল এই হ্রদ। এর আকৃতি অনেকটা অশ্বক্ষুরের মত। গঙ্গার মূল স্রোতের সঙ্গে এটি যুক্ত। নৌকার মাধ্যমেই প্রবেশ করতে হয় হ্রদে। এক কথায়, পাখিদের স্বর্গরাজ্য।

একসময় চুপি সম্পূর্ণ ভাবে ছিল চোরা পাখিশিকারীদের হাতে। আর তখন বন্দুকবাজরা শিকার করত নিরীহ পাখিদের মনের আনন্দে। এখন ক্যামেরা ও বাইনাকুলার নিয়ে যাই আমরা পাখি দেখতে। স্থানীয় অধিবাসী ও প্রশাসনের নজরদারিতে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। যদিও পরিবেশ ও পাখিদের জন্য জোরে মাইকের বাজানো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবুও চলে বনভোজনের উৎসব।
তবে এবার যাতে আর শুধু শীতকালে নয়, সারা বছরই পর্যটকরা চুপি পাখিরালয়ে যেতে পারেন সেই ভাবনা থেকে সোমবার দুপুরে সেই জায়গা পরিদর্শনে যান, পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাঝি, সাংসদ সুনীলকুমার মণ্ডল, পূর্বস্থলী উত্তরের বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়।
শীত পড়তেই এখানে সুদূর হিমালয়, ইউরোপ, মঙ্গোলিয়া থেকে পরিযায়ী পাখি হাজির হয়। এই সময় পাখি প্রেমিক ছাড়াও অনেক মানুষ আসে চুপির চরে বেড়াতে। এখানে পাখিদের দেখতে হয় ছোট নৌকায় জলে বুকে ভেসে। কাষ্ঠশালী ঘাট ছাড়াও আরও কয়েকটি ঘাট দিয়ে হ্রদে প্রবেশ করা যায়। মাঝিরাই গাইড। মাঝি ও পাখিদের যেন নিবিড় বন্ধুত্ব অনেকদিনের। তেমন এরা সব পাখিদের খবরও রাখে। ছোটো কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা নিয়ে হ্রদের বুক চিরে এগোলে দেখতে পাবেন বার্ন সোয়ালো (Barn swallow)। যাকে বাংলায় বলে আবাবিল।
তবে এবার যাতে আর শুধু শীতকালে নয়, সারা বছরই পর্যটকরা চুপি পাখিরালয়ে যেতে পারেন সেই ভাবনা থেকে সোমবার দুপুরে সেই জায়গা পরিদর্শনে যান, পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাঝি, সাংসদ সুনীলকুমার মণ্ডল, পূর্বস্থলী উত্তরের বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়।

হ্রদটির মাঝে মাঝে ঘাস ও কাদার ছোটো ছোটো দ্বীপের মত রয়েছে। দেখতে পাবেন গ্রে-হেডেড সোয়ামপেন (Grey-headed swamphen), গ্রে-হিরন (Grey heron), মোরহেন (Moorhen), পার্পেল হিরন (purple heron) এবং ব্রোঞ্জ উইংস জাকানা (Bronze-wings jacana)। ঝাঁকে ঝাঁকে রাঙামুড়ি (Red-crested pochard)। সংখ্যায় প্রায় কয়েক’শ হবে। এরা দল বেঁধে জলে সাঁতার কাটে। যারা কিনা পূর্বস্থলীর মূল আকর্ষণ। ঘুরে বেড়ালে দেখতে পাবেন কমনকুট (common coot), কটন পিগমি গুজ (Cotton pygmy goose), গার্ডওয়াল (Gadwall), লেজার হুইসলিং ডাক (Lesser whistling duck) ও কিছু টাফটেল ডাক (Tuftail duck)। বিস্তৃত চুপির চরে এরা আনন্দে উপভোগ করছে শান্ত পরিবেশে। ভাগ্য সহায় হলে এখানেই দেখা পাওয়া যাবে চার প্রজাতির কিংফিশার। এদের মধ্যে পাইড (Pied kingfisher) ও কমন কিংফিশারক সচরাচর দেখা যায় না।

দেখতে পাবেন একঝাঁক লেজার হুইসলিং ডাক (Lesser whistling duck) সর্ষের খেতের উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। তাছাড়া হঠাৎ হঠাৎ এক এক করে পাখিরা জল থেকে ডানা মেলে উড়ে চলার দৃশ্য আকাশকে বদলে দিচ্ছে নীল ক্যানভাসে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। এই জলাভূমির দুদিকে রয়েছে চাষের জমি। চাষিরা লাঙল-বলদ দিয়ে চাষ করতে ব্যস্ত। তাদের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে শামুক খোল, রেড ওয়ালডেট লেপুইং (Red-wattled lapwing) ও ইগ্রেট (Egret)-এর দল খাবার সংগ্রহের খোঁজে।

দেখা যাবে পাখি ও মানুষের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। নৌকা নিয়ে এগিয়ে চলুন মোহনার দিকে। দেখতে পেয়ে যেতে পারেন সাদা মাথা ও বড়সড় বাদামি শরীরের পাখি যার নাম অসস্প্রে (Osprey)। হয়তো শিকার ধরার জন্য চুপ করে বসে থাকবে বাঁশের খুটির উপরে। এরা খুব ক্ষিপ্র শিকারি। বড়ো মাছ ধরে নিয়ে আহার করতে ভালোবাসে।

শীতে কুয়াশায় ঢাকা জলাশয়ে যখন ধীরে ধীরে সূর্যের আলো আম-কাঁঠালের বাগান আর সর্ষে খেতের উপর পড়বে, দেখবেন বেনেবউ, বসন্তবৌরি, বাঁশপাতির চেস্টনাট টেইল স্টারলিং (Chestnut-tailed starling) আর পাইড স্টারলিং (Pied starling)-এর দল আপনে মনে গান গাইছে। গ্রে লাঙ্গুরের (Gray langur) পরিবারের সঙ্গে।
সঠিক ভাবে গাইড না হলে পথ হারানোর সমস্যা দেখা দিতে পারে। নীল জলের নীচে বিস্তৃত রয়েছে উদ্ভিদের জাল। তাছাড়াও ঘন শ্যাওলা বারবার নৌকোর পথ আবদ্ধ করে। কিন্তু এই অপূর্ব পরিবেশে নৌকোয় চলার আনন্দ কথায় প্রকাশ করা যায় না। শহরবাসীদের জন্যে এটি খুব আকর্ষণের।

দেখতে পাবেন কমন স্নাইপ (Common snipe), কমন রিংড প্লোভার (Common ringed plove)-এর মত ছোটো পাখিদের। পানার উপর বসে থাকবে হোয়াইট ওয়াগটেল (White wagtail)। একটু এগিয়ে যেতেই দেখবেন গ্রেট ইগ্রেট (great egret)। মাথা উঁচু করে রাজকীয় ভঙ্গিমায় দাড়িয়ে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে। ব্ল্যাক হেডেড ইবিস বা কাস্ত বকের দলকে ঘুরে বেড়াতে দেখবেন। দেখবেন রুডিশ্যাল ডাক বা চখা-চখী পাখি।

তবে, এবার যাতে আর শুধু শীতকালে নয়, সারা বছরই পর্যটকরা চুপি পাখিরালয়ে যেতে পারেন সেই ভাবনা থেকে সম্প্রতি দুপুরে চুপি পরিদর্শনে যান, পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাঝি, সাংসদ সুনীলকুমার মণ্ডল, পূর্বস্থলী উত্তরের বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও সঙ্গে ছিলেন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ঝুমা তরফদার, পূর্বস্থলী ২ ব্লকের বিডিও পৌষালী চক্রবর্তী, মহকুমাশাসক শুভম আগরওয়াল-সহ বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা এই পর্যটনকে বৃহদাকার দিতে চাইছেন, যাতে হাজার হাজার মানুষ নিত্যদিন এসে এখানে সমস্ত ধরনের ব্যবস্থাপনা পান। তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তার প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া হচ্ছে। পরিকাঠামো তৈরি করা, এখানকার গোটা পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে কাটোয়া গামী যেকোনো লোকাল ট্রেনেই পূর্বস্থলী যাওয়া যায়। স্টেশন এর বাইরে থেকে টোটো নিয়ে পৌছে যেতে হবে এই চুপি চরে। শীতের আমেজ গায়ে মাখতে পরিয়ারী পাখিরা তো আসতে শুরু করেছে, আপনিই বা বসে থাকবেন কেন! এক-দুদিনের ছুটি কাটিয়ে এলে দেখবেন আনমনে গেয়ে উঠছেন, ‘বৈঠা জোরে বাওরে বন্ধু বৈঠা জোরে বাও/উজান গাঙ্গে তুফান ভারী টলমল টলমল নাও রে বন্ধু….।’
ছবি: প্রদ্যুৎ চৌধুরী

