জহরা পালের দুর্গাপুজোয় বাতাসা দিলে, জামাই আসে ঘরে!


“জহরা পালের দুর্গাপুজোয় বাতাসা দিলে, জামাই আসে ঘরে” – এমনটাই লোকবিশ্বাস উত্তর দিনাজপুর জেলার মাঝিয়ালি গ্রাম পঞ্চায়েতের নন্দকিশোরগঞ্জ এলাকায়। দেবীপক্ষের ঠিক আটদিন পর ফি বছর একদিনের দুর্গাপুজো (জহরা মেলা) অনুষ্ঠিত হয় উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া সংলগ্ন মাঝিয়ালী গ্রাম পঞ্চায়েতের নন্দকিশোরগঞ্জ এলাকায়। এ বছরও সে প্রথা মেনে এখানে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষ্যেই দুর্গামন্দির সংলগ্ন মাঠে পুজো শেষে তিনদিন ব্যাপী মেলার আনুষ্ঠানিকতাও শুরু হয়েছে এ অঞ্চলে।

পুজো উদ্যোক্তাদের একাংশের দাবি, জহরা মেলার মূল আকর্ষণ হল পুজো পরবর্তী একদিনের দুর্গা বন্দনা, সঙ্গে  উপরন্তু থাকে উৎসব প্রিয় বাঙালির গ্রামীণ মেলার ঐতিহ্য। আজও এ পুজোয় স্থানীয় আদিবাসী মানুষ, রাজবংশী জনজাতির মানুষ সহ, স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় নির্বিশেষে এই মেলার আনন্দে মেতে ওঠেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা তথা মেলার জিলিপি বিক্রেতা আব্দুল বকর। স্থানীয়দের পাশাপাশি দুর-দূরান্তের মানুষও আসেন এই মেলা পরিদর্শনে, এমনকি প্রতিবেশী রাজ্য বিহার-সহ, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকেও জনসমাগম হয় বলে জানা যায়। কিন্তু বর্তমান দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যস্থ রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে এ বছর এই অঞ্চলে কাঁটাতার পেরিয়ে দর্শনার্থী সমাগম প্রায় হয়নি বললেই চলে।

প্রত্যেক বছর পঞ্চায়েত সমিতির পক্ষ থেকে এ মেলার নিলাম হয়, গ্রাম্য ভাষায় যাকে ‘ডাক’ হওয়া বলে এবং সেই ডাকে যে পক্ষ সবথেকে বেশি পরিমাণ অর্থ ডাক হিসেবে দেন, সেই পক্ষই এই তিনদিন ব্যাপী মেলার ব্যবসায়িক চুক্তি ও নীতি নির্ধারণ ফোরামের প্রধান বলে বিবেচিত হন।

শতাব্দী পুরোনো এই মেলার জন্য অধীর আগ্রহে থাকেন জেলাবাসী সকলে। মেলা কমিটির সম্পাদক অজয় পাল বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এই পুজো ও মেলাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের বাড়িগুলোতে অতিথি সমাগম হয়। অতীতে এ অঞ্চলের বিবাহিত মেয়েরা জামাই-সহ মেলা উপলক্ষ্যে আসতেন বলে স্থানীয় মতে ‘জামাই মেলা’ নামেও প্রসিদ্ধ।” তিনি আরও জানান, এ ধারা আজও অব্যাহত। এমনকি তাঁর ঠাকুমার মুখে তিনি শৈশবে শুনেছেন যে জহর পালের দুর্গাপুজোয় বাতাসা দিলে জামাই আসে ঘরে।

কিন্তু এ দুর্গাপুজো হয় কোজাগরী পূর্ণিমারও পরে। একদিনের দুর্গাপুজোয় রীতি মেনে তিনবেলায় হয় তিনদিনের পুজো – যথাক্রমে ভোরে সপ্তমী পুজো, দুপুরে অষ্টমী পুজো, বিকেলে সন্ধিপুজো ও রাতে নবমীর পুজো। এখানকার মূর্তিতেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিগ্রহে দেবী দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ বাদেও রয়েছেন কালী, তারা, ভুবনেশ্বরী, গঙ্গা, জয়া, বিজয়া, নন্দী, বিশালক্ষী-সহ আরও আঠাশটি মূর্তি। স্থানীয় জনমানসে বিশ্বাস, জহর দুর্গা অত্যন্ত জাগ্রত দেবী। তাই একদিনের এই দুর্গাপুজোয় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার ধুম দেখার মতো হয়।

স্থানীয় এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক তথা পুজো কমিটির সদস্য সৈকত বসাক বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এবার এই পুজো ও ঐতিহ্যবাহী মেলা ১৩৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে, কথিত আছে দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের জমিদার জহর পাল তাঁর বিবাহিত কন্যাকে নিজের বাড়িতে নানা কারণে না নিয়ে আসতে পারার মনোকষ্ট থেকে অসুস্থ্ হয়ে গেলে, এক রাতে দেবী দুর্গা তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে জানান আগামীকাল ভোরবেলা দুর্গাপুজোর আয়োজন করলে, তাঁর মেয়ে জামাই-সহ ফিরে আসবেন, সেই থেকেই এই পুজোর সূচনা। তবে প্রথম তিন বছর নাকি মূর্তিতে নয় ঘটে ও পটে পুজো হয়েছিল বলে জানা যায়, আর জহর পালের নাম অনুসারেই এই মেলা ও পুজোর আয়োজন।”

প্রত্যেক বছর পঞ্চায়েত সমিতির পক্ষ থেকে এ মেলার নিলাম হয়, গ্রাম্য ভাষায় যাকে ‘ডাক’ হওয়া বলে এবং সেই ডাকে যে পক্ষ সবথেকে বেশি পরিমাণ অর্থ ডাক হিসেবে দেন, সেই পক্ষই এই তিনদিন ব্যাপী মেলার ব্যবসায়িক চুক্তি ও নীতি নির্ধারণ ফোরামের প্রধান বলে বিবেচিত হন। এ বছর এই ডাকের সর্বোচ্চ অর্থমূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়েছে। গ্রামীণ এই মেলাটির মূল আকর্ষণ মাটির অনবদ্য সব গয়না, তৈজস সামগ্রী এবং শাপলা ফুলের খই। এছাড়াও উত্তর দিনাজপুর জেলার গর্ব জিআই ট্যাগ প্রাপ্ত তুলাইপাঞ্জি চালের পসরা। মেলা উপলক্ষ্যে বর্তমানে এর সঙ্গেই থাকে রকমারি সান্ধ্য খাবারের দোকান, জিলিপি পাঁপড় ভাজা সহ, সাজ সামগ্রীর দোকানও। থাকে সান্ধ্য আড্ডা জমিয়ে দেওয়ার মতো গরম তেলেভাজা ও ঘুগনি।

মেলায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। পুজো ও মেলায় সেই সকল মানুষের জন্য জল, আলো, শৌচালয় এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও মেলা কমিটি। এ বছর মেলা প্রাঙ্গণের স্থায়ী দুর্গামণ্ডপের অনতিদূরে তিনটি টিউবয়েল বসানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মেলা পরিচালন কর্তৃপক্ষ। তবে কাজের খোঁজে এখন অনেকেই এই অঞ্চলের বাইরে বা অন্য রাজ্যে বসবাসরত। অসময়ের অনুষ্ঠানে ছুটি মেলাও দুষ্কর। তাই শহুরে আধুনিকতার ছোঁয়া পাওয়া আধুনিক প্রজন্মের কাছে কতদিন টিকে থাকবে এই সকল আটপৌরে গ্রাম্য ঐতিহ্য তা শুধু সময় বলবে।

Written by