
৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শতবর্ষীয় সিনেমা হিসেবে দেখানো হলো, নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের ক্লাসিক, ভারতীয়-জার্মান ছবি ‘প্রেম সন্ন্যাস’ (Light of Asia)। সেলুলয়েডের ইতিহাস এবং সেলুলয়েডে নথিবদ্ধ ভারতীয় ইতিহাস, দুই-ই আরও একবার ফিরে দেখার সুযোগ মিললো। এডউইন আর্নল্ডের লেখা বুদ্ধের জীবনকেন্দ্রিক কাব্য ‘লাইট অফ এশিয়া’ অবলম্বনে ১৯২৫ সালে তৈরি হয়েছিল ছবিটি। যুগ্মভাবে পরিচালনা করেছিলেন বাঙালি চলচ্চিত্রকার তথা উদ্যোগপতি হিমাংশুনাথ রায় ওরফে হিমাংশু রাই ও ফ্রানজ অস্টেন।

সেসময়ের ভারত কেমন ছিল, তা ধরা আছে এই ছবিতে। এ দেশের প্রাকৃতিক শোভা ও আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে তখন প্রতি শীতে বহু ইউরোপীয় পর্যটকরা এখানে বেড়াতে আসতেন। সিনেমাটি শুরুর প্রেক্ষাপটও তাই।
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ (অধুনা পাঠভবন) বিদ্যালয়ের প্রথম বছরের ছাত্রদলের একজন, ভারতীয় সিনেমার পুরোধা, ‘বম্বে টকিজ়’-এর প্রতিষ্ঠাতা – আজকের বলিউডের জন্মদাতা প্রথম পুরুষ হিমাংশু রাই সম্বন্ধে আলোচনাই হয় না। ‘প্রেম সন্ন্যাস’ ছবিটি সূত্রে আরও আকবার আলোকিত হলেন তিনি। শতবর্ষ আগে ছবির পুরো শুটিং হয়েছিল এই দেশে। সেসময়ের ভারত কেমন ছিল, তা ধরা আছে এই ছবিতে। এ দেশের প্রাকৃতিক শোভা ও আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে তখন প্রতি শীতে বহু ইউরোপীয় পর্যটকরা এখানে বেড়াতে আসতেন। সিনেমাটি শুরুর প্রেক্ষাপটও তাই।

ছবিটি শুরুই হয় ইউরোপীয় পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনি দিয়ে : দিল্লি, বেনারস, কলকাতা, জামা মসজিদ, সাপুড়েদের সাপের খেলা, রাস্তায় ভাল্লুকের নাচ, গরু ও ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে মোটর গাড়ির চলাচল …এইসব কিছু দেখতে দেখতে পর্যটকরা গিয়ে পৌঁছোন বিহারের গয়া (বোধগয়া) প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরে, যেখানে বুদ্ধ চল্লিশ দিন এবং চল্লিশ রাত ধরে একটি বোধিবৃক্ষের নীচে ধ্যান করার পর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। সেই বোধিবৃক্ষের নিচে বসে থাকা এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী কৌতূহলী পর্যটকদের রাজপুত্র গৌতমের গল্প শোনাতে শুরু করেন। ছবিতে এখান থেকেই দেখানো হয় বুদ্ধের জীবনচরিত…
জয়পুরের মহারাজা এই ছবিটি তৈরির সময় তাঁর সমগ্র রাজ্যের সবকিছুই প্রযোজনা দলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। হাতিঘোড়া, যানবাহন, পোশাক এমনকী নিজস্ব প্রাসাদ ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন।

এডউইন আর্নল্ডের লেখা বুদ্ধের জীবনকেন্দ্রিক কাব্য অবলম্বনে তৈরি এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন নিরঞ্জন পাল। ছবিতে যাঁরা যাঁরা মুখ্য চরিত্র অভিনয় করেছিলেন, প্রত্যেকেই ছিলেন হিমাংশু রাইয়ের নাট্যদল ‘ইন্ডিয়ান প্লেয়ার্স’ কোম্পানির সদস্য। এদেশে অভিনয়শিল্পে নবজাগরণ আনার লক্ষ্যে এঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের পেশা (কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল, কেউ ইঞ্জিনিয়ার) ছেড়ে ছিলেন। ছবিতে রাজা শুদ্ধোধনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সারদা উকিল এবং রানী মায়ার চরিত্রে ছিলেন রাণী বালা। দেবদত্ত-র ভূমিকায় ছিলেন প্রফুল্ল রায় ঘোষ। সিদ্ধার্থ গৌতমের ভূমিকায় অভিনয় করেন হিমাংশু রাই নিজে আর গোপা দেবীর ভূমিকায় ছিলেন সীতা দেবী। এটাই তাঁর প্রথম ছবি। তখন বয়স ছিল ১৬, নাম ছিল রেনে স্মিথ। তাঁকে খুঁজে বার করেছিলেন ফ্রানজ অস্টেন এবং পর্দার জন্যেই তাঁর নামকরণ হয় সীতা।

অবিভক্ত ভারতের লাহোরে হয়েছিল এই ছবির শুটিং। সেট ডেকরেশন করেছিলেন হিমাংশু রাইয়ের স্ত্রী এবং ভারতীয় ছবির কিংবদন্তি অভিনেত্রী দেবিকা রানি। পোশাক পরিকল্পনা করেছিলেন চারু রায়। চিত্রগ্রাহক জোসেফ উইরশিং। কোনও স্টুডিও সেট-আপ, কৃত্রিম আলো বা মেক-আপ ছাড়াই ছবির শুট হয়েছিল। এই ছবি তৈরির নেপথ্যে জয়পুরের মহারাজার অনেকখানি ভূমিকা ছিল। জয়পুরের মহারাজা এই ছবিটি তৈরির সময় তাঁর সমগ্র রাজ্যের সবকিছুই প্রযোজনা দলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। হাতিঘোড়া, যানবাহন, পোশাক এমনকী নিজস্ব প্রাসাদ ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যাঁরা এখনও ছবিটি দেখেননি, ইচ্ছে হলে অনলাইনে দেখে নিতে পারেন এই অমূল্য ক্লাসিকটি।
