
বছর ৬১। কৃষ্ণ মণ্ডল নিজের তৈরি কাঁচা মাটির, নীল রঙা ঘোড়া নিয়ে বসে আছেন পুণ্যার্থীদের অপেক্ষায়। সঙ্গে আছে লাল ও সাদা বাতাসা, নকুলদানা, লালসুতো, ধূপকাঠি, মোমবাতি। ছোটোবেলা থেকে শুরু করে আজ বার্ধক্যে পৌঁছেও, নিয়ম করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার তালডাঙার গাজী সাহেবের মেলা-য় অস্থায়ী দোকান দিয়ে বসেন তিনি। প্লাস্টিকের চাদর, বাঁশ, পুরনো প্লাইউড দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর অস্থায়ী দোকানে পুণ্যার্থীদের আসা-যাওয়া চলে। কৃষ্ণ মণ্ডলের মতো পরেশ হালদার (বয়স ৮০), তাপসী নিয়োগী, শ্যামসুন্দর পালেরাও কাঁচামাটির রঙিন ঘোড়া, বাতাসা, ঘোড়ার পিঠে বসা গাজী সাহেব, ধূপকাঠির প্যাকেট ও মোমবাতি নিয়ে বসে থাকেন পুণ্যার্থীদের অপেক্ষায়। বছরের পর বছর ধরে সম্প্রীতির এই ছবি দেখতে পাওয়া যায় তালডাঙার গাজী সাহেবের মেলা গাজী সাহেবের মেলায়।

মাজারের সামনে ধূপকাঠি মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে হিন্দু বধূ ও মুসলমান রমণীরা। মাজারের ঠিক পাশেই রয়েছে মা কালীর মন্দির। মাজারে পুজো দিয়ে সেই মন্দিরেও মানুষ ভক্তিসহকারে প্রণাম করে থাকে।
হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ ভক্তিভরে গাজী সাহেবের মাজারে ঘোড়া, বাতাসা দিয়ে পুজো দিয়ে যায়। এই পুজোয় কোনো মন্ত্রচারণ নেই। কোনো প্রকারের বিধি মানুষের এই মিলন উৎসবের সরলতাকে প্রতিহত করতে পারেনি। হিন্দু-মুসলমান মনের শ্রদ্ধা সহকারে সমবেতভাবে পয়লা মাঘের সকালে গাজী সাহেবের মাজারে পুজো দিয়ে যান। তাঁদের কাছে গাজী সাহেব হয়ে ওঠেন গাজীবাবা। প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পরম্পরা অব্যাহত রয়েছে।

কথিত রয়েছে যে, রক্তেশ্বর গাজী নামে এক চিকিৎসক হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলের চিকিৎসা করতেন। মূলত রক্ত আমাশা ও পেটের বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসা তিনি করতেন। ঘোড়ার পিঠে চড়ে রোগী দেখতে যেতেন। মৃত্যুর পরে তাঁর মাজারে সাধারণ মানুষ ঘোড়া-বাতাসা দিয়ে নিজেদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে যেত। আজও পয়লা মাঘের প্রথমদিন থেকে শুরু করে প্রথম সাতদিন বাবা রক্তেশ্বর গাজীর মাজারে মানুষ ভক্তিভরে নিজের মনস্কামনা ও শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে যায়। সাধারণ মানুষ নিজের সাধ্যমতো কখনো একটি কখনো জোড়া ঘোড়া দিয়ে মনস্কামনা জানিয়ে যায়। কথিত রয়েছে মনস্কামনা পূর্ণ হলে কাঁচামাটির ঘোড়ার পিঠে ছড়ি হাতে বসে থাকা গাজী বাবার ছলন মাজারে দেওয়া হয়। যার যেরকম আর্থিক সঙ্গতি সে তা দিয়েই রক্তেশ্বর গাজী বাবার পুজোর অর্ঘ্য কিনে মাজারে দিয়ে আসেন। অনেকেই কাঁচামাটির নীল ঘোড়ার পিঠে কাগজে লেখা মনস্ককামনা লাল সুতো দিয়ে পেঁচিয়ে গাজী বাবার মাজারে রেখে আসেন। সেই মনস্কামনার মধ্যে থাকে প্রাত্যহিক জীবনের অভাবপূরণের আর্তি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের জীবনধারনের মধ্যে থাকা অভাবের মধ্যে ঐক্য রয়েছে। আর সেই ঐক্যই উৎসবে পরিণত হয়েছে গাজীবাবার মাজারে।

মাজার চত্ত্বরে দুটি পুকুর রয়েছে, সেখানে স্নান করেও মানুষ পুজো দেয় মাজারে। অনেকে পুকুরে বাতাসা ফেলেও স্নান করে থাকে। এখানে আমিষ-নিরামিষের কোনো প্রকারের বিভেদ নেই। মানুষ ভালোবেসে গাজীবাবার উদ্দেশ্যে জ্যান্ত মুরগি ও হাঁস দিয়ে যায়। এমনকী রান্না করা হাঁস-মুরগির মাংসও গাজীবাবার উদ্দেশ্যে অর্পণ করা হয়। গাজীবাবার জয়ধ্বনি দিয়ে সমবেত ভক্তবৃন্দের উদ্দেশ্যে হরিলুটের অনুরূপ বাতাসাও ছোঁড়া হয়ে থাকে। মানুষ ভক্তিভরে মাটি থেকে সেই বাতাসা কুড়িয়ে নেয়। কালো রঙের চামর দিয়ে গাজী সাহেবের আশীর্বাদ সাধারণ মানুষের মাথায় অর্পণ করা হয়। মাজারের সামনে ধূপকাঠি মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে হিন্দু বধূ ও মুসলমান রমণীরা। মাজারের ঠিক পাশেই রয়েছে মা কালীর মন্দির। মাজারে পুজো দিয়ে সেই মন্দিরেও মানুষ ভক্তিসহকারে প্রণাম করে থাকে। ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার স্বতঃস্ফূর্তভাব অনুভব করা যায় তালডাঙার গাজী সাহেবের মেলা রক্তেশ্বর গাজীর মাজারে এসে। সকলপ্রকারের বিভেদ ঘুচিয়ে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ এই মাজারে নিজেদের ঐক্যকে খুঁজে পেয়েছে। অলৌকিকতার থেকেও বেশি জনগণের এই লৌকিক ঐক্য আজকের ঘৃণা ও হিংসায় জীর্ণ পৃথিবীতে আশার পথ দেখিয়ে চলে।
দেখতে পাওয়া যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার পোড়ামাটির খেলনা। লালরঙের পালকি, চাকা লাগানো ঘোড়া, মাটির খেলনাবাটি ও রানিপুতুল। বেতের ধামা, কুলো, কুনকে, পাখির খাঁচা-সহ বিভিন্ন প্রকারের আসবাবের পসরা বসে এই মেলায়।

অন্যদিকে, কাঁচামাটির নীলরঙের ঘোড়ার লোকজ শিল্পশৈলী গ্রামীণ বাংলার নান্দনিক রূপকেও প্রস্ফুটিত করে চলে। উঁচু গলা, কাঁচামাটির নির্মেদ নীলাভ শরীরে গোলাপী হলুদ ও কালো রংয়ের রেখাপাত করা হয়েছে। ঘোড়ার ঠোঁটের ওপর গোলাপি রং। কয়েকটি ক্ষেত্রে ঘোড়ার পিঠের উপর বসে রয়েছে হাতে টেপা কাঁচা মাটির নীলরঙা গাজী সাহেব। তার বিমূর্ত হাতের মধ্যে রয়েছে ছড়ি। গলা থেকে হাঁটু পর্যন্ত অন্য রং দিয়ে পোশাকের আদল দেওয়া হয়েছে। কখনও তার মুখের গঠন গোলাকার চ্যাপ্টা চাকতির মতো, কখনো বাস্তবধর্মীভাব আনার চেষ্টা করেছেন মৃৎশিল্পীরা। সেখানে গাজীবাবার মাথায় গোলাপি রং দিয়ে পাগড়ি তৈরি করা হয়েছে। কপালে লালটিকা। মুখে কালো দাড়ি। আবার কখনও গ্রামবাংলার টেপাপুতুলের মতো বিমূর্ত মুখের ভাব তৈরি করা হয়েছে। মাথায় দেওয়া হয়েছে পাখির পালক। শরীর জুড়ে অন্য রং দিয়ে পোশাকের বিন্যাস বোঝানো হয়েছে। আসলে মৃৎশিল্পীরা নিজের মনের ভাবনায় গাজীবাবার রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

এই উৎসবকে কেন্দ্র করে যে বিপুল মেলার আয়োজন করা হয়, সেখানেও দেখতে পাওয়া যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার পোড়ামাটির খেলনা। লালরঙের পালকি, চাকা লাগানো ঘোড়া, মাটির খেলনাবাটি ও রানিপুতুল। এছাড়াও এই মেলায় দেখতে পাওয়া যায় কাঁচামাটির রঙিন পুতুল। বেতের ধামা, কুলো, কুনকে, পাখির খাঁচা-সহ বিভিন্ন প্রকারের আসবাবের পসরা বসে এই মেলায়। কালের নিয়ম মেনে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এই মেলার গায়ে। এখন বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক নাগরদোলা সহ টয়ট্রেন, আধুনিক প্রসাধানী সামগ্রীও এই মেলায় দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে মহামিলনের মহৎ মঞ্চ হয়ে ওঠে তালডাঙার গাজী সাহেবের মেলা।
________
কৃতজ্ঞতা: লোকসংস্কৃতি গবেষক আকাশ বিশ্বাস
