ক্যাকটাস ব্যান্ডের সংগীত শিল্পী সিধু-র Exclusive সাক্ষাৎকার
মানুষের কিছু না কিছু হতে চাওয়া গুলো খুব অন্যরকম হয়। কেউ সহজ হতে চায়, কেউ মানুষ হতে চায়, আবার কেউ রোদ্দুর হতে চায়। এই চাওয়াগুলো না হয় হল যাপনকেন্দ্রিক চাওয়া, এরকম কোনো চাওয়া যদি হয় নিজের কেরিয়ারের ক্ষেত্রে, যদি ধরুন কেউ নিজের অধ্যাপনার পেশা ছেড়ে ছবি আঁকতে শুরু করলেন, বা ওকালতি ছেড়ে শুরু করলেন সিনেমা বানানো, কিংবা হয়তো ডাক্তারি ছেড়ে শুরু করলেন গান, ভাবুন তো, কেমন সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার হবে সেটি। ডাক্তারি ছেড়ে গান? এ-ও আবার হয় না কি? এমনই একটি গল্প শোনালেন ড. সিদ্ধার্থ শংকর রায় অর্থাৎ ক্যাকটাসের সিধু (Sidhu Cactus)।
পারিবারিকভাবে একটি কথা ছোটবেলা থেকেই সিধুর জীবনে স্থির হয়ে যায় যে তাঁকে বড়ো হয়ে ডাক্তার হতে হবে। এটি মূলত তাঁর মায়ের ইচ্ছে ছিল, কারণ ঘটনাচক্রে তাঁর স্বামী এবং বাবা দুজনেই ডাক্তার, সুতরাং তিনি চাইতেন তাঁর সন্তানও ডাক্তার হোক। ছোটোবেলা থেকেই সিধু দেখে এসেছেন বাড়ির সকলেই পড়াশোনায় খুব ভালো। মা, বাবা, তিন দিদি সকলেই। ঘটনাচক্রে সিধুও পড়াশোনায় ভালোই ছিলেন, অর্থাৎ সামগ্রিক চিত্র এবং পরিস্থিতি গোটাটাই তাঁকে প্রায় প্রথম থেকেই নিয়ে চলেছিল ডাক্তার হওয়ার দিকে। বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিধু বলছেন, “পড়াশোনা বা ডাক্তার হওয়ায় আমার যে অপছন্দের কিছু ছিল তা নয়, কিন্তু নিজে ভাবার কোনো অপশন ছিল না। গোটা ঘটনাটা সেভাবেই হল, জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হলাম।”
তবে ছোটোবেলা থেকেই সিধুর বড়ো হবার মধ্যে মিশেছিল সংগীত। গান মিশেছিল তাঁর পরিবারে। বাবা ভায়োলিন বাজাতেন, তিন দিদি, মা সবাই ভালো গান গাইতেন। তবে কেউই গান নিয়ে পেশাগত ক্ষেত্রে এগোননি। গান থেমে গিয়েছিল নিজস্ব আসরে, পারিবারিক আড্ডায়। এর বেশি তাঁরা কোনোদিনও গান নিয়ে অনুষ্ঠান বা এই জাতীয় কিছু করেননি। পরিবারের সকলের সংগীত প্রীতি থাকা সত্ত্বেও সেটাকে অনুষ্ঠানের মঞ্চে না নিয়ে যাওয়া নিয়ে সিধুর মনে একটু মৃদু আক্ষেপও যে ছিল না তা নয়।

ক্যাকটাস-এর পথচলা শুরু হওয়া সিধু যখন ডাক্তারি পড়ছেন। ততদিনে বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি হয়ে গেছেন ডাক্তারিতে, ক্যালক্যাটা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, ১৯৮৯ সালে। ৯২-তে ক্যাকটাস তৈরি করলেন। বাড়িতে বিভিন্ন রকম গান হত, শুনতেন। প্রচুর রেডিও চলতো বাড়িতে, প্রায় ১৬/১৭ ঘণ্টা রেডিও চলতো। বিভিন্নরকম গান শুনে তাঁরও গানের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। কিন্তু গান শেখা হয়নি কখনও। পরবর্তী কালে, বিশেষ করে কলেজ জীবনে প্রবেশের পর যখন রক সংগীতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হল, তখন তাঁর মনে হল যে রবীন্দ্রসংগীত, গজল, পুরোনো হিন্দি গান, বাংলা লোকগান ভালো লাগলেও তাঁর একান্ত আপন হয়ে উঠছে রক সংগীত। এতটাই একাত্মবোধ করেছিলেন। তবে ইংরেজি রক শুনে একটা ভাষার ব্যবধান প্রথমে ব্যক্তিগত ভাবে অনুভব করেছিলেন অবশ্যই। গানের সব কথা বুঝতে না পারা ছিল তার অন্যতম কারণ। ইন্টারনেটের অবর্তমানে তখন উপায় ছিল না ডাউনলোড করে নেওয়ার। এ কথা প্রায় ১৯৯২ সালের। কাজেই কথা পুরোটা বুঝতে না পারা বা যতটুকু বুঝতে পারা যাচ্ছে তার যথাযথ অর্থ কী বা কোন পটভূমিকা থেকে সেই গানটা লেখা হয়েছে বুঝতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তখনই সিধুর মনে হয়েছিল যে এরকম যদি বাংলায় হয় তাহলে তার সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারা অনেক সুবিধাজনক হবে। সিধু বুঝতে পারেন এটা শুধু তাঁর একার ব্যক্তিগত সমস্যা না, ৯৫ শতাংশ ছেলেমেয়ে, বন্ধু যারা ইংরেজি রক মিউজিক শোনে তাদের সকলেরই সমস্যা। সেই জায়গা থেকেই বাংলা রক করার শুরু।
সিধু বলেন, “আমার পক্ষে হাসপাতালে পিডিটি হিসেবে থেকে মাসে ৬ থেকে ৮টা শো করা অত্যন্ত কঠিন হতে থাকলো। শোয়ের অনেকগুলোই কলকাতার বাইরে। সেই দিনগুলো হাসপাতালে ডিউটি করা হত না। কলকাতার শো হলে বেলা ৪টে পর্যন্ত ডিউটি করে শো-তে চলে যেতাম। একদিকে সংগীত, অন্যদিকে হাসপাতাল।”
“আমার তখন একইসঙ্গে মেডিকেলে পড়া ও ব্যান্ড করা দুই-ই চলছে। এরপর ডাক্তারি পাশ, ইন্টারশিপ, তার জন্য যা ট্রেনিং দরকার সব চলতে লাগলো। টাকাপয়সার দরকারে এক প্রাইভেট নার্সিং হোম জয়েন করি জুনিয়র ডক্টর হিসেবে। সেখানে বছর খানেক চাকরি করে কিছুটা সেভিংস হল। এরপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন। DNB ইন্টারনাল মেডিসিন, সেটার পার্ট ওয়ান বা এন্ট্রাস ক্লিয়ার করে মেডিসিনে মাস্টার্স ডিগ্রি করতে শিয়ালদহ বিআরসিং হাসতাপালে কাজ নিলাম। ২০০০ সালের কথা।” বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলছিলেন সিধু।
ততদিনে ক্যাকটাসের প্রথম অ্যালবাম (ক্যাকটাস/ এইচএমভি/ ১৯৯৯) মুক্তি পেয়েছে। এবার হঠাৎ করে একদিন ‘নীল নির্জনে’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ এল ২০০১-এ। ২০০২ সাল নাগাদ ছবি মুক্তি পাওয়ার পর পরই শ্রোতামহলে সাড়া ফেলে দিল নীল নির্জনের গান। ক্যাকটাসের জনপ্রিয়তা রাতারাতি বেড়ে গেল। হাতে শো এল অনেক। সিধু বলেন, “আমার পক্ষে হাসপাতালে পিডিটি হিসেবে থেকে মাসে ৬ থেকে ৮টা শো করা অত্যন্ত কঠিন হতে থাকলো। শোয়ের অনেকগুলোই কলকাতার বাইরে। সেই দিনগুলো হাসপাতালে ডিউটি করা হত না। কলকাতার শো হলে বেলা ৪টে পর্যন্ত ডিউটি করে শো-তে চলে যেতাম। একদিকে সংগীত, অন্যদিকে হাসপাতাল। তখনও অবধি মনে হত ডাক্তারি আমার পেশা এবং সংগীত আমার নেশা। বিগত ১১ বছর ধরে দুই জগৎ সমান তালে সামলাচ্ছিলাম।” সিধুর মতে, দুটোই সমান্তরালভাবে চলেছে রেলগাড়ির মতো। দুই ভিন্ন জগৎ ক্রমশ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময়ের গান – হায় উড়ানের গান, হায় শিকড়ের টান। ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা যদি ফুরায় প্রয়োজন…’ – পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা যেন তাঁর ডাক্তার জীবন। সিধু বলেন, “উড়ানের গান হল আমার সংগীত আর শিকড়ের টান ডাক্তারির জীবন।”
_____
ক্যাকটাস বাংলা ব্যান্ড-এর অন্যতম প্রধান সংগীত শিল্পী সিধু-র সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা