বৃষ্টি আসবেই

নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার বদল এবং উত্তরণ স্পষ্ট রাত্রি চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে

আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায় ওই এক মেঘের মত মানুষ
ওর গায়ে টোকা দিলে জল ঝরে পড়বে বলে মনে হয়

আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায় ওই এক মেঘের মত মানুষ
ওর কাছে গিয়ে বসলে ছায়া নেমে আসবে মনে হয়

ও দেবে, না নেবে? ও কি আশ্রয়, না কি আশ্রয় চায়?
আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায় ওই এক মেঘের মত মানুষ

ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আমিও হয়তো কোনোদিন
হতে পারি মেঘ!          
(শঙ্খ ঘোষ)

এই টুকু, কেবল এই টুকুই তো হতে পারে একটা নাট্য দর্শনের প্রতিক্রিয়া। এবং এতেই ছুঁয়ে থাকা যাবে নাটকটির দর্শন ও। না, কোনো গভীর তত্ত্বমূলকতা নয় বরং চির চেনা ভাববাদী দর্শনের ভাবের বীজ পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে উড়ে এসেছে। ফিলাডেলফিয়ার মানুষ ন্যাস ষাট বছর আগে লিখেছিলেন বৃষ্টিওলার গল্পটা। আর সেই গল্প, সেই স্বপ্ন দেখার গল্প, বিশ্বাসের গল্প আমরা ভারতীয়রা নানা মাধ্যমে গ্রহণ করেছি বেশ কয়েকবার। এবার শান্তিপুর সাংস্কৃতিকের হাত ছুঁয়ে এ উপহার গ্রহণ।

প্রচণ্ড দাবদাহ। ফসলের ক্ষেত জ্বলে গেছে। ফার্মের হাঁস মুরগী মরতে বসেছে। এমন সময় ভোরের স্বপ্নে মায়া দেখে তুমুল শিলাবৃষ্টি। ভোরের স্বপ্ন না কি সত্যি হয়। সমু তাই ভাবে। দিদিকে নিয়ে আশিরনখ ভিজতে চায় সে। কিন্তু বৃষ্টি কই! বৃষ্টির বদলে আসে এক মানুষ। অহংকারী। উদাসীন। কবে মায়াকে হয়তো কথা দিয়েছিল বিয়ে করার কিন্তু কালো মেয়েকে বিয়ে করে উঠতে পারে নি। আবার ভুলে যেতেও  পারে নি। ফিরে এসেছে হয়তো এই আশায় নেহাত যদি মায়া পীড়াপীড়ি করে তবে পালন করবে ত্রাতার ভূমিকা।  মায়া ক্লান্ত, বিষণ্ণ। ফুটিফাটা মাটির চেয়েও বিদীর্ণ তার হিয়া। গ্রীষ্ম প্রকৃ্তির চেয়েও রুক্ষ তার মেজাজ। সুন্দরের কোনো চিহ্ন যেন নেই ত্রিসীমানায়। নাই রস নাই।

আমাদের আজীবনের খোঁজ তার জন্য যে আমার আবরণ ভেদ করে সেই আমিকে বার করে আনবে যে আমি সুন্দর। গোলাপের দিকে চেয়ে সুন্দর বললে তবে তো গোলাপ সুন্দর হবে! সৌন্দর্য তো দ্রষ্টার দৃষ্টিতে। সৌন্দর্য তো বিশ্বাসীর বিশ্বাসে। তাই বৃষ্টি এনে দেবো, যেমন চাই তেমন বৃষ্টি এনে দেবো পারিশ্রমিকের বিনিময়ে – একথা বিশ্বাস করতে চায়না কেউ প্রথমে। তারপর আস্তে আস্তে একটি দুটি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে। বৃষ্টি এনে দেওয়া বরুণকুমারকে বিশ্বাস করে, নাকি নিজের নিজের বিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করে! স্বাভাবিকভাবেই মায়া সবচেয়ে অসহিষ্ণু বিশ্বাস – অবিশ্বাসের এই খেলায়। প্রকৃতিতে যেমন নির্দিষ্ট সময় আছে, প্রস্তুতি আছে; সঠিক উপাদান – পরিবেশ ছাড়া ঝরে পড়বার উপায় নেই! মানুষেরও তো তেমন। সঠিক সংস্পর্শ ছাড়া বর্ষণের অধিকারকই! সেটি বরুণ জুগিয়ে দেয়। তার হাতে আছে জাদুদণ্ড। দ্বিমুখী। একমুখে বিশ্বাস। অপরটায় ভালোবাসা হয়তো। বিশ্বাস আত্মবিশ্বাস জাগানিয়া আর রতি জাগিয়ে দেয় প্রথমে আত্মরতি ক্রমে আরতিকে। তাই যখন বৃষ্টি নামল, যখন বরুণ চলে গেল তখন বরুণের জন্য বিরহ বা অভাববোধ নয় এই প্রশ্নটাই মূর্ত হয়…  বরুণ আদৌ এসেছিল কি?

আমাদের নিরন্তর খোঁজ বাইরের দিকে, এমন মানুষের দিকে যে আমাদের চোখের মণিতে মেঘ জমতে দেখবে,  বৃষ্টির আশ্বাস জোগাবে। কিন্তু যদি জাদুদণ্ডটির মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া যায় নিজের দিকে তবে এক ভিন্নতর অনুভবের শরীকী মিলবে। আত্মানুসন্ধানে মিলবে আত্মবিশ্বাস – আত্মসৌন্দর্য। আসলে সকলের মনের ভেতরকার অবচেতন, বিশ্বাস করতে চাওয়া কিন্তু বিশ্বাস করতে না পারা মনগুলি জুড়ে জুড়ে বৃষ্টি তৈরি করা লোকটিকে তৈরি করে তারা। তাই বরুণ মায়াকে দিয়ে যায় তার জাদুকাঠিটি। অন্য কোথাও বৃষ্টি আনার কাজে লাগানোর জন্য। মায়া পারবে। কারণ অবিশ্বাসের বাঁকগুলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার বিশ্বাস খুঁজে পাওয়া। তাই এ বিশ্বাসের জোর অনেক বেশি। মায়া মুক্ত হয় দৈনন্দিন তুচ্ছতার অপমান থেকে, মুক্ত করে একদা প্রেমিক সুশান্তকে তার কথা রাখতে না পারার দীনতা থেকে। কারণ ততক্ষণে ভারী ব্যাপক বৃষ্টি ঝরতে শুরু করেছে তার বুকের মাঝে । আত্মবিশ্বাস জন্ম দিয়েছে উদারতার। আরম্ভ হয়েছে বৃষ্টি। বিশ্বাসের বৃষ্টি,  ভরসার বৃষ্টি।

নাট্যসমালোচনার প্রথা মেনে এবার লিখে ফেলতে হয় চাট্টি প্রথাগত কথা। যেমন অভিনয় চমৎকার। আলো যথাযথ। সঙ্গীত অনবদ্য। মঞ্চ চলনসই। থিয়েটার কর্মীরা ক্রমাগত সহনশীলতার পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত, অবসন্ন। তাই বোধহয় নাট্যসমালোচনা বিষয়টি বাজারে চালু আছে আর ক্রিটিকরা মার খান না। না কি নাট্যকর্মীরাই চান যেন তেন প্রকারেণ প্রশংসা, বড় – মেজ – সেজ ছোটো সব কাগজে। তার জন্য অনেক আয়াসও তাঁরা স্বীকার করে থাকেন, এহো বাহ্য।

এ নাট্যকাহিনীতে চারপাশের বাস্তবকে অতিক্রম করে যাওয়ার উপাদান অনেক ছিল। কোথাও একটা জাদুকরী ছোঁয়ায় দর্শককে মুগ্ধ এবং সংশয়াবিষ্ট করার অবকাশ ছিল। নাটককে নাট্যে রূপান্তরিত করতে যে সব অস্ত্র শস্ত্র ব্যবহৃত হয় তার কোনোটাই এই কুহকতার খোঁজ করলো না। সূচনা সংগীতে দুটি রবীন্দ্রগানের মিশ্রণে যে ম্যাজিকটা শুরু হল তা গোটা নাটকে হারিয়ে আবার ফিরে এল শেষবেলায় ড্রামের শব্দে। বোঝা গেল, নিশ্চিত সুযোগ ছিল। সদব্যবহার হইল না। মঞ্চ একেবারেই বাস্তব অনুসারী, এখানে ঘর মানে ঘর, দরজা মানে দরজা, গাছ মানে গাছ ই। খরায় জ্বলে যাওয়া পাতাগুলি বৃষ্টিতে সবুজ হল সেটা অমন চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে তো আঁচল দিয়ে ঘরে রাখা নকল শুকনো ফুল পাতা পরিষ্কারের সূক্ষ্মতা ফিকে হয়ে যায়! মঞ্চে মায়া তৈরী হয়েছে মায়ার অভিনয়ে বারবার। চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে রাগ, দুঃখ, হতাশা, অপমান, অবিশ্বাস … প্রতিটি অনুভুতি। নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার বদল এবং উত্তরণ স্পষ্ট রাত্রি চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে। উজান চট্টোপাধ্যায়(সমু) এবং কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের(বরুণ) চরিত্রায়নে যে এনার্জি আর বিশ্বস্ততা ছিল তা সহজেই নির্মাণ করেছে একাধিক নাট্যমুহূর্ত। সমুর প্রশ্নাতীত সততা ও সারল্যর  বিপ্রতীপে বরুণকে ক্রমাগত প্রমাণ করতে হয়েছে যে সে সৎ, সে সত্যিই বৃষ্টি আনতে পারবে। একটু একটু করে জমি দখল করার মতো করে ধাপে ধাপে এগিয়েছে বরুণ। উন্মোচিত হয়েছে তার অন্তঃস্থল। দৃশ্যত মায়ার উদ্দেশ্যে তার ‘হ্যাটস অফ’ বরুণের জার্নিকে এ নাট্যে সমাপ্ত করেছে, এগিয়ে দিয়েছে পরের জার্নিতে, যেখানে বৃষ্টি নামবে এবার ।।

Developed by DXDasia