বিরাটই ব্র্যান্ড, আর ক্রিকেট বিনোদনে ব্র্যান্ডই শেষ কথা

বাজারের সামনে নতি স্বীকার করা ছাড়া বাঁচার রাস্তা নেই ক্রিকেটের

গত বছর ২৩ জুন বিরাট কোহলি একটা ট্যুইট করেছিলেন। অনিল কুম্বলেকে কোচ হিসাবে স্বাগত জানিয়ে তিনি একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন তাতে। একটা স্মাইলিও যোগ করেছিলেন। এখন সেই ট্যুইটটা তুলে নিয়েছেন বিরাট। ভালই করেছেন। মিথ্যার আশ্রয় নিতে নেই। কোচকে পদচ্যুত করার আনন্দের সময় কোনও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে চান না ভারতের অধিনায়ক। এটা তাঁর চরিত্রের একটা দিক তুলে ধরেছে। কারণ, এমন সময়ে তিনি এই কাজটা করেছেন যখন সমস্ত দিকপালেরা তাঁর সমালোচনায় মুখর। সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের একটা বড় অংশও কুম্বলের বিদায়ে ব্যথিত। কেউ কেউ বিভ্রান্ত।

আসলে কেউ কেউ নয়, সকলেই বিভ্রান্ত। বিভ্রান্তির একটা বড় কারণ, আজকের ক্রিকেট সম্পর্কে ধারণার অস্বচ্ছতা। ওটা যতটা না খেলা, তার চেয়েও বেশি বিনোদন–শিল্প। সেই কবে কেরি ফ্রান্সিস বুলমোর প্যাকার নামের একজন অস্ট্রেলিয় ধনকুবের এই সহজ সরল সত্যটা বুঝেছিলেন। তিনি ষাট ওভারের লিমিটেড ক্রিকেট শুরু করেন। তখন টেস্ট ক্রিকেটের যুগ। নাইন নেটওয়ার্ক নামের একটি টিভি কোম্পানি, সেটাও প্যাকারেরই সংস্থা, ওয়ার্ল্ড সিরিজ নাম দিয়ে খেলাটা শুরু করে ১৯৭৭ সালে। তখন কী রাগ সব দেশের ক্রিকেট কর্তাদের। কিন্তু প্যাকার খুব ভাল করেই জানতেন তিনি কী করছেন। ধ্রুপদী ঘরানার টেস্ট খেলাটা ছিল স্বচ্ছ, কিন্তু খেলোয়াড়েরা খুব একটা টাকা পেতেন না। উৎসাহী ও বোদ্ধাদের সংখ্যাও ছিল কম। প্যাকার সেটাকে বাজার–উপযোগী করে তুললেন। টনি গ্রেগের নেতৃত্বে নানা দেশের খেলোয়াড়েরা যোগ দিলেন তাঁর টুর্নামেন্টে। তাঁদের বাদ দিয়ে দিল জাতীয় সংস্থাগুলো। তারা বলেছিল প্যাকার যেটা করছেন সেটা ‘সার্কাস’। তারপর ধীরে ধীরে কী ঘটল, সকলেরই জানা। আজ টেস্ট ক্রিকেট অর্ধমৃত, রমরম করে চলছে সার্কাস। ষাট ওভার কমে পঞ্চাশ হয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুপার সার্কাস টি–২০।

অন্য কোনও খেলা এভাবে বাজারের দাবির সামনে নতি স্বীকার করেনি। কিন্তু এভাবে ছাড়া বাঁচার অন্য কোনও রাস্তা নেই ক্রিকেটের। একেই তো খেলে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটা দেশ। তার মধ্যে ভারত ছাড়া কারও কাছে টাকা নেই। এই উপমহাদেশ বাদে অন্য কোথাও খেলাটা নিয়ে উন্মাদনা দূরের কথা, মাতামাতিও নেই। ভারতে বাঁচলে তবেই ক্রিকেট বাঁচবে। আর ভারতে বাঁচবে স্পনসর পেলে, বিজ্ঞাপন পেলে। স্পনসরেরা খেলোয়াড় খোঁজেন না, ব্র্যান্ড খোঁজেন, যাঁদের বিক্রি করা যায়। তবেই টাকা ঢালেন তাঁরা। খেলার মান বড় কথা নয়, হিরো তৈরি করা বড় কথা। যে হিরোরা ব্র্যান্ড হয়ে উঠবে। ঠিক যেমন ভাল সিনেমা তৈরি করাটা বড় কথা নয়, হিট সিনেমা তৈরি করাটা লক্ষ্য।

কাজেই সুনীল গাভাসকার, বিষেন সিং বেদিরা কী বললেন, তাতে কার কী এসে যায়? তাঁরা ব্রান্ড নয়। পুরনো চিত্রতারকারা যাঁরা আর এখন সিনেমা করেন না তাঁরা আজকের সিনেমার ঘরোয়া বিবাদ নিয়ে কী বললেন, তাতে কার কী এসে যায়? তাঁদের মুখ বিক্রি করা যায় না। ঠিক তেমনই অনিল কুম্বলে তো মাঠে নেমে খেলবেন না। তিনি ব্র্যান্ড নয়। কোহলির পারফরমেন্স বিক্রি করা যায়। আড়ালে থেকে কুম্বলের পরামর্শ কার খেলার কী উন্নতি করল, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। বিরাট যতক্ষণ টিমকে জেতাবেন, ততক্ষণ তিনিই রাজা। এইটাই অনেকদিন ধরে ঘটে আসছে। কপিল দেবকে ২০০০ সালে এভাবেই সরে যেতে হয়েছিল তখনকার ক্যাপ্টেন শচীন তেন্ডুলকার তাঁকে চাননি বলে। ক্রিকেট সাংবাদিকেরা বলছেন, তখন অনিল কুম্বলে ছিলেন শচীনের সঙ্গে। আজও শচীন আছেন কুম্বলের সঙ্গে। কিন্তু তাঁরা আর খেলেন না। তাঁদের বাজারদর পড়ে গেছে। এই সরল সত্যিটা পুরনোরা বুঝতে পারছেন না।

প্যাকারের সময় কোনও ভারতীয় তাঁর সঙ্গে যোগ দেননি। ডাক পেয়েও যাননি গাভাসকার। কারণ, ভারত তখনও বাজারসম্মত ছিল না। অর্থনীতি ছিল নানা গন্ডিতে বাঁধা। ভারতের হয়ে খেলাটা ছিল সম্মানের বিষয়, গর্বের বিষয়। টাকার জন্য সেই গর্ব বিসর্জন দিতে রাজি ছিলেন না গাভাসকার। গত আড়াই দশকে ধীরে ধীরে সেই জাতীয়তাবাদী চিন্তা দেশের আরও অনেক মানুষের মতো খেলোয়াড়দের কাছেও ‘ফালতু’ হয়ে গেয়েছে। নরসিংহ রাওয়ের নয়া অর্থনীতির পথ ধীরে ধীরে দেশকে সমৃদ্ধ করেছে, অর্থনীতির আয়তন বহুগুন বাড়িয়েছে, সরকারের কোষাগারে এত অর্থ এনেছে যা দিয়ে গরিব মানুষের জন্য হাজারো প্রকল্প নেওয়া যায়, এবং ভারতকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু তার পাশাপাশি ঘটেছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। করফাঁকি, দুর্নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাভাবিক ঘটনা। ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের রমরমা হয়েছে। আর সেই সময়ের ফসল আজকের ক্রিকেট। যতই গড়াপেটা হোক, মানুষ ভিড় করবেই। কারণ, এ তো বিনোদন। আর বিনোদন তো বিনোদনের মতোই চলবে।

অভিনব বিন্দ্রা বলেছেন, ঘৃণা করেন এমন এক কোচের অধীনে কুড়ি বছর কাটিয়েছেন তিনি। তিনি তো ক্রীড়াবিদ। তাই গুলিয়ে ফেলেছেন। খেলার অছিলায় বিনোদনের চরিত্র বুঝতে পারেননি।

Developed by DXDasia