
১। দূরবীনের হাত, হাতের দূরবীন
সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তথ্য আর কালিক-স্মৃতিকে জুড়ে নেওয়ার একটি পরিভাষা আছে, ইথনোগ্রাফি। মানুষের ইতিহাস, অবস্থান এবং সেগুলিকে জুড়ে নিতে নিতে তৈরি হয় আখ্যান, সেই আখ্যান মূলত বিশ্লেষণের, বাইরে থেকে অবজেক্টিভ ভাবে দেখে নেওয়ার। অন্তত পশ্চিমের সমাজতাত্ত্বিকদের (এবং ‘আগন্তুক’ ছবির বিখ্যাত সেই সংলাপে) ‘ফিল্ড নোটস’ ট্র্যাডিশন একেই মান্যতা দিয়ে এসেছে। তাই অধ্যাপক এম.এন. শ্রীনিবাস যখন ভারতীয় সমাজতত্ত্বের সামনে নিয়ে এলেন তাঁর আকর-গ্রন্থ, ‘দ্য ভিলেজ রিমেমবারড’, তা একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করে দিল। সে লেখায় ‘রামপুরা’ গ্রামের কল্পিত ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে জাতপাতের স্থানিক চিত্রকে বুঝতে থাকার পরিকল্পনাটি এমনই ছিল যে সেই লেখা একই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল তাঁর ‘নিজের দেখার’ এবং ‘দেখার মধ্য দিয়ে বুঝে নেওয়ার’ দুটির এক অদ্ভুত সমন্বয়। এই ধারাকে আরেকটু এগিয়ে দিলেন, আরেক সমাজতত্ত্ববিদ, অরবিন্ধ দাস, লিখে ফেললেন নিজের গ্রামেরই জীবনী, ‘চেঙ্গেল’। স্থানের ইতিহাস, নিজেরও। সাহিত্যিকের হাতে যখন উঠে আসে সেই লেখার উপাদান, তা-ও একরকম ‘কালিক-স্থানিক’ ইতিহাস। কিন্তু তাতে চরিত্র আর কথক একসঙ্গে এগিয়ে চলতে থাকে, কাহিনিটি সেখানে মুখ্য। যেমনটি আমরা দেখেছি শঙ্খ ঘোষের ‘সুপুরিবনের সারি’ কিংবা ‘শহরপথের ধুলো’-র আত্ম-জৈবনিক উপাদানের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কালিক ইতিহাসের ভিতরে ফুটে ওঠা রিফিউজি পরিবারের একটি ছেলের চোখের দেখায়। হাংরাসে যেমন দেখেছি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক আত্মজীবনের সঙ্গে সাহিত্যিক উপাখ্যানকে জুড়ে নিতে। অর্থাৎ একাডেমিকের দূরবীনের মধ্য-দিয়ে একটি দৃশ্যকে কিংবা মানুষকে-সমাজকে বুঝে নিতে চাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা, তাতে ভার থাকে বেশি। আর সাহিত্যিকের হাতের দূরবীনখানি আলগোছে নামিয়ে রেখে, খানিক অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে থাকায় জুড়ে যায়, নিজের হাতখানিও। একটি গ্রন্থ আলোচনা করতে গিয়ে কেন অবতারণা করছি এতগুলি লেখার?

বাংলায় মেমোয়ার (স্মৃতিকথন)-ইথনোগ্রাফির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম একটি বিরল কাজ এটি, আজ পনেরো বছরের বেশি পেরিয়েও (বইটির প্রথম প্রকাশ ২০০৯)। সেই মায়া-দূরবীনে চোখ দিয়ে তিনি তাকিয়ে রয়েছেন আম-বাঙালির প্রিয়তম দার্জিলিং-এর দিকে আর কখনও দূরবীন নামিয়ে রাখা হাতে পাঠককে হাত ধরে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন ‘অন্য এক দার্জিলিঙের’ দিকে।
কারণ এটুকুই, লেখক পরিমল ভট্টাচার্য, তাঁর দার্জিলিং (Darjeeling by Parimal Bhattacharya) বইতে একত্র করেছেন এই হাতের দূরবীন আর দূরবীনের হাতকে। বাংলায় মেমোয়ার (স্মৃতিকথন)-ইথনোগ্রাফির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম একটি বিরল কাজ এটি, আজ পনেরো বছরের বেশি পেরিয়েও (বইটির প্রথম প্রকাশ ২০০৯)। সেই মায়া-দূরবীনে চোখ দিয়ে তিনি তাকিয়ে রয়েছেন আম-বাঙালির প্রিয়তম দার্জিলিং-এর দিকে আর কখনও দূরবীন নামিয়ে রাখা হাতে পাঠককে হাত ধরে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন ‘অন্য এক দার্জিলিঙের’ দিকে। সেই অন্য দার্জিলিং কিন্তু পর্যটকের ‘ফাইভ পয়েন্ট’, ‘সেভেন পয়েন্ট’, কেভেন্টার্স, কিংবা কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার ‘অবজারভেটারি হিলের’ মেদুর দার্জিলিং নয়। ভিড়ের থেকে একটু একটু ক’রে তিনি দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন তাঁর দূরবীনকে। সেই দূরবীনের কাচ কখনও পালটে যাচ্ছে গবেষণার আতসকাচে, সাহিত্যের অধ্যাপক তুলে নিচ্ছেন আরকাইভাল এক দায়িত্ব, লিখছেন দার্জিলিং গড়ে ওঠার ইতিহাস, ব্রিটিশ পরিকল্পনার আর দেশজ কুলি-কামিনের পরিশ্রমের ইতিহাস। আবার কখনও সেই কাচ হয়ে উঠছে কিশোরের হাতের ক্যালাইডোস্কোপে। নানান নকশা ফুটে উঠছে লোকায়ত লেপচা-গোরখা-তিব্বতি মানুষের তির্যক কঠিন জীবনের এবং যাপনের, পার্বত্য ভূ-প্রকৃতির জলের হাহাকারে, আর বহু জটিল চরিত্রের আর ঘটনার অবিরাম বর্ণনায়। সে বর্ণনায় তিনি নিজেও উপস্থিত। তাঁর ঠাকুরদার ব্রিটিশদের প্রতি এবং ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি মৃদু-হাসির ভঙ্গিতে তাকিয়ে, এক করুণ বহিরাগত সদ্য-তরুণ ইংরেজির অধ্যাপক ধীরে ধীরে, দার্জিলিঙের আপন হয়ে উঠছেন। দূরবীনের কাচে কুয়াশা লেগে যাচ্ছে পাহাড়ের আর ঘসা কাচের ঝাপসা আলোয়, জন্ম নিচ্ছে আখ্যান। পরিমল ভট্টাচার্যের দার্জিলিং – স্মৃতি-সমাজ-ইতিহাসের আখ্যান।

২। চোরাবাটোর চরিত্ররা : লোকজ ইতিহাস থেকে ব্যক্তি ইতিহাস
এই বইয়ের মূল অধ্যায় পাঁচটি এবং দুটি সংযোজন অধ্যায়। ভূমিকাটিকেও একটি আলাদা অধ্যায় রূপে দেখা যায়, সেখানেই তিনি দার্জিলিং-এর আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং বারোমাস পত্রিকাকে জুড়ে নিয়েছেন কৃতজ্ঞতায়। এই কৃতজ্ঞতার একটি সূত্র আছে, বারোমাসের সঙ্গে যুক্ত অশোক সেন, বামফ্রন্টের শেষ আমলে এসে, পার্টিজান রাজনীতির বাইরে একটি বৃহত্তর ‘পরিবৃত্ত’ খুঁজছেন সেই সময়। এই লেখার শুরুর ২০০৭ সাল তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই ইথনো-মেমোয়ার-এর মূল চরিত্র যদিও একটিই। দার্জিলিং-এর রাস্তা। স্থানীয় নামে ‘চোরাবাটো’। যে রাস্তা ঘুরে ঘুরে উঠেছে নেমেছে পাহাড়কে ঘিরে। ‘কসাইখানার ভোরে’র তরুণ অধ্যাপক যখন বাসা পালটে ‘স্যালামান্ডারল্যান্ড’ অধ্যায়ে এসে খুঁজে নিচ্ছেন লেপচা ভাষায় কার্শিয়ং, রঙ্গিতের, স্থানিক অর্থকে, তখন থেকে এই বইয়ের চলন আর একজন বহিরাগতের নয়। তখন থেকে দার্জিলিংকে তিনি আদরের কুয়াশায় বারবার প্রশ্ন করছেন, ‘শৈলরানি তুমি কার?’
এই প্রশ্নের সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন ‘কলোনিয়াল’ এক পরিকল্পনার কথাও। সেই পরিকল্পনার সূত্রে ‘দার্জিলিংকে ব্রিটিশ আবিষ্কার’ রূপে বাঙালির দেখাকে তিনি একটু দূরবীনের গভীরতায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে ১৮৩৫ থেকে ১৯০৫-এর মধ্যে রয়েছে পাকদণ্ডি। চোরাবাটো। সেখানে দেখা মেলে হেমরাজ ছত্রীর, এক প্রাণীবিদ্যার গবেষক, যে খুঁজে চলেছে এক বিরলতম প্রাণীকে, হিমালয়ান স্যালামান্ডার। অর্থাৎ কলোনিয়াল পরিকল্পনার উন্নয়নের বিপ্রতীপে তিনি রাখলেন হারিয়ে যেতে থাকা প্রাণীর এবং প্রাণের ইতিহাসকে। লিখে নিলেন বিশ শতকের গোড়ায়, খিদমতগার থেকে ভিস্তিওয়ালার দৈহিক শ্রমের এবং প্রাণের ইতিহাস। সেই প্রাণ, স্থানীয় যুবকের প্রাণও। ২৭ জুলাইয়ের দার্জিলিং শহিদ দিবসের। এই অবধি পৌঁছে দিয়েই লেখক আবার অন্য এক পাকদণ্ডিতে নিয়ে চলেছেন আমাদের, সেখানে দেখা মেলে বেনসনের। সে-ও অধ্যাপক। কিন্তু সে খুঁজছে জোড়থাঙের আলো। যে আলোর খোঁজে ভোদকা পেটে ঢেলে একটা পুরো শহর বিষণ্ণভাবে আসে মারণব্যাধি এইডসের কাছে। হারিয়ে যায় চিঠি লেখার ঠিকানা। কাঞ্চনজঙ্ঘার ‘গুইয়ে’ চরিত্রের খোঁজে এসে দাঁড়িয়ে যান, বিস্মৃত গোরস্থানের সামনে।
দার্জিলিং-এর রাস্তা। স্থানীয় নামে ‘চোরাবাটো’। যে রাস্তা ঘুরে ঘুরে উঠেছে নেমেছে পাহাড়কে ঘিরে। ‘কসাইখানার ভোরে’র তরুণ অধ্যাপক যখন বাসা পালটে ‘স্যালামান্ডারল্যান্ড’ অধ্যায়ে এসে খুঁজে নিচ্ছেন লেপচা ভাষায় কার্শিয়ং, রঙ্গিতের, স্থানিক অর্থকে, তখন থেকে এই বইয়ের চলন আর একজন বহিরাগতের নয়।

৩। “শৈলরানি তুমি কার?” একান্তের রাজনীতি এবং বিষণ্ণতা
লেখার এই বারংবার ফিরে যাওয়ার প্রশ্নের মাঝে লুকিয়ে আছে একান্তের এক রাজনৈতিক প্রশ্ন: “শৈলরানি তুমি কার?”
এই রাজনৈতিক প্রশ্নের কোনো একটিও উত্তর লেখক দেবার চেষ্টা করেননি। তিনি প্রশ্নটিকে রেখেছেন দূরবীনের হাতেই। শুরুতে ভেঙে দিচ্ছেন আপাত বাঙালি ভদ্রলোকের টাইপকাস্টগুলি। লিখছেন সেই ভদ্রলোক বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তাচ্ছিল্যকে। লিখে ফেলছেন, “পাহাড়ের মানুষ মানেই সরল (পড়ুন বোকা’)” এই তাবৎ বাক্যবন্ধের সঙ্গে এনেছেন তাঁর ছাত্র নিউটনকে। এই নিউটনের জলাপাহাড়ের বাড়ি থেকে তুলে আনছেন লিম্বু ভাষার হারিয়ে যাওয়া ডিকশনারিকে আর এর মাঝে আত্মপরিচয়ের রাজনীতি, গোর্খাল্যান্ডের রাজনীতির দীর্ঘ এবং জটিল আরেক চোরাবাটোতে নিয়ে চলেছেন তিনি।
আবার নব্বই দশকের আপাত শান্তির দিনে তুলে এনেছেন স্থানীয় কবিতাকে, বিষণ্ণ এক তরুণের যুবক দিনের কবিতাকে। যেখানে ইয়ুমিতা রাই-এর কবিতার লাইনে আমরা দেখি:
“…নবগঠিত কাউন্সিল ছুঁড়ে দিল কিছু রুটির টুকরো
নিতান্তই অল্প, যদিও সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। তারপর
শোষণ… বেকারত্ব… অবসাদ
এবং, অবধারিত যা।
বিশের চৌকাঠ পেরিয়ে আমি মাদকাসক্ত হলাম।”

আত্মপরিচয়ের এই রাজনীতিকে একটি বাইনারিতে দেখার। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন (আলাদা) রাজ্য আত্মমর্যাদার উলটো দিকে একই রাজ্যে থেকে উন্নয়নের যুক্তির বাইরে লেখক এনেছেন তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ:
“জঙ্গল, নদী, মানুষকে যথাক্রমে কিউবিট, কিউসেক, আর আইকিউ দিয়ে মাপার কায়দা আমাদের ব্রিটিশরা শিখিয়েছিলেন… মুশকিল হল উন্নয়নের উদ্বাস্তুরা কিন্তু প্রায়শই অর্থনীতির ভাষায় কথা বলেন না; তাঁরা বলেন- আমার ভূগোলটা ফিরিয়ে দাও! আমার ভাষাটাকে দাও! আমার পূর্বপুরুষের আত্মাদের পবিত্র উপত্যকাটা আমাদের ছেড়ে দাও…” (পৃষ্ঠা ১৪০, দার্জিলিং)
এই উপত্যকার মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে এই বইয়ের প্রশ্ন, “শৈলরানি তুমি কার?”

বইটির ইংরেজি সংস্করণ
এই বই সেই অপূর্ব মায়া দূরবীনের মধ্যে দিয়ে আমাদের একান্তের বিষণ্ণতার সঙ্গে জুড়ে নিতে দেন দার্জিলিং-এর বিষণ্ণতাকে। আমাদের বিষণ্ণতার রাজনীতিকে, এককের বিষণ্ণতা এবং একক উপত্যকার বিষণ্ণতাকে ছুঁয়ে থাকে এই ইথনো-মেমোয়ার।
____________________________
গ্রন্থ আলোচনা: দার্জিলিং স্মৃতি সমাজ ইতিহাস/ পরিমল ভট্টাচার্য/ অবভাস/ প্রথম প্রকাশ: ২০০৯।

