বালুরঘাটের বোল্লা কালীর মেলা : উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী উৎসব

 

দ্য শেষ হল বোল্লা কালীপুজো ও তাকে ঘিরে চারদিনের মেলা (বালুরঘাটের বোল্লা কালীর মেলা)। লক্ষাধিক পূণ্যার্থীর আগমন এবং কালী-দর্শনের এক মহামিলন মেলা শেষ হল। কিন্তু শেষ থেকেই যেন পরের বছরের প্রস্তুতি শুরু। সে তো আয়োজকদের। ভক্তদেরও কি তাই? নিশ্চিত ভাবেই তাই। না হলে বোল্লা কালীর মন্দির সংলগ্ন পুকুরে বিসর্জনের পরপরই কেন বলে উঠবেন অসম থেকে আগত অমল গুহঠাকুরতা, ‘আবার এক বছরের অপেক্ষা। জানেন প্রতিবছর এখানে আসি!’

 

বোল্লা কালী। লোকমুখে প্রচলিত প্রায় ৪০০ বছরের এক বহমান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বালুরঘাট থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বোল্লা গ্রামের নামকরণ বল্লভ চৌধুরীর নামে হয়েছিল বলে জানা যায়।

বোল্লা কালী। লোকমুখে প্রচলিত প্রায় ৪০০ বছরের এক বহমান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বালুরঘাট থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বোল্লা গ্রামের নামকরণ বল্লভ চৌধুরীর নামে হয়েছিল বলে জানা যায়। এই গ্রাম বেশ কিছু বছর ধরেই প্রসিদ্ধ বোল্লা কালীর নামে। কথিত আছে একজন ব্যক্তি কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুকুর থেকে শিলাময় রূপটি উদ্ধার করেন এবং তাকে প্রতিষ্ঠা করে নিজে পুজো শুরু করেন। এই সময়ে দেবীকে মরকা কালী নামে ডাকা হত। তখন প্রতি জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবস্যায় হত বিশেষ পুজো। এরপর জমিদার মুরারী মোহন চৌধুরী তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে পড়েন তখন তিনি কালীর কাছে মানত করেন যাতে উক্ত মামলায় জয়লাভ করতে পারেন। এবং কী আশ্চর্য! পরের দিনই তিনি মামলায় জয়লাভ করেছিলেন। কৃতজ্ঞতা বসত তিনি কালীর একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু জ্যৈষ্ঠ মাস আসতে অনেক দেরি। তাই তিনি ঠিক করলেন রাস পূর্ণিমার পরের শুক্রবারই ঘটা করে কালীপুজো হবে। তখন থেকে বোল্লা কালীর পুজো রাস পূর্ণিমার পরের শুক্রবার থেকে শুরু হল। কথিত আছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বর্ধমানের জমিদার হরিমোহন গাঙ্গুলি বোল্লা গ্রাম-সহ সংলগ্ন এলাকার মালিকানা পান এবং তখন থেকেই এখানে মহা ধুমধামে কালীপুজো শুরু হয়। যদিও এ সবই লোককথা।

 

কোথা থেকে না কোথা থেকে ভক্তেরা আসেন! দক্ষিণ দিনাজপুর বাদ দিলেও পার্শ্ববর্তী জেলা উত্তর দিনাজপুর-সহ উত্তরবঙ্গের সমস্ত জেলা, দক্ষিণবঙ্গ, কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি, অসম, এমনকী বাংলাদেশ। আর সবার মুখে মুখে ফেরে, ‘জয় জয় মা। আমার মা। সবার মা। বোল্লা মা।’

কবে শুরু হয় এই পুজো? প্রস্তুতি শুরু হয় দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীর পরের শুক্রবার থেকেই। পুকুর থেকে দেবীর কাঠামো তুলে মূর্তি গড়ার কাজ শুরু হয়। বোল্লা কালীর পুজো হয় রাস পূর্ণিমার পরের শুক্রবারে। শুক্র, শনি, রবি অবধি পুজোর মেলা চলে। সোমবারে হয় প্রতিমার বিসর্জন। সাড়ে সাত হাত এই বোল্লা কালীকে ৩২ কেজি সোনার গয়না পরানো হয়। তাঁর পুজোতেই প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সমাগম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন এই বোল্লা কালীর প্রধান প্রসাদ বাতাসা ও কদমা। তার কারণ সমস্ত স্তরের মানুষ যেন পুজোয় ভোগ নিবেদন করতে পারে।

সাড়ে সাত হাত এই বোল্লা কালীকে ৩২ কেজি সোনার গয়না পরানো হয়। তাঁর পুজোতেই প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সমাগম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন এই বোল্লা কালীর প্রধান প্রসাদ বাতাসা ও কদমা।

এই মেলায় পশুবলির প্রথাও আছে, যা গতবছর থেকে হাইকোর্টের নজরদারিতে। বোল্লা কালীর মূল মূর্তি তো পূজিতা হনই, তার সঙ্গে শতাধিক মানত করা ছোটো বোল্লা কালীর মূর্তিও পুজো পায়। ভক্তদের বিশ্বাস দেবীর কাছে প্রার্থনা করে নাকি ফল পেয়েছেন অনেকেই। দেবীর মহিমা এমনই যে বোল্লা গ্রামের এই কালীপুজো ছাড়াও গঙ্গারামপুর, বুনিয়াদপুর এমনকি মালদাতেও বোল্লা কালীর আলাদা আলাদা পুজো হয়। বোল্লা কালীর এই মেলাকে বলা হয় রাস মেলার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা। মানুষের যেন জনসমুদ্র। এই মেলা উপলক্ষে দোকানপাটও বসে প্রচুর। বাতাসা, কদমা-সহ অন্যান্য ভোগের দোকান, জিলিপি, মিষ্টির দোকান, বাড়িতে ব্যবহৃত দৈনন্দিন জিনিসপত্রের দোকান, খাবার হোটেল, নানান রকম পুতুল, হরেক মাল, কাঠের আসবাবপত্রের পসরা, প্রসাধনী দ্রব্যের দোকান আরও কত কী!

মানুষ ফিরে ফিরে আসেন এই বোল্লা কালীর দর্শনে। দেবীর কাছে মন থেকে ভক্তি ভরে কিছু চাইলে তিনি নাকি কখনও ফেরান না, এই কাল্পনিক বিশ্বাস এখন সমাজের সর্বস্তরে প্রোথিত।

Written by