
বাংলায় তুর্কি আক্রমণের পর থেকে বোলান গান গাওয়া হতে থাকে
চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে শিবের গাজন চলে বাংলার গ্রামে গ্রামে। যদিও শিব ছাড়াও মনসা, ধর্মঠাকুর, নীলের গাজনও জেলায় জেলায় দেখা যায় বছরের নানা সময়ে, তবে শিবের গাজনই দুই বাংলায় বেশি জনপ্রিয়। “আমরা দুটি ভাই / শিবের গাজন গাই” – এই ছড়া আমরা সবাই শুনেছি অল্প বয়সে। এর থেকেই বোঝা যায়, শিবের গাজন কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে বাংলার সংস্কৃতিতে। চৈত্র মাস ছাড়াও অন্য সময়েও শিবের গাজন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাকে বলা হয় ‘হুজুগে গাজন’। গাজনের গান আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বোলান এক রকম গাজনের গান, যার ঐতিহ্য খুব পুরোনো। বাংলায় তুর্কি আক্রমণের ঠিক পর থেকেই বোলান গানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ জেলায় বোলান গানের প্রচলন বেশি। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অনুযায়ী, ‘বোলান’ শব্দের অর্থ প্রবচন বা সম্ভাষণ। সেখান থেকেই গানের নাম এসেছে। আরেকটা মত হল, ‘বুলা’ শব্দটিই হল ‘বোলান’ নামের উৎস, যার অর্থ ভ্রমণ। আলকাপ গানের মতো বোলানেও অল্প বয়সী কিশোর ছেলেরা নটীর সাজে গান গায়। তবে, আলকাপ অনুষ্ঠিত হয় নির্দিষ্ট আসরে। আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বোলান গাওয়া হয়ে থাকে। এভাবেই বোলানের সঙ্গে ভ্রমণ বা ঘুরে বেড়ানোর একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। বোলান গানের দলে একজন ওস্তাদ থাকেন। ঢোল বাজানো হয়, সেটার তালে তালে ওস্তাদ গান ধরেন। বাকিরাও সেই গানে যোগ দেন। দলপতির সঙ্গে এইভাবে গান গেয়ে ওঠাকে বলে ‘ধৌয়া তোলা’। অনেক সময়ে গানের সঙ্গে নৃত্যেরও বন্দোবস্ত থাকে।

বোলান গানের কাঠামো পালাগানের মতন। প্রথমে থাকে বন্দনাগীতি। তারপর কথোপকথন, সংলাপের মাধ্যমে গান এগিয়ে চলে। সবার শেষে রঙ্গকৌতুক, যাকে বলে রংপাঁচালি। গানে যে গভীর তত্ত্বকথা তুলে ধরা হয়, তাকে খণ্ডগীতি নামে ডাকা হয়ে থাকে। পৌরাণিক নানা ঘটনা ছাড়াও নানা সামাজিক প্রথা, সমসাময়িক ঘটনাও উঠে আসে বোলান গানের পালায়। বোলান গান প্রধানত চার রকমের। সার বেধে গাওয়া হয় সার বোলান বা দাঁড় বোলান। পালা বোলানের তুলে ধরা হয় কোনো বিশেষ গল্প। মহিলার বেশে পুরুষরা সখী বোলান পরিবেশন করেন। আর শ্মশান বোলান বা পোড়ো বোলানে আছে বীভৎস রসের স্বাদ। এই ধরনের বোলানে নৃত্য চলতে থাকে মড়ার মাথার খুলি মুখে নিয়ে। শিল্পীরা মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শরীরটাকে শকুনের ভঙ্গি করে নাচতে থাকেন। তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে বোলান গানের প্রসঙ্গ দেখা গেছে। বোলান সংস্কৃতি উঠে এসেছে ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিতেও।
তথ্যঋণ – ওয়াকিল আহমদ, রূপকথা দে।
ছবি কৃতজ্ঞতা – আমরা মনভাসি, অন্যান্য।
